ভারতের ত্রিপুরায় ঈদের সময়ে 'বেআইনি' কোরবানি বন্ধ করতে প্রশাসনকে নির্দেশ সরকারের

ছবির উৎস, সুদীপ নাথ
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি, কলকাতা
কোরবানির সময়ে ত্রিপুরার কোথাও যাতে 'বেআইনিভাবে' গরু, বাছুর, উট বা অন্য কোনও প্রাণী হত্যা না করা হয়, তার জন্য জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার।
ত্রিপুরার প্রাণী সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী ভগবান দাস বিবিসিকে জানিয়েছেন তারা কোরবানি বন্ধ করার কোনও নির্দেশ দেননি, তবে নিয়ম মেনেই পশু জবাই করতে হবে। এছাড়াও, তিনি বলেন, "অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের ভাবাবেগে আঘাত" যাতে না লাগে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
বিবিসি বাংলায় পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, বিবিসি
ঈদের সময়ে কোরবানি নিয়ে নির্দেশে কী আছে?
প্রাণী সম্পদ উন্নয়ন দপ্তর জুন মাসের ১৮ তারিখে একটি নির্দেশিকা দিয়েছিল, যার ভিত্তিতে এখন জেলা প্রশাসনগুলি তাদের অধীনস্থ দপ্তরগুলিতে চিঠি পাঠিয়ে বলেছে যে বকরি ইদের আগে 'বেআইনি পশু হত্যা' বন্ধ করতে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
যেসব পশুর নাম রয়েছে ওই নির্দেশিকায়, তার মধ্যে গরু, বাছুর এবং উটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পশু জবাই করার ব্যাপারে যে বেআইনি কথাটি লেখা আছে, তার অর্থ কী, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে।
কোরবানি কীভাবে দেওয়া হবে: চিন্তায় মুসলিম পরিবারগুলো
যেমন, উত্তর ত্রিপুরার বাসিন্দা তানিয়া খাতুনের পরিবারও চিন্তায় পড়েছে যে এবার তারা কোরবানি কীভাবে দেবে।
"ওই নোটিসে পশু পরিবহনের ব্যাপারে বলা হয়েছে। কোরবানির জন্য পশু তো হাট থেকেই কিনতে হবে। তা নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে যদি প্রশাসন আটকে দেয়?" প্রশ্ন মিস খাতুনের।

ছবির উৎস, Getty Images
মূল নির্দেশিকার পরে বাংলায় একটি 'কী করা যাবে, কী করা যাবে না' ধরণের তালিকা রাজ্য সরকার দিয়েছে, যেখানে ভেড়া, ছাগল, শুকর, গৃহপালিত পশু, মুরগি আর মাছের কথা লেখা আছে।
নির্দেশিকায় এটাও বলা হয়েছে যে ভারতের পশু কল্যাণ পর্ষদের নির্দেশিকা অনুযায়ীই এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ত্রিপুরার প্রাণী সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী ভগবান দাস অবশ্য বলছেন এই নির্দেশের সঙ্গে ঈদের কোনও সম্পর্ক নেই।
"এটা আমার দপ্তর থেকে গত মাসের ১৮ তারিখ দেওয়া হয়েছে। ভারতের প্রাণীসম্পদ পর্ষদ প্রত্যেক রাজ্যের কাছে যে নির্দেশনা পাঠিয়েছিল, সেটাই জেলা প্রশাসনগুলোকে আমরা পাঠিয়ে দিয়েছি। এর দুটো উদ্দেশ্য। প্রথমত যেভাবে গরু বা পশুগুলিকে পরিবহন করে নিয়ে আসা হয়, সেটা একটা নিষ্ঠুরতা। এটা বন্ধ হওয়া দরকার," বলছিলেন মি. দাস।
'যেভাবে কসাইখানা বানিয়ে ফেলে, সেটা অনেকের কাছেই খারাপ লাগে'
মন্ত্রী আরও বলছিলেন, নির্দেশিকা জারি করার পিছনে দ্বিতীয় কারণটা হল- তার ভাষায়- "যেভাবে প্রকাশ্যে কসাইখানা বানিয়ে ফেলে, যেখানে সেখানে গরু কাটে, সেটা অনেকের কাছেই খুব খারাপ লাগে। বিশেষত শিশুদের মনে এর খুব খারাপ প্রভাব পড়ে। এই দিকটাও খেয়াল রাখা দরকার।"
সরকারী নির্দেশে না থাকলেও মন্ত্রী মি. ভগবান দাস বলেন "এমন সম্প্রদায়ের মানুষও আছেন, যারা গরুকে শ্রদ্ধা ভক্তি করেন।" তিনি বলেন, কোরবানির ঈদে গরু জবাই করার সময়ে তাদের ভাবাবেগে যাতে আঘাত না লাগে, সেটাও দেখা উচিত।

ছবির উৎস, Getty Images
ত্রিপুরাতেও গরু জবাইতে নিয়ন্ত্রণ আসছে?
ত্রিপুরায় শাসনক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। দেশের প্রায় সব বিজেপি শাসিত রাজ্যেই গরু জবাই করার ওপরে হয় নিষেধাজ্ঞা অথবা কড়া নিয়ন্ত্রণ আছে।
ত্রিপুরায় সেই নিয়ন্ত্রণ এতদিন ছিল না।
ত্রিপুরা রাজ্য ইমাম অর্গানাইজেশনের সাধারণ সম্পাদক সিরাজউদ্দিন আহমেদ বলছেন, "এই নির্দেশিকা এটাই ইঙ্গিত করছে যে উত্তরপ্রদেশ সহ নানা রাজ্যে যে ধরণের নিষেধাজ্ঞা আছে, বা পার্শ্ববর্তী আসামেও যেরকম কড়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে গরু জবাইয়ের ওপর এখানেও হয়তো নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ চালু করা হবে।"

ছবির উৎস, Getty Images
আবার রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও সিপিআইএম নেতা শাহিদ চৌধুরী প্রশ্ন তুলছেন, "কোরবানির কারণে এতবছর তো কারো ভাবাবেগে আঘাত লাগেনি, এখন এই কথা সরকার কেন তুলছে?"
সরকারি নির্দেশিকার পরে রাজ্যের মুসলমানদের মধ্যে যেমন তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি, তেমনই ভয়।
তানিয়া খাতুনের কথায়, "রাস্তাঘাটে সবাই এটা নিয়েই আলোচনা করছে। সবার মনেই একটা ভয় তৈরি হয়েছে যে কীভাবে ঈদ সেলিব্রেট করব আমরা। আর তো মাত্র দু একদিন বাকি, এর মধ্যেই এরকম নোটিস এল!"
ত্রিপুরায় ৩৮ লক্ষ মানুষের মধ্যে নয় শতাংশ মুসলমান। ত্রিপুরায় আগে কখনই সাম্প্রদায়িক অশান্তি লক্ষ্য করা যায় নি।
কিন্তু গত কয়েক বছরে কখনও মুসলমানদের বাড়ি-দোকান ভাঙচুর, মসজিদ ভাঙচুর বা অতি সম্প্রতি কবরস্থান দখল করে গেরুয়া পতাকা টাঙ্গিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
বিজেপি সরাসরি এধরণের ঘটনা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখলেও হিন্দুত্ববাদী কিছু সংগঠনের নাম উঠে আসছে এইসব ধর্মীয় অশান্তির পেছনে।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:








