আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সড়ক দুর্ঘটনা: কক্সবাজারে প্রয়াত বাবার শ্রাদ্ধর আয়োজন করার সময় পাঁচ ভাইয়ের প্রাণহানি
- Author, শাহনাজ পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে কক্সবাজারের চকোরিয়া উপজেলায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। খুব ভোরে মৃত বাবার শ্রাদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে পূজা করে ফেরার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ।
যেভাবে হল এই দুর্ঘটনা
ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে মৃত বাবার শ্রাদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে পূজা করে ফিরছিলেন সাত ভাই ও দুই বোন।
বাড়ির বেশ কাছেই রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা। এমন সময় সবজি বহনকারী একটি দ্রুতগামী পিকআপ গাড়ি তাদের ধাক্কা দেয়।
এতে একসঙ্গে চার ভাই নিহত হন বলে জানিয়েছেন চকোরিয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ ওসমান গনি। আহত হন আরো দুই ভাই ও এক বোন। চার ভাইয়ের মরদেহ দাহ শেষ হওয়ার আগে হাসপাতালে আরও এক ভাইয়ের মৃত্যুর খবর আসে।
মোঃ ওসমান গনি জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় গুরুতর অবস্থায় দুই ভাইকে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুপুরের পরে তাদের একজনের মৃত্যুর খবর আসে।
কক্সবাজারের একটি হাসপাতালে আহত বোনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর গাড়ি নিয়ে দ্রুত পালিয়ে গেছেন এর চালক। পিকআপ ও এর চালককে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বাবার মৃত্যু মাত্র দশদিন আগে
ঘটনাটি ঘটে চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট এলাকায় আরাকান সড়ক নামে পরিচিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে।
বাংলাদেশ সনাতনী সেবক সংঘের ডুলাহাজারা সভাপতি স্থানীয় চিকিৎসক সুমন নাথ জানিয়েছেন, তারা সবাই মিলে মৃতদের বাবার মরদেহ শ্মশানে দাহ করেছেন মাত্র দশদিন আগে।
তার শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের জন্য মৃত সুরেশ চন্দ্র শীলের পুরো পরিবার নিজেদের গ্রামে এসেছেন।
"হিন্দু ধর্মের রীতি অনুযায়ী ১১ তম দিনে মৃতের শ্রাদ্ধ আয়োজন করতে হয়। তার আগের দিন একটি পূজা দিতে হয়। সেসময় মৃতের ছেলেরা মাথার চুল কামিয়ে সাদা পোশাক পরেন।"
"সূর্য ওঠার আগে এই পূজা দিয়ে ফেরার সময় সবার পরনে সাদা পোশাক ছিল। দশদিনের মধ্যে পরিবারের ছয়জন নেই হয়ে গেলো, একসঙ্গে। এখন এগারো দিন পর একসঙ্গে পাঁচজনের শ্রাদ্ধ করবে পরিবারটা - এটা ভাবতেই কেমন যেন লাগছে।"
এদের মধ্যে একজন কাতার প্রবাসী ছিলেন। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে আটদিন আগে দেশে এসেছিলেন সৎকার ও শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে অংশ নেবার জন্য।
একদিনে চিতায় দাহ করা হল পাঁচ ভাইয়ের মরদেহ
স্থানীয় শ্মশান ঘাটে দুপুর দুটার পর থেকে জ্বলতে শুরু করেছে চিতার আগুন। সে আগুন যেন নিভছেই না।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সন্ধ্যা সাতটার দিকেও মরদেহ দাহ করার কাজ চলছিল।
সুমন নাথ জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় মৃত ভাইদের মধ্যে রয়েছেন বড়, মেজো ও সেজো ছেলে। চতুর্থ জন বেঁচে গেছেন। পঞ্চম ও ষষ্ঠ জন মারা গেছেন।
"ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বড় ভাইকে প্রথম চিতায় ওঠানো হয়েছে। বয়োজ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এটা করা হয়। এখনো সবাইকে দাহ করার কাজ সম্পন্ন হয়নি। যিনি চট্টগ্রামে মারা গেছেন, আমরা এখন তার মরদেহের অপেক্ষায় আছি।"
শ্মশানের পরিবেশ বর্ণনা করে তিনি বলছিলেন, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃতদের সন্তানদের মধ্যে প্রত্যেকের ছেলে মুখাগ্নি করেছেন। একে অপরের কাঁধে মাথা রেখে এই সন্তানেরা তাদের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
এলাকায় শোকের ছায়া
দুর্ঘটনার পর পুরো এলাকার বহু মানুষ ভিড় করেছেন শীল পরিবারের বাড়িতে।
ডুলাহাজারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম জানিয়েছেন, "ঘটনাটি সবাইকে ছুঁয়ে গেছে। সবাই মিলে তাদের মরদেহ সৎকারে সাহায্য করছে। এমন না যে শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা আসছেন। সবাই একত্রে সাহায্য করেছেন।"
তিনি বলছিলেন, চকোরিয়া ও কক্সবাজারের মধ্যেকার প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পুরো রাস্তাটি মারাত্মক দুর্ঘটনাপ্রবণ।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর বহু পথচারী মারা যান।