আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ভাষা: বাবরি চুল - কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মুঘল সম্রাট বাবর না অন্য কোথাও থেকে বুৎপত্তি এই শব্দ যুগলের?
- Author, সাইয়েদা আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাবরি চুল কথাটি শুনলে কাজী নজরুল ইসলামের চেহারাই হয়তো মানসপটে ভেসে উঠবে অনেকের - তাই প্রশ্ন জাগতেই পারে যে বিদ্রোহী কবির চুলের কারণেই বাবরি চুল শব্দের প্রচলন শুরু হয়েছে কি-না।
তাঁর কাঁধ পর্যন্ত ঢেউ খেলানো কোঁকড়া চুল ছিল বটে, কিন্তু কবি শামসুর রাহমানের অমর কবিতার পঙতি 'স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা' --বাংলাদেশের জাতীয় কবির ওই অবয়ব প্রতিষ্ঠা পাওয়ার অন্যতম কারণ।
আর ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের লম্বা চুল ছিল কি-না, কিংবা থাকলে তার সঙ্গে এ শব্দের কোন যোগাযোগ আছে কি না—সে সম্পর্কেও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না।
কিন্তু তাহলে এই 'বাবরি চুল' শব্দযুগল কোথা থেকে এসেছে?
বাংলা একাডেমীর অভিধানে 'বাবরি' শব্দটি দুই রকম বানানে লেখা হয়েছে - বাবরি এবং বাবরী।
এর অর্থ বলা হয়েছে, কাঁধ পর্যন্ত লম্বা কোঁকড়ানো চুল।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ শাহরিয়ার রহমান জানাচ্ছেন যে বাবরি শব্দটি এসেছে ফার্সি শব্দ বাবর বা বাব্বার থেকে - যার অর্থ সিংহ।
বাবরি মানে সিংহ সদৃশ বা সিংহের কেশরের মত কাঁধ ছাড়ানো চুল।
তবে বাবর বা বাব্বার শব্দের অর্থ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল কালাম সরকার বলেছেন, বাব্বার শব্দের অর্থ হিসেবে ফারসী অভিধানে লেখা আছে বাঘ বা বাঘ সদৃশ।
তবে বাব্বার শব্দের অর্থ ফারসীতে বাঘ বা সিংহ যা-ই থাকুক না কেন, বিশেষজ্ঞরা মোটামুটি একমত যে 'সাহসী' বোঝাতেই ব্যবহার করা হয় এই শব্দ।
এর কারণ, প্রাচীন শিকারকেন্দ্রীক ব্যবস্থায় বনের সবচেয়ে সাহসী প্রাণীর উদাহরণ দিয়ে পুরুষের সাহস বোঝানো হতো।
যে কারণে হাজার বছর ধরে সাহসী বোঝাতে একজন পুরুষকে বাঘ বা সিংহের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
বাংলা ভাষায় এমনকি 'পুরুষ-সিংহ' নামে একটি শব্দও আছে, যার মাধ্যমে মূলত সাহসী পুরুষকে বোঝানো হয়।
অধ্যাপক রহমান বলছেন, শব্দটি মূলত বীরত্বের সাথে সম্পর্কিত। বীরত্ব বা সাহসী বা যোদ্ধা---অর্থাৎ অত্যন্ত পুরুষালী পুরুষ বোঝাতে প্রাচীন সময় থেকে সিংহের সাথে বা বাঘের সাথে তুলনা করা হত।
"এর বাইরে, বিভিন্ন মিথলজিতে পুরুষের যে চিত্র দেখা যায়, তাতে তাদের লম্বা চুল দেখা যেত," বলেন তিনি।
আর হাজার হাজার বছর আগেও, যোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক, শিকারকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায় যে পুরুষের কথা জানা যায়, তাতে তাকে চিত্রিত করা হয়ে এমন একজন যে যোদ্ধা বা যে সাহসী অথবা যে নেতৃত্বে আছে--- এবং তাকে তুলনা করা হচ্ছে সিংহের সাহসের সাথে।
"আবার একই সঙ্গে তাদের ক্ষেত্রে চুল লম্বা রাখার চল দেখা যায়। ফলে এর সঙ্গে মিলিয়ে এটি সাহসের এবং শৌর্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে," বলেন অধ্যাপক রহমান।
এছাড়া হোমারের ইলিয়াড এবং ওডিসিতেও সিংহের ইমেজ বারবার এসেছে উপমা হিসেবে একিলিস এবং অন্য বীরদের বীরত্ব বর্ণনা করার জন্য।
কিন্তু বাঘ বা সিংহকে কেন সাহসের প্রতীক ভাবা হয়?
এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিকারকেন্দ্রীক সভ্যতায় যে সাহসী সেই নেতা হত - কারণ সে দলবল নিয়ে সবার জন্য খাদ্যের সংস্থান করত।
আর শিকার করতে গিয়ে বনে বড় ও হিংস্র প্রাণী, যেমন বাঘ বা সিংহের আক্রমণের শিকার হতে হতো। ফলে জয়ী হবার জন্য তাকে ওইসব প্রাণী বধের জন্য যথেষ্ঠ সাহসী, শক্তিশালী এবং ক্ষিপ্র হতে হতো।
ফলে জয়ী পুরুষের স্তুতি বা প্রশংসায় তাকে তুলনা করা হতো বাঘ বা সিংহের ক্ষিপ্রতা এবং সাহসের সাথে।
সেখান থেকেই কালের বিবর্তনে সাহসের উপমা দিতে মানুষ বিভিন্ন দেশে অঞ্চল ভেদে কোথাও বাঘ, কোথাও সিংহের উপমা দিয়ে আসছে।
আবার অঞ্চল ভেদে কোথাও বাঘ, কোথাও সিংহ জঙ্গলের রাজা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে।
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর: