বাঘ: সারা বিশ্বে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সাথে লড়তে পারছে না বনের রাজা

ইন্দোনেশিয়ার এই সুমাত্রা বাঘের আবাসভূমিতে তৈরি হচ্ছে দুটি বিশাল জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র।

ছবির উৎস, Pete Morris

ছবির ক্যাপশান, ইন্দোনেশিয়ার এই সুমাত্রা বাঘের আবাসভূমিতে তৈরি হচ্ছে দুটি বিশাল জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র।
    • Author, ম্যাট ম্যাকগ্রা
    • Role, পরিবেশ সংবাদদাতা

জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে সারা বিশ্বে বাঘ এবং জাগুয়ারের বসতি ধ্বংস হচ্ছে বলে নতুন এক রিপোর্ট বলছে।

গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, জলবিদ্যুতের জন্য বাঁধ নির্মাণের ফলে বিশেষভাবে এশিয়ার দেশগুলোতে মোট বাঘের সংখ্যার এক পঞ্চমাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কোন কোন দেশের অরণ্যে বাঘের সংখ্যা নিশ্চিহ্ন হতে চলছে বলে এই গবেষণার ফলাফল বলছে।

দক্ষিণ আমেরিকার চিতাবাঘ যা জাগুয়ার নামে পরিচিত বাঁধ নির্মাণের ফলে তাদের বিচরণক্ষেত্রের ওপর হুমকি চারগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে এই গবেষণার ফলাফল বলছে।

আরও পড়তে পারেন:

দক্ষিণ আমেরিকার বনের রাজা জাগুয়ার।

ছবির উৎস, Bjorn Olