নড়াইলে এমন একটি সাম্প্রদায়িক হামলা কেন, কীভাবে হলো

ছবির উৎস, Dipankar Roy
- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের নড়াইল জেলায় 'ফেসবুকে ধর্ম অবমাননাকারী পোস্ট দেবার' কথিত অভিযোগে লোহাগড়া উপজেলার একটি গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা-অগ্নিসংযোগের দু'দিন পর সন্দেহভাজন পাঁচ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রামটিতে এখনও হিন্দু পরিবারগুলোতে রয়েছে আতঙ্ক ।
কিন্তু এতবড় সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনার পেছনে একটি ফেসবুক পোস্টই কি একমাত্র কারণ - নাকি স্থানীয় রাজনীতি বা অন্য কোন কিছুও থাকতে পারে - এ সব প্রশ্নে এখন চলছে নানা আলোচনা।
নড়াইলের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য এবং জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা বলছেন, সনাতন ধর্মবালম্বীদের ওপর আক্রমণ করে ঐ সম্প্রদায় শুধু নয়, তাকেও বিপদে ফেলা হচ্ছে।
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় দীঘলিয়া নামের যে গ্রামে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে গত শুক্রবার, সেই গ্রামটি হিন্দু অধ্যূষিত।
সেখানকার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক একজন মেম্বার বিউটি রাণী মণ্ডল জানিয়েছেন, গ্রামটিতে ১৫টির মতো মুসলিম পরিবার রয়েছে। কিন্তু হিন্দু পরিবার রয়েছে ১১০টি।
বিবিসি বাংলায় সম্পর্কিত খবর:

তিনি বলেছেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা ঐ গ্রামে বহু প্রজন্ম ধরে বসবাস করছেন। এই প্রথম তারা বড় হামলার শিকার হলেন।
এখন পুলিশ ও র্যাবের পাহারার পরও তাদের মধ্যে ভয়-আতঙ্কের পাশাপাশি একটা আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরিকল্পিতভাবে ঘটনা ঘটানো হয়েছে?
"হামলার পর থেকে গ্রামে আমাদের ঘরগুলোতে মহিলা, শিশু এবং যুবকরা থাকছে না। তারা অন্য এলাকায় আত্নীয় স্বজনের বাড়িতে থাকছে। বয়স্ক পুরুষরা এখন শুধু ঘরগুলোতে আছেন" - বলেন সাবেক মেম্বার বিউটি রাণী মণ্ডল।
তার বক্তব্য হচ্ছে, যেখানে যুগ যুগ ধরে তারা সম্প্রীতির সাথে বসবাস করছেন, সেখানে একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটতে পারে না।
তার ধারণা - ধর্মকে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে ।
তিনি বলেন, হিন্দু এক তরুণ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করেছেন, এমন অভিযোগ ছড়ানো হয় শুক্রবার বিকেলে। সেটা যাচাই করা বা কোন ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ না দিয়েই সন্ধ্যায় হামলা করা হয়।
বিউটি রাণী মণ্ডল বলেন. "শুক্রবার বিকেলে মুখে মুখে ফেসবুক পোস্টে ইসলামের অবমাননার অভিযোগ ছড়ানো হয়।
"এর অল্প সময় পরই সন্ধ্যায় সাত-আটশো লোক এসে হামলা করে। হামলাকারীদের মধ্যে অনেক তরুণ এবং মাদ্রাসার অনেক ছাত্র ছিল। অনেক বয়স্ক মানুষও ছিল" - বলেন তিনি।
"হামলাকারীরা 'আল্লাহু আকবর' শ্লোগান দিয়েছে, এছাড়া 'হিন্দুদের মার' এমন শ্লোগানও দিয়েছে" - বলেন বিউটি রাণী মণ্ডল।
যদিও নড়াইলের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেদিন লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে শক্ত হাতে হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল। কিন্তু হামলাকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবার সময় কিছু ভাঙচুর করেছে।
লোকের মনে 'অনেক প্রশ্ন'
তবে হামলার ঘটনার যে ধারাবাহিকতা প্রকাশ পেয়েছে, তাতে ঘটনাটি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সেখানকার রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে নানা আলোচনা ।
