ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ: 'খাদ্যমূল্য এত বাড়বে যে পৃথিবীতে নরক নেমে আসতে পারে'

ইয়েমেনের মতো অনেক দেশ রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকে আমদানি করা খাদ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইয়েমেনের মতো অনেক দেশ রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকে আমদানি করা খাদ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল
    • Author, টম কাভানাহ
    • Role, বিবিসি নিউজ

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান ডেভিড বিসলি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে খাদ্যের দাম এতটাই বেড়ে যেতে পারে যে, তা বিশ্বের দরিদ্র মানুষদের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।

ইউক্রেন এবং রাশিয়া- দুটি দেশই প্রাধান্য খাদ্যশস্যের বড় রফতানি-কারক। যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে খাদ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং খাদ্যের দাম বাড়ছে।

মি. বিসলি বলছেন, এর ফলে এখন বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে।

"আপনি যখন ভাবছেন যে পৃথিবীতে যে নরকের মতো পরিস্থিতি, তা আর কত খারাপ হবে, তখনই কিন্তু এটি আরও খারাপের দিকে মোড় নিচ্ছে।"

রাশিয়া এবং ইউক্রেন থেকেই বিশ্বের মোট গমের ২৫ শতাংশ রফতানি হয়। সানফ্লাওয়ার বীজ এবং তেলেরও অর্ধেক এই দুটি দেশে উৎপাদিত হয়। ইউক্রেন সারা বিশ্বের কাছে অনেক ভুট্টাও বিক্রি করে।

বিশ্লেষকরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এই যুদ্ধের ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদনের ওপর প্রভাব পড়তে পারে, এমনকি বিশ্বে গমের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান ডেভিড বিসলি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে বলেন, রাশিয়া এই যুদ্ধ শুরুর আগেই গত চার বছরে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা আট কোটি থেকে বেড়ে ২৭ কোটি ৭৬ লাখে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, নানা রকম যুদ্ধ-সংঘাত, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং করোনাভাইরাস মহামারি- সব মিলিয়ে একটা ভয়ংকর দুর্যোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সংকটের কারণে কিছু দেশ বিশেষভাবে সমস্যায় পড়তে পারে। কারণ এসব দেশে কৃষ্ণসাগর অঞ্চল থেকে বেশ উচ্চমাত্রায় খাদ্যশস্য আমদানি করে।

"যেমন লেবাননের খাদ্যশস্যের কমবেশি ৫০ শতাংশ আসে ইউক্রেন থেকে। ইয়েমেন, সিরিয়া, তিউনিসিয়া- এরকম আরও অনেক দেশের কথা আমি বলতে পারি, এসব দেশ তাদের খাদ্যের জন্য ইউক্রেনের ওপর নির্ভর করে," বলছেন তিনি।

আরও পড়ুন:

"কাজেই এই দেশটি, যারা ছিল এরকম এক খাদ্য ভাণ্ডার, তাদেরকেই এখন বাকী বিশ্বের কাছে হাত পাততে হবে। বাস্তবতাটা কীরকম অবিশ্বাস্য-ভাবে পাল্টে গেছে।"

নরওয়ের রাসায়নিক কোম্পানি ইয়ারা ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সার কোম্পানি, তাদের সার উৎপাদিত হয় বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশে। এই কোম্পানি বিবিসিকে জানিয়েছে, সার উৎপাদনে ঘাটতির কারণে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। আর এর ফলে বিশ্বে বিরাট খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

বিশ্বের গম রফতানির ২৫ শতাংশই আসে রাশিয়া আর ইউক্রেন থেকে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্বের গম রফতানির ২৫ শতাংশই আসে রাশিয়া আর ইউক্রেন থেকে

ইউক্রেনের একজন আইনজীবী ইভানা ডোরিচেংকো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ইউক্রেনের অনেক কৃষক এখন তাদের ক্ষেত-খামার ফেলে রাশিয়ার আক্রমণের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধে গেছেন।

তিনি বিবিসিকে বলেন, "যেসব পুরুষদের এখন ফসলের মাঠে কাজ করার কথা, তারা এখন আমাদের দেশ রক্ষার জন্য লড়ছেন। কারণ তারা যদি লড়াই না করেন, তাহলে তো পরে চাষ করার মতো জমিই থাকবে না। এখন আপনি ইউক্রেনে এমন একজন লোকও খুঁজে পাবেন না, যিনি এই কোন না কোনভাবে তার মতো করে দেশের লড়াইয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন না।"

ইভানা ডেরিচেংকো বলেন, কৃষি উৎপাদনের জন্য যে সরবরাহ ব্যবস্থা চালু ছিল, এই যুদ্ধের ফলে তা ভেঙ্গে পড়েছে। রাশিয়া তাদের অভিযান শুরুর পর ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দেশটির বন্দরে সব ধরণের বাণিজ্যিক জাহাজ পরিবহণ স্থগিত রেখেছে।

"জাহাজগুলো এখন বন্দর ছাড়তে পারছে না, জাহাজে মালামাল তোলা যাচ্ছে না। এটি কার্যত একটি যুদ্ধাঞ্চল। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, এখন ইউক্রেন থেকে এখন কোন কিছুই রফতানি করা যাচ্ছে না।"

তিনি বলেন, এর ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। কারণ ইউক্রেন এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকার মতো অঞ্চলে বা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মতো সংস্থায় কোন খাদ্য পাঠাতে পারছে না।

ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই অনেক দেশে খাদ্যে দাম ভীষণ বেড়ে গিয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতিবিদ ওয়ানডিল সিহলোবো বলেন, আফ্রিকা এবং বাইরের আরও অনেক যেসব দেশকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়, তাদের কী হবে, সেটা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান ডেভিড বিসলি: 'খাদ্যমূল্য আরও বাড়লে নরক নেমে আসতে পারে'

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান ডেভিড বিসলি: 'খাদ্যমূল্য আরও বাড়লে নরক নেমে আসতে পারে'

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

মি. সিহলোবো দক্ষিণ আফ্রিকার এগ্রিকালচারাল বিজনেস চেম্বারের প্রধান অর্থনীতিবিদ। তিনি বিবিসিকে বলেন, স্বল্পমেয়াদে হয়তো হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ার ব্যাপারটাই বড় সমস্যা, কিন্তু এরপর খাদ্য ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।

"এই যুদ্ধ কতটা তীব্র আকার নেয় এবং কতদিন ধরে চলে, তার ওপর নির্ভর করে, সামনের দিনগুলোতে আফ্রিকা মহাদেশে পাঠানো খাদ্য চালানে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকা এবং পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে," বলছেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, "আপনি যদি বিশ্বে খাদ্যের দামের সূচকের দিকে তাকান, এবছরের শুরুতে এটা কিন্তু কয়েক গুন বেশি ছিল। অনেক মানুষ কিন্তু এরই মধ্যে সংকটে আছে, এই যুদ্ধ সেই সংকট আরও গভীর করেছে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।"

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার কোম্পানিগুলোর একটি ইয়ারা ইন্টারন্যাশনাল সোমবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, এই যুদ্ধ সার উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে, যার প্রভাব পড়বে খাদ্য মূল্যের ওপর।

সার উৎপাদনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পটাশ এবং ফসফেট বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করে রাশিয়াও। গ্যাসের পাইকারি দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সারের দাম কিন্তু এরই মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে।