ইউক্রেন রাশিয়া সঙ্কট: লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক. সংঘাতের কেন্দ্রে দুই এলাকা সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে?

ছবির উৎস, Reuters
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে ইউক্রেনের একেবারে পূর্ব প্রান্তের দুটি এলাকা - দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের শক্ত ঘাঁটি এই দুটি এলাকায় সৈন্য পাঠিয়েছেন এবং এই দুটি এলাকাকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছেন।
এই দোনেৎস্ক আর লুহানস্ক সম্পর্কে আমরা কী জানি?
বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ২০১৪ সালে এই দুটি এলাকার বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং রুশ সীমান্তবর্তী ওই এলাকাকে দোনেৎস্ক পিপলস রিপাবলিক (ডিএনআর) এবং লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিক (এলএনআর) বলে ঘোষণা করে।
কিন্তু এই দুটি এলাকা অর্থনৈতিক এবং সামরিকভাবে পুরোপুরি রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
ইউক্রেন এই দুটি এলাকাকে উল্লেখ করে "সাময়িকভাবে অধিকৃত অঞ্চল" হিসাবে। ঠিক যেভাবে তারা ক্রাইমিয়াকে বর্ণনা করে। ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রাইমিয়ায় আগ্রাসন চালিয়ে ওই এলাকা রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেছিল।
দোনেৎস্ক গণ প্রজাতন্ত্র বা ডিএনআর-এর রুশ সমর্থিত নেতা ডেনিস পুশিলিন এবং লুহানস্ক প্রজাতন্ত্র এলএনআর-এর রুশ সমর্থিত নেতা লিওনিড পাসেচনিক ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের বিজয়কে স্বীকৃতি দেয়নি। এই দুই নেতাই তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা দুটি রুশ ফেডারেশনে যোগ দেবার আহ্বান জানান।
মানচিত্রে লুহানস্ক আর দোনেৎস্ক কোথায়?
ইউক্রেনের পৃথক হয়ে যাওয়া এই দুটি এলাকা ডনবাস নদী অববাহিকার অংশ এবং তারা "রুশ ডনবাস মতবাদে" বিশ্বাসী। তারা মনে করে ডনবাস এলাকা রাশিয়ার ভূখণ্ড।
কিন্তু এই দুটি এলাকাকে জাতিসংঘ ইউক্রেনের ভূখণ্ড হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এখন রাশিয়ার সৈন্য সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার মধ্যে থাকবে নাকি এই অভিযানের মাধ্যমে তারা দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক-এর আরও গভীরে তাদের অবস্থান সুসংহত করতে চাইবে তা স্পষ্ট নয়।

আরও পড়তে পারেন:
কয়লা খনি
উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ্বে দোনেৎস্ক ছিল কয়লাখনির মূল কেন্দ্র।
এই অঞ্চলের নাম প্রথমে ছিল ইউযোভকা বা ইউযিভকা। জন হিউস নামে ওয়েলসের একজন ব্যবসায়ীর নামে ওই এলাকার প্রথমে নামকরণ হয়। তিনি ওই এলাকায় ইস্পাতের কারখানা এবং বেশ কয়েকটি কয়লা খনি গড়ে তোলেন।
সোভিয়েত আমলে সেখানে ইস্পাত তৈরির কর্মকাণ্ড বেশ প্রসার লাভ করেছিল। এবং কারখানাগুলো ও কয়লাখনিগুলোতে কাজ করার জন্য বহু রুশ ভাষাভাষী মানুষকে ওই এলাকায় পাঠানো হয়।
শহরটির নতুন নাম হয় স্তালিন- ১৯২৪ সালে। এরপর ১৯২৯এ এই নাম বদলে হয় স্তালিনো এবং সবশেষ ১৯৬১ সালে দোনেৎস্ক।
লুহানস্ক আর দোনেৎস্ক-এ কী ঘটছে?
উনিশ'শ নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটার পর, এই দুটি এলাকা ইউক্রেনের অংশ হয়।
কিন্তু রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিশ্বাস করেন যে ইউক্রেন গড়ে তুলেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তিনি লিখেছেন যে, তার দৃষ্টিতে রাশিয়ান এবং ইউক্রেনিয়ানরা "একই মানুষ"।
এরপর, ২০১৪ সালে রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ইউক্রেন জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে সহিংস সংঘাত এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলো ক্রমশ ইউক্রেনের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে রাশিয়ার সঙ্গে তাদের একটা ঘনিষ্ঠ সংহতি গড়ে ওঠে, বলছেন নাটালিয়া সাভেলইয়েভা। তিনি ওয়াশিংটন ভিত্তিক সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান পলিসি অ্যানালিসিস নামে একটি সংস্থার গবেষক।
এই দুটি এলাকা আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অংশ না হলেও, ধারণা করা হয় ডনবাস এলাকার সাড়ে সাত লাখ মানুষের রুশ পাসপোর্ট আছে এবং রাশিয়ার নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার আছে।
এই সুবাদে তারা রাশিয়ার সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুবিধা নিতে পারে এবং রুশ পেনসনও তারা পায়। এ কারণে রাশিয়ায় তাদের জন্য চাকরিবাকরি করাও অনেক সহজ।
ওই দুটি অঞ্চলের বহু বাসিন্দা যদিও রাশিয়ার সঙ্গেই একাত্মতা অনুভব করে, কিন্তু সেখানে আবার এমন মানুষও আছে যারা ইউক্রেনের সাথে থাকতে আগ্রহী।
"ওরা আমাদের ভূখণ্ড অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে," বিবিসিকে বলেন দোনেৎস্ক এলাকার স্লোভিয়ানস্ক-এর বাসিন্দা ৬১ বছর বয়স্ক লুডমিলা। "ঠিক ক্রাইমিয়ার মতই। মি. পুতিন কেন এধরনের নীতির পক্ষে আমি ঠিক বুঝতে পারি না।"
কিন্তু নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক বাসিন্দা জানান - এখন পরিস্থিতি বদলের সময় এসেছে।: "একজন কাউকে তো একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হয় এদিকে নয় ওদিকে। হয়ত এর মধ্যে দিয়ে একটা বদল আসবে। আমার আশা এতে করে আমরা লাভবান হব।"

