ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ: লুহানস্ক দখলের লড়াইয়ে রুশ সেনারা সেভেরোদনিয়েস্ক শহরে ঢুকে পড়েছে

রুশ সৈন্যরা পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলের প্রধান শহর সেভেরোদনিয়েস্ক শহরে ঢুকে গেছে বলে সর্বশেষ পাওয়া খবরে জানা গেছে।

ডনবাস এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অবরুদ্ধ শহর সেভেরোদনিয়েস্কের প্রশাসনিক প্রধানকে উদ্ধৃত করে ইউক্রেনের একটি সংবাদ ওয়েবসাইট খবর দিচ্ছে রাশিয়ান সৈন্যরা নোভোয়াদার এবং স্টারোবিলস্ক নামে দুটি এলাকা দিয়ে শহরে ঢুকেছে। তারা প্রায় ১০০ মিটার এলাকার দখল নিয়েছে বলে তিনি জানাচ্ছেন।

ইউক্রেনের স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান রোমান ভ্লাসেঙ্কো রুশ সৈন্যদের শহরে ঢুকে পড়ার কথা স্বীকার করলেও বলছেন, তাদের সৈন্যরা এখনও রুশ সৈন্যদের প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে লুহানস্ক অঞ্চলের গভর্নর সেরহি হাইদাই পরিস্থিতিকে খুবই কঠিন বলে বর্ণনা করেছেন।

"সেভেরোদনিয়েস্কের অবকাঠামোগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে এবং শহরের ৬০ শতাংশ আবাসিক ভবন এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো আর মেরামত করা সম্ভব নয়," তিনি বলছেন।

তিনি আরও বলেছেন, "শহর থেকে মানুষজনকে সরিয়ে নেবার এবং ত্রাণ সহায়তা পৌঁছনর মূল সড়কও এখন আর নিরাপদ নয়।"

এই শিল্প শহরটির ওপর এত তীব্র বোমাবর্ষণ হচ্ছে যে মি. হাইদাই বলছেন, তারা হতাহতের সংখ্যা গোনাও বন্ধ করে দিয়েছেন।

আরও পড়তে পারেন:

রুশ সৈন্যরা সেভেরোদনিয়েস্ক এবং প্রতিবেশি শহর লিসিচ্যানস্ক দখলের জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে তুমুল লড়াই চালাচ্ছে।

পুরো লুহানস্ক এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে রাশিয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এই দুটি শহরের দখল নেয়া।

ডনবাস সঙ্কটে- ইউক্রেনের উপদেষ্টা

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা ইউরি স্যাক বিবিসিকে বলেছেন যে রাশিয়া "ছোট ছোট পকেটে ইউক্রেন সৈন্যদের দলগুলোকে ঘিরে তাদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। তাদের ধ্বংস করে দেবার চেষ্টা করছে।"

তিনি বলছেন, "ইউক্রেন সশস্ত্র বাহিনী এলাকাগুলো ধরে রাখার জন্য লড়ছে। তবে রুশ সৈন্যদের গোলাগুলির শক্তি অনেক বেশি। প্রতিদিন চব্বিশ ঘণ্টা একনাগাড়ে তারা এসব এলাকায় কামান থেকে গোলাবর্ষণ করছে।

"তারা বেসামরিক মানুষের বাড়িঘর এবং ইউক্রেনের সামরিক স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোগুলোতেও আঘাত করছে," বলছেন মি. স্যাক।

"পরিস্থিতি খুবই, খুবই কঠিন।"

ইউরি স্যাক বলছেন রুশ শক্তিমত্তার বিরুদ্ধে লড়তে যে ধরনের ভারি অস্ত্র প্রয়োজন যা পাঠাতে তারা পশ্চিমের দেশগুলোকে অনেক দিন আগেই অনুরোধ জানিয়েছিল, সেসব অস্ত্র এখনও এসে না পৌঁছনয় লড়াই তাদের জন্য কঠিন হচ্ছে।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ডনবাস কেন রুশদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

রাশিয়া সেভেরোদনিয়েস্ক শহরটির দখল নিলে পুরো লুহানস্ক এলাকা তাদের দখলে চলে আসবে এবং এটা হবে রাশিয়ার জন্য একটা বড় কৌশলগত অর্জন। লুহানস্ক ডনবাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল এবং ইউক্রেনের ভারি শিল্প এলাকা।

ডনবাস দখল করাকে রাশিয়া এখন চূড়ান্ত অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এখানে কোনরকম শর্ত রাশিয়া আমলে নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ।

ডনবাসের মানুষ মূলত রুশ ভাষাভাষী।

দোনেৎস্ক আর লুহানস্ক বিস্তৃত খনিসমৃদ্ধ এলাকা এবং এই এলাকার সাথে রাশিয়ার একটা ঐতিহাসিক সম্পৃক্ততা আছে।

ফলে এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ রাশিয়া যে কোন মূল্যে নিতে চায়- তাদের ভাষায় এই এলাকা তারা "স্বাধীন" করতে চায়। অর্থাৎ ক্রাইমিয়ার পর এই এলাকা রাশিয়া তার দেশের অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।

মি. লাভরভ বলেছেন, "রুশ ফেডারেশন দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক এলাকাকে স্বাধীন রাজ্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই দুই এলাকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ রাশিয়ার জন্য শর্তহীন অগ্রাধিকার।"

ইউক্রেনও চাইছে না এই এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যাক। কিন্তু এই এলাকার পতন তারা ঠেকাতে পারবে কিনা সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

'সেভেরোডোনিয়েস্ক নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এখন'

রাশিয়া লুহানস্ক, বিশেষ করে সেভেরোদনিয়েস্ক দখলের জন্য সর্ব শক্তি প্রয়োগ করছে। যদিও তারা এখনও পুরোপুরি সাফল্য পায়নি বলে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন।

তবে বিশ্লেষক অধ্যাপক মাইকেল ক্লার্ক বিবিসিকে বলেছেন যে সেভেরোদনিয়েস্ককে রক্ষা করার চেষ্টা কতটা সঙ্গত সেটা নিয়ে ইউক্রেনকে এখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কারণ তিনি বলছেন খুব দ্রুত সেভেরোদনিয়েস্ককে সব দিক থেকে ঘিরে ফেলা হবে। ফলে ইউক্রেনের সৈন্যদের আরও পশ্চিমে নিরাপদ এলাকায় সরে যাওয়াটা সমীচীন হবে কিনা।

"ইউক্রেনের সেনারা চাইছে শেষ পর্যন্ত লড়তে," তিনি বলছেন। তিনি আরও বলছেন এই শহর দখলের লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী, যা প্রবাহিত হয়েছে পশ্চিম দিকে।

"এই নদীর পশ্চিম অংশে ইউক্রেন বাহিনীর চারটি বিগ্রেড রয়েছে। রাশিয়ানরা চাইছে এই চারটি বিগ্রেডকে কব্জা করতে। সেটা তারা করতে পারলে এই ব্রিগেডগুলোর রীতিমত সমস্যায় পড়বে।"

অধ্যাপক ক্লার্ক বলছেন, "ইউক্রেনের লড়াই টিকিয়ে রাখতে হলে এই চারটি সেনা বিগ্রেডের টিকে থাকা খুবই জরুরি।"