যে কারণে আলিগড়ের সিলেবাস থেকে বাদ পড়লেন মওলানা মওদুদী

    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

ইসলামিক বিশ্বের সুপরিচিত দু'জন দার্শনিক, পাকিস্তানের আবুল আলা মওদুদী ও মিশরের সাইয়িদ কুতবের যাবতীয় শিক্ষা তাদের সিলেবাস থেকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি বা এএমইউ।

গত সপ্তাহেই ভারতের বেশ কয়েকজন শিক্ষাবিদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে যৌথভাবে খোলা চিঠি লিখে দাবি জানিয়েছিলেন, ভারতের বেশ কয়েকটি প্রথম সারির পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে 'ইসলামিক স্টাডিজে'র নামে কার্যত জিহাদি কার্যক্রমের পাঠ দেওয়া হচ্ছে - এগুলো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

এরপরই আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি তাদের পাঠক্রম সংশোধন করার কথা জানায়।

যদিও ওই চিঠির লেখকরা বলছেন এই পদক্ষেপই যথেষ্ট নয় - সরকারের উচিত ভারতে ইসলামিক শিক্ষার নামে ছাত্রদের ঠিক কী পড়ানো হচ্ছে তার 'পূর্ণাঙ্গ অডিট' করা।

গত ২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী মোদীকে লেখা ওই চিঠিতে মোট ২২জন শিক্ষাবিদ অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন নির্দিষ্টভাবে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি - আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ও জামিয়া হামদর্দ।

তাদের বক্তব্য ছিল, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু কিছু বিভাগে প্রকাশ্যে তাদের ভাষায় 'জিহাদি ইসলামিক কার্যক্রমের' পাঠ দেওয়া হচ্ছে - আর হিন্দু সমাজ ও সভ্যতার ওপর সহিংস আক্রমণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার এটা একটা বড় কারণ।

চিঠির সঙ্গে যুক্ত নোটে তারা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন বিংশ শতাব্দীর সুপরিচিত ওয়াহাবি ভাবধারার ইসলামী লেখক আবুল আলা মওদুদীর কথা, যিনি এ ছাড়াও ছিলেন জামায়েতে ইসলামী হিন্দের প্রতিষ্ঠাতা।

'জিহাদিরা মওদুদীকে মানেন'

কিন্তু মওদুদী বা তাঁর সমমনাদের দর্শন ইউনিভার্সিটিতে পড়ানো হলে সমস্যা কোথায়?

চিঠিটি লেখার মূল উদ্যোগ নিয়েছিলেন যিনি, সেই 'মানুষী' ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও অধ্যাপিকা মধু পূর্ণিমা কিশওয়ার বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন - মওলানা মওদুদীর লেখা পড়ে ও তার প্রচন্ড প্রভাবের কথা জেনেই তিনি ওই চিঠিটি লেখার উদ্যোগ নেন।

তাঁর কথায়, "এখানে তিনটি আপত্তিকর বিষয় রয়েছে। এক, মওদুদী সব বিধর্মী বা কাফেরের গণহত্যার ডাক দিয়েছেন - যা ভারতের মতো একটি হিন্দুপ্রধান দেশে কিছুতেই মানা যায় না।"

"দ্বিতীয়ত, তিনি মুসলিমদের বলছেন কোনও রাষ্ট্র বা নেশন স্টেটের আইন না-মেনে শুধু শরিয়াকে অনুসরণ করতে - এটাও দেশের সংবিধানবিরোধিতার সামিল।"

"তিন নম্বর, ভারতে লস্কর-ই-তৈয়বা, হুরিয়ত বা পিএফআই, এবং ভারতের বাইরে মুসলিম ব্রাদারহুডের এর মতো বহু জিহাদি ভাবধারার গোষ্ঠী মওদুদীর দ্বারা অনুপ্রাণিত। এমন কী, ইসলামিক স্টেট প্রতিষ্ঠার সময় আল-বাগদাদী পর্যন্ত মওদুদীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন।"

এই কারণেই মধু পূর্ণিমা কিশওয়ার ও ওই চিঠির লেখকরা প্রশ্ন তুলেছেন, জনগণের পয়সায় চলা কয়েকটি ইউনিভার্সিটি কীভাবে অ্যাকাডেমিক চর্চার নামে এই ধরনের একটা দর্শনকে মান্যতা দিতে পারে?

