‘আত্মহত্যার চেষ্টা করলে হল থেকে উচ্ছেদের নোটিস ছিল অমানবিক'

ছবির উৎস, Arafat Rahman
বাংলাদেশে সম্প্রতি এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে 'কোন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তার আসন বাতিল করা হবে' মর্মে একটি নোটিস জারি করা হয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় এর তীব্র সমালোচনা হওয়ার পর সেটি প্রত্যাহার করেছে কর্তৃপক্ষ।
ফেব্রুয়ারি মাসের ২৭ তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হল কর্তৃপক্ষ একটি নোটিস জারি করে, যেখানে বলা হয় 'হলে অবস্থানরত কোন ছাত্রী কোন প্রকার ঘুমের ঔষধ, নেশা জাতীয় দ্রব্য কিংবা আত্মহননের প্রচেষ্টা করলে কোন কৈফিয়ত ছাড়াই তার আবাসিকতা বাতিল করা হবে।'
হল প্রাধ্যক্ষের অফিসের সামনে টাঙানো নোটিস নিয়ে শিক্ষার্থীরা তখনই প্রতিবাদ জানায়।
কিন্তু গত সপ্তাহের শেষে নোটিসের একটি কপি কেউ সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে পোষ্ট করার পর বিষয়টি ভাইরাল হয়ে যায়। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে অবশেষে ১৩ই মার্চ কর্তৃপক্ষ নোটিসটি প্রত্যাহার করে নেয়।
কেন এই নোটিস? কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শর্মিষ্ঠা রায় বিবিসিকে বলেছেন, নোটিসটি মূলত সচেতনতা হিসেবে দেয়া হয়েছিল।
আরো পড়তে পারেন:
"আসলে হল পরিচালনা করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় ছাত্রী সচেতনতার জন্য আমরা অনেক কিছু দিই, এটা সেরকমই একটা নোটিস ছিল। যাতে ভবিষ্যতে কোন অঘটন না ঘটে এই হলে। কোন ইনটেনশন থেকে দেইনি আমরা, সাধারণ নোটিসের মত ছিল। কিন্তু আমরা বুঝি নাই যে এই কথাটার জন্য ওরা আহত হবে," বলেন অধ্যাপক রায়।
তিনি আরো বলেছেন, "কাউকে আহত করা বা আঘাত দেয়ার উদ্দেশ্য ছিল না আমাদের। কিন্তু যখন দেখলাম এটা নিয়ে সবাই কথা বলছে, আলোচনা করছে, মেয়েরা কষ্ট পেয়েছে, তখন বিষয়টা আমরা দেখলাম এবং সাথে সাথে ওটা (নোটিস) তুলে নিই। এবং দুঃখ প্রকাশ করে আরেকটা নোটিস দেই।"
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ষষ্ঠ হল বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলটি ২০১৬ সালে কার্যক্রম শুরু করে। এই মূহুর্তে হলে বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের প্রায় ১১ শত আবাসিক ছাত্রী রয়েছেন।
অধ্যাপক রায় বলেছেন, তার হলে ছাত্রীদের মধ্যে নেশা-দ্রব্য পাওয়া কিংবা আত্মহত্যার চেষ্টার কোন ঘটনা গত ছয় বছরে ঘটেনি।
"তবে, তাদের বয়সে কোন অঘটন যাতে না ঘটিয়ে ফেলে সেজন্য সতর্ক করাই উদ্দেশ্য ছিল ওই নোটিসের," বলেন তিনি।

ছবির উৎস, Arafat Rahman
তবে এক হাজারের ওপর ছাত্রী সংখ্যা থাকলেও ওই হলটিতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেবার জন্য কোন কাউন্সেলর বা সাইকোলজিস্ট নেই বলে জানিয়েছেন প্রাধ্যক্ষ।
শিক্ষার্থীরা কী বলছে?
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে হলের একটি রুমের জানালা দিয়ে ধোঁয়া বের হবার পর কর্তৃপক্ষ ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়।
ছাত্রীদের দাবি, সেসময় দমকল কর্মীরা জানিয়েছিল, রুমে হিটারের কয়েল থেকে ওই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।
কিন্তু কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, শিক্ষার্থীরা রুমে সিগারেট বা নেশা-দ্রব্য সেবন করেছে।
কর্তৃপক্ষের ওই অভিযোগের বিষয়ে হলের একজন আবাসিক ছাত্রী নাম প্রকাশ না করা শর্তে বিবিসিকে বলছিলেন, "কোন প্রমাণ ছাড়াই কর্তৃপক্ষ ছাত্রীদের দিকে অভিযোগ তুলেছে।
তারপর আবার একটি নোটিস দিয়েছে যেটি খুবই অমানবিক মনে করি আমরা। কেউ মানসিক কোন সমস্যায় আছে কি না সেটা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হলের সীট।"
হলের আবাসিক আরেকজন ছাত্রী, তিনিও নাম প্রকাশ করতে চাননি, প্রশ্ন তোলেন "যে আত্মহত্যা করতে চায় বা চেষ্টা করে তার কাছে হলের সীট কি বড় কোন বিষয়?"
শিক্ষার্থীরা বলেছেন বিষয়টি নিয়ে ছাত্রীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তারা প্রতিবাদও করেছেন।
'অভিভাবকসুলভ আচরণ নয়'
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হল কর্তৃপক্ষের আচরণকে 'অভিভাবকসুলভ আচরণ নয়' বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আফরোজা হোসেন মনে করেন, যে নোটিসটি দেয়া হয়েছে তাতে 'সহমর্মিতার কোন ছাপ নেই'।