অনেকে মনে করেন, ধর্মকে ব্যবহার করে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে।
লোহাগড়া উপজেলা এবং নড়াইল সদরের একাংশের সংসদ সদস্য ও সাবেক ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা ফেসবুক পোস্টে হামলার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, তাকে কেউ টার্গেট করলে পেছন থেকে আঘাত না করে তারা যেন সামনে এসে লড়াই করে।
এ ধরনের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে মাশরাফি বিন মুর্তজা কি ইঙ্গিত দিয়েছেন - সেই প্রশ্ন অনেকে তুলেছেন। তবে তিনি কোন ইঙ্গিত দেয়ার অভিযোগ মানতে রাজি নন।
মাশরাফি বিন মুর্তজা বিবিসিকে বলেন, "যে সমস্যাগুলো কখনও নড়াইলে হয়নি। এখন সে রকম ঘটনা বার বার ঘটছে। এর কারণটা আমি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। এখানে কোন ইঙ্গিতের বিষয় নেই।"
তিনি আরও বলেন, কোন চক্র ঘটনা ঘটিয়েছে, সেটাই বের করতে হবে।
নড়াইলেই এর আগে একজন শিক্ষককে জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করাসহ একাধিক ঘটনা তুলে ধরে মাশরাফি বিন মুর্তজা যদিও বলছেন, "তাকে কেউ টার্গেট করে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছে" - কিন্তু কারা তাকে টার্গেট করছে, সে ব্যাপারে তিনি পরিস্কার করে কিছু বলছেন না।
"কারা করছে, সেটাতো জানতে হবে। ঘটনাগুলোতো ঘটেছে, সেগুলো আমি আমার ফেসবুক পোস্টে তুলে ধরেছি।"
মাশরাফি বিন মুর্তজা বলেন, "ঘটনাগুলো তুলে ধরে আমি এটাও বলেছি, আপনারা ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে আমাকে আঘাত না করবেন না। আমিই যদি আপনাদের অ্যাটাকের কেন্দ্রবিন্দু হই, তাহলে আমাকে সরাসরি আঘাত করেন।"
তবে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের দ্বন্দ্বের কারণে নড়াইলে বিভিন্ন ঘটনা ঘটছে কিনা - এমন প্রশ্নও অনেকে তুলেছেন।
নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুভাষ বোস তাদের দলে কোন দ্বন্দ্বের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
"আমাদের দলে নড়াইলে কোন দ্বন্দ্ব নেই। আমাদের দলের কোন প্রভাবে এমন সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটতে পারে না এবং ঘটে নাই" - বলেন মি. বোস।
একইসাথে তিনি বলেন, যে গ্রামে হামলা হয়, সেই দীঘলিয়া গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে তাদের দলে দ্বন্দ্ব ছিল।
আগের ঘটনাগুলোর মত 'একই প্যাটার্নে' হামলা?
তবে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ক্ষমতাসীন দল এবং সরকারের ব্যর্থতার কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটছে।
লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, এর আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক হামলার যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলো এবং এখন নড়াইলের হামলার ঘটনার প্যাটার্ন একই রকম।
"আগের ঘটনাগুলোতে যেমন ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এরপর হিন্দুদের বাড়িঘ বা মন্দিরে হামলা করা হয়েছে। নড়াইলের ঘটনাও ঠিক একইভাবে ঘটানো হয়েছে" বলেন মি: আহমদ।
তিনি মনে করেন, আগের ঘটনাগুলোর যথাযথ ব্যবস্থা সরকার নিতে পারেনি। এছাড়াও তিনি মনে করেন, ক্ষমতাসীন বা সরকারের প্রশ্রয় ছাড়া কোন দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটতে পারে না।
এদিকে, নড়াইলের জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনার পেছনে কোন ষড়যন্ত্র, অন্য কোন বিষয় বা পরিকল্পনা ছিল কিনা - তদন্ত কমিটি তা খতিয়ে দেখছে।









