মানসিক স্বাস্থ্য: চিকিৎসা নিতে অনাগ্রহ, বাংলাদেশে বিশেষজ্ঞের সংখ্যাও নগণ্য

ইলাস্ট্রেশন।
ছবির ক্যাপশান, সামাজিক কুসস্কারের কারণেঅনেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বিষয়টি চেপে যান।
    • Author, সানজানা চৌধুরী
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করেন তারা জানিয়েছেন যে, কিছু বদ্ধমূল সামাজিক ধারণার কারণে এখনও অনেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে পেশাদার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে চান না।

ঢাকার বাসিন্দা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী দীর্ঘদিন ধরে মানসিক নানা জটিলতায় ভুগলেও তিনি চিকিৎসকের কাছে তখনই গিয়েছেন যখন পরিস্থিতি গুরুতর। একদম আত্মহত্যার প্রবণতায় পৌঁছে গেছে।

সমস্যার শুরুতে তিনি যেমন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেননি। তেমনি তার আশেপাশের মানুষও মনে করতেন, এমনটা সবারই হয়, মানসিক রোগ বলে কিছু নেই।

তিনি বলেন, "সমস্যাটা ছিল টিন-এইজ (বয়ঃসন্ধিকাল) থেকেই। অনেক বিষণ্ণ থাকতাম, মেজাজ খিটখিটে থাকতো, সবাই মনে করতো আমি এমনই, জেদি, বদমেজাজি। আমার নিজের বা অন্য কারোই মনে হয়নি যে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। যখন জীবন মরণ অবস্থা তখনই গেলাম। আগে গেলে হয়তো এতো বাজে অবস্থা হতো না।"

সবশেষ ২০১৮-১৯ সালের মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১৭% বা ২ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নানা ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত। এবং ১০০ জনের মধ্যে ৭ জন ভুগছেন বিষণ্ণতায়।

অথচ অবাক করা বিষয় হল, এর ৯২%-ই রয়েছেন চিকিৎসার আওতার বাইরে।

অন্যদিকে ১৩.৬% শিশুও মানসিক রোগে ভুগছে বলে জরিপে উঠে এসেছে, যাদের ৯৪% কোন চিকিৎসা পাচ্ছে না।

এর কারণ হিসেবে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলেন যেকোনো শারীরিক রোগকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখলেও মানসিক সমস্যাকে বাংলাদেশে এখনও ঠাট্টা, বিদ্রূপ বা হালকা বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়।

মানসিক সমস্যা প্রকট আকার না নেয়া পর্যন্ত বেশিরভাগই চিকিৎসকের কাছে আসতে চান না।

তিনি বলেন, "আমাদের এখানে মানুষ তখনই ডাক্তারের কাছে আসে যখন পরিস্থিতি অনেক গুরুতর। কেউ আছেন কুসংস্কারের কারণে আসতে চান না। আবার অনেকে জানেনই না যে তিনি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।"

ইলাস্ট্রশন।
ছবির ক্যাপশান, প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশুরাও মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকেন।

এছাড়া চিকিৎসাবিদ্যার স্নাতক পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি উপেক্ষিত থাকায় অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদেরও এ বিষয়ে জানার ঘাটতি রয়েছে বলে জানান মিস সরকার।

"মানসিক রোগের অনেক শারীরিক প্রভাব আছে। সেইসব শারীরিক লক্ষণ দেখা দিলেই মানুষ ডাক্তারের কাছে যান। এই সমস্যার মূল কারণ যে মানসিক স্বাস্থ্য-এটা রোগীরা জানবেন না স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশের চিকিৎসকরাও এটা বুঝতে পারেন না। কারণ আমরা যে এমবিবিএস পাস করি সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি পড়ানো হয় না। এজন্য তারাও রোগীর মূল সমস্যা বুঝে তাকে আমাদের কাছে রেফার করতে পারেন না।"

বাংলাদেশে মানসিক রোগ বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আলাদা বিভাগ থাকলেও একে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চান না অনেকেই। এ কারণে দেখা যায় মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যাও জনসংখ্যার অনুপাতে খুবই নগণ্য।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন এমন প্রতি দুই লাখ মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন মাত্র একজন।

সব মিলিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ৭শর মতো সেটাও শুধুমাত্র শহরকেন্দ্রিক বলে জানিয়েছেন সাজেদা মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক রুবিনা জাহান।

এক্ষেত্রে পেশাদার চিকিৎসক বাড়াতে সরকারের বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, "আমাদের জেলা উপজেলা পর্যায়ে কোন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নেই। যারা আছেন তাদের বেশিরভাগই শহর কেন্দ্রিক। এছাড়া স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও কোন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নেই। এ কারণে মানুষ প্রয়োজনে চিকিৎসা নিতে পারছে না। ফলে অনেকেই ওঝা-পীর-ফকিরদের শরণাপন্ন হচ্ছেন, নিজেদের আরও বিপদে ফেলছেন। তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিধি বাড়াতে হবে। যার জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।"

রো পড়ুন:

মানসিক রোগ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে মানসিক সমস্যা গুরুতর হতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এবং গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার প্রচারণা চালানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

সেইসঙ্গে স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে চিকিৎসার সব বিভাগের পাঠ্যপুস্তকে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানান মি. জাহান।

"মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকার কারণেই মানুষ মানসিক রোগীদের পাগল বলে, দুর্বল ভাবে, তাকে সমাজ থেকে আলাদা করে দেয়, কাজ থেকে বের করে দেয়ারও ঘটনা আছে। এজন্য মানুষ এটা লুকিয়ে রাখতে চায়, চিকিৎসকের কাছে যেতে চায় না। এজন্য সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে প্রচারণা চালাতে হবে যেন মানুষ শারীরিক সমস্যার মতো, মানসিক রোগকেও স্বাভাবিকভাবে নিতে শেখে।"

মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়ানো লক্ষ্যে এ বছর মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে ''সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য : অধিক বিনিয়োগ, অবাধ সুযোগ''।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যায় প্রাণ হারান। অথচ মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মহত্যার এ হার কমিয়ে আনা সম্ভব বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে আশার খবর হল,বাংলাদেশে গত এক দশক ধরে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা অনেকটাই বেড়েছে। মানুষ চিকিৎসা নিতেও আগ্রহী হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।