ছবির উৎস, Reuters
ইউক্রেন সম্পর্ক
অন্যদিকে ডনবাসের বাসিন্দাদের জন্য চিকিৎসা সহায়তা ও সমাজ কল্যাণ ভাতা পেতে ইউক্রেনের যাওয়া অনেক বেশি কঠিন।
ইউক্রেনের এই দুটি এলাকা এবং বাকি ইউক্রেনের মধ্যে মানুষের যাতায়াতের সংখ্যা ২০১৪-২০১৫র সংঘাতের পর থেকে কমে গেছে। এরপর করোনা মহামারির কারণে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ার কারণে চলাচল আরও সীমিত হয়ে গিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বিচ্ছিন্ন হওয় যাওয়া এলাকা থেকে মূল ইউক্রেনে যাতায়াত সামান্য কিছুটা বাড়লেও তা খুবই কম।
"রাশিয়ার সাথে রাজনৈতিক সংহতির পাশাপাশি ইউক্রেনের সাথে সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে একটা দূরত্ব সৃষ্টির চেষ্টাও রয়েছে," বলছেন ড. সাভেলইয়েভা।
ইউক্রেন এবং রুশ ভাষা
লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক ২০২০ সালে ইউক্রেনীয় ভাষাকে তাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসাবে বর্জন করেছে। সেখানে সরকারি ভাষা একটাই - সেটা হল রুশ ভাষা। স্থানীয় স্কুলগুলোতে ইউক্রেনীয় ভাষা এবং ইতিহাস পড়ানো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
"এর ফলে, সংঘাতের ঠিক আগে বা সংঘাত চলাকালীন যাদের জন্ম হয়েছে, সেই তরুণরা তাদের ইউক্রেনীয় পরিচিতি সম্পর্কে কিছুই জানে না," লিখেছেন ড. সাভেলইয়েভা।
তবে মি. পুতিন ইউক্রেনের এই দুটি অঞ্চল সম্পর্কে দীর্ঘ মেয়াদে কী ভাবছেন তা তিনি কখনই স্পষ্ট করেননি। তিনি শুধু কয়েকদিন আগে এই দুটি বিচ্ছিন্ন এলাকাকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছেন।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images
লুহানস্ক আর দোনেৎস্কএ 'শান্তিরক্ষা'
এই দুটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এলাকাকে স্বীকৃতি দেবার পর মি. পুতিন দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক-এ "শান্তিরক্ষা মিশনের" জন্য রুশ সেনা পাঠিয়েছেন। এর অর্থ হল রুশ সৈন্য এখন সার্বভৌম ইউক্রেন রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে মোতায়েন হবে।
"রুশ সৈন্যরা ইতোমধ্যেই স্ব-ঘোষিত দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক পিপিলস রিপাবলিক-এর সীমান্ত অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকেছে এবং উত্তর ও পশ্চিমে অবস্থান নিয়েছে," পলিটিকা স্ট্র্যানি নামে টেলিগ্রামে চ্যানেলে প্রকাশিত এক ভিডিওতে জানিয়েছেন তথাকথিত ডিএনআর-এর (স্ব-ঘোষিত দোনেৎস্ক প্রজাতন্ত্র) গণ পরিষদের একজন সদস্য ভ্লাসিলাভ বেরদিচেভস্কি।
"তাদের মিশন হল নিরাপত্তা বিধান, এবং প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন অংশে শান্তি প্রতিষ্ঠা," তিনি বলছেন।
দোনেৎস্ক আর লুহানস্কের মানচিত্র কী নতুন করে তৈরি হচ্ছে?
রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা যদি তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার পরিসর আরও বৃদ্ধি করেন এবং দোনেৎস্ক আর লুহানস্কের প্রশাসনিক এলাকার মধ্যে আরও বেশি করে ঢুকে পড়েন, তাহলে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
এখনও পর্যন্ত পশ্চিমা দেশগুলো রুশ সেনা অভিযানের জবাবে মস্কোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করার কথা বলেছে।
রুশ অভিযান এখন কোনদিকে গড়ায় তার ওপর এই দুই অঞ্চলের ভবিষ্যত এখন অনেকাংশেই নির্ভর করছে।