ছবির উৎস, Arafat Rahman
তিনি বলেন, "হলের কর্তৃপক্ষ একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক। অভিভাবকের দায়িত্ব কোন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে যদি মনে সে সমস্যা করছে, তাহলে তাকে বসা উচিত, জানতে চাওয়া দরকার তার কী সমস্যা!
একজন অভিভাবকের তো অনেক দায়িত্ব।"
তিনি বলছেন, বাংলাদেশে এখনো মানুষের মানসিকতায় মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত মূল্যবোধ নেই।
"এখন ধরুন যদি কারো মধ্যে নোটিসের ওই বিষয়গুলো থাকেও, তাহলেও বোঝার চেষ্টা করা উচিত কোন শিক্ষার্থী সেটি কেন করছে? সে কি কোন সমস্যায় আছে? এরকম ক্ষেত্রে পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাহায্য পেলে সে হয়ত ওই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবে।"
শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা, আত্মহত্যা প্রবণতা বাড়ছে
অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও হতাশা থেকে মাদক এবং আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বিষয়টি নিয়ে কাউন্সেলর নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যারা শিক্ষার্থীদের সমস্যা শুনে তাদের কাউন্সেলিং দেন।
এর মধ্যে অন্যতম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দফতরের প্রধান কাউন্সেলর সাইফুন্নেসা জামান বিবিসিকে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বিষণ্ণতা যেমন আগের চেয়ে বেশি, তেমনি বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে সচেতনতাও বাড়ছে।
তিনি জানিয়েছেন, ১৯৯৭ সালে এ কেন্দ্র স্থাপনের পর শুরুতে একজন দুজন করে আসত, কিন্তু এখন অনেক শিক্ষার্থী আসে সমস্যার কথা বলে সাহায্য চাইতে।
"সাধারণত পড়াশোনা এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা হতাশা নিয়ে আসে শিক্ষার্থীরা।
ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যার মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও অনিশ্চয়তা এবং রেজাল্ট এই সব সমস্যা নিয়ে বেশি আসে শিক্ষার্থীরা, " বলেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলছিলেন, ২০২২ সালের ২২শে জানুয়ারি থেকে মার্চের ১৪ তারিখ পর্যন্ত মোট ২৮ জন শিক্ষার্থী এসেছেন কাউন্সেলরের কাছে, যাদের আত্মহত্যা-প্রবণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গোপনীয়তা নিশ্চিত করে তাদের সব কজনকে কাউন্সেলিং দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মিজ জামান।
"আত্মহত্যার কথা মানুষ যখন ভাবে তখন সে ভাবে তার সামনে সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। এ সময়ে তার সহমর্মিতা এবং সাহায্য দরকার।
তার সমস্যাটি মন দিয়ে শুনে, তাকে বোঝাতে হবে যে সে মরে গেলেই সমস্যা শেষ হবে না, বরং বেঁচে থেকে কী ভাবে সমস্যাটি সমাধান করা যায় সেটি দেখিয়ে দেবার চেষ্টা করি আমরা ," বলেন সাইফুন্নেসা জামান।
এদিকে, বাংলাদেশে সম্প্রতি অলাভজনক বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় জানা যাচ্ছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশে ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, ২০২০ সালে যে সংখ্যাটি ছিল ৭৯ জন।
জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা ওই জরিপে দেখা গেছে, মহামারির সময় ঘরে বসে থাকা, আর্থিক অস্বচ্ছলতা তৈরি হওয়া, পরিচিতদের সাথে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হওয়ার মত নানা কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্ণতা তৈরি হয়, এবং বিষণ্ণতা অনেককে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করছে।
এসব কারণ ছাড়াও বন্ধু, আত্মীয়, পরিবারের সদস্যদের অবিবেচকের মত ব্যবহার, পরিবারের প্রত্যাশা মেটাতে না পারার হতাশা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের অর্জনের খবরের সাথে নিজেদের অর্জনের তুলনা করার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও হতাশার হার বাড়ছে - যেই বিষণ্ণতা ও হতাশা এক সময় তাদের আত্মহত্যা-প্রবণ করে তুলতে পারে বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবার, সমাজ আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে অল্পবয়সীদের মধ্যে বিষণ্ণতা, আত্মহত্যা-প্রবণতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।