আলিগড় যা বলছে

এই চিঠি লেখার পর সপ্তাহ না-ঘুরতেই আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি জানিয়ে দিয়েছে, মওলানা মওদুদী ও সাইয়িদ কুতব - এই দুজন বিদেশি চিন্তাবিদের রচনাই তারা সিলেবাস থেকে বাদ দিচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র শফি কিদওয়াই বলেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কমুক্ত রাখতেই এই সিদ্ধান্ত।

"তা ছাড়া সমযের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলায়, যে শিক্ষা বহু বছর আগে প্রয়োজনীয় মনে করা হত তা হয়তো আজ আর যুগোপযোগী থাকে না", সিলেবাস বদলানোর পক্ষে এমনও যুক্তি দিয়েছেন এএমইউ-র ওই কর্মকর্তা।

তবে আলিগড়েই ধর্মশিক্ষা বা থিওলজির ছাত্র এবং চার দশক ধরে জামিয়া মিলিয়াতে ইসলামিক স্টাডিজ পড়ানো প্রবীণ অধ্যাপক আখতারুল ওয়াসি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, তার পুরনো প্রতিষ্ঠানের এই সিদ্ধান্তে তিনি অত্যন্ত হতাশ।

'মওদুদীর শিক্ষা কোরান-হাদিস নয়'

ড: ওয়াসি বলছিলেন, "আমি মনে করি ইউনিভার্সিটি কোনও বাটার জুতোর কারখানা নয়, যে আপনি পায়ের যে মাপের জুতো চাই সেটাই একধারসে বার করবেন।"

"বরং বিশ্ববিদ্যালয় হল মুক্তচিন্তার কেন্দ্র, যেখানে কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ তা নিয়ে নিরন্তর তর্কবিতর্ক হবে।"

আখতারুল ওয়াসি আরও জানাচ্ছেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি মওদুদী বা সাইয়িদ কুতবের বহু বক্তব্যের সঙ্গেই একমত নন, কিন্তু আলিগড় বা জামিয়ার সঙ্গে বহু বছর যুক্ত থাকার সুবাদে দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারেন ওখানে কিন্তু তাদের বক্তব্যের 'ক্রিটিক্রাল অ্যানালিসিস'ই পড়ানো হয়।

"আর সবচেয়ে বড় কথা, মওদুদী বা কুতব তো কোরান-হাদিস নন, তাদের সব কথা মানতে হবে এমনও কোনও বাধ্যবাধকতা নেই", বিবিসকে বলছিলেন তিনি।

মওদুদী বা কুতবকে সিলেবাসে নিষিদ্ধ করে তাদের বক্তব্যকেই আসলে জোরালো করা হচ্ছে বলে আখতারুল ওয়াসি মনে করেন, কারণ এতে তাদের মতবাদ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিসরটাও সঙ্কুচিত হচ্ছে।

'পুরো সিলেবাস যাচাই হোক'

আবার তথাকথিত 'জিহাদি সিলেবাসে'র বিরুদ্ধে নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি লেখা মধু পূর্ণিমা কিশওয়ারও আলিগড় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে খুশি নন, যদিও সেটা ভিন্ন কারণে।

তিনি বলছিলেন, "আলিগড় বলতে চাইছে বিদেশি বলেই তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মওলানা মওদুদী পাকিস্তানি ছিলেন বলে তাঁকে নিয়ে আমাদের আপত্তি, বিষয়টা মোটেও সেরকম নয়।"

"ভারতে তো সাদাত হোসেন মান্টোও পড়ানো হয়, যিনি পাকিস্তানি নাগরিক ছিলেন।"

মান্টো-সহ যারাই সব ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা বলেছেন, তা তিনি পাকিস্তানেরই হোন বা তুরস্ক বা মিশরের, তাদের নিয়ে কোনও সমস্যা নেই বলেও তিনি ।

সেই সঙ্গেই অধ্যাপক কিশওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, "আমরা চাই এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উর্দু, আরবি, পার্সিয়ান বা তুর্কী ভাষায় ঠিক কী পড়ানো হয় তার একটা পূর্ণাঙ্গ অডিট - কারণ সেখান থেকে বহু বিষাক্ত ভাবনা ইসলামপন্থীরা গ্রহণ করছে।"

"এদেশের হিন্দুদের বা এমন কী সরকারেরও তা নিয়ে কোনও ধারণাই নেই", বলেন তিনি।

এই পটভূমিতে ভারতের কয়েকটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের পাঠক্রম শিগগিরি সরকার পর্যালোচনা করে দেখবে - মানব সম্পদ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা বিবিসিকে আজ এমনও আভাস দিয়েছেন।

বিবিসি বাংলায় আজকের আরো খবর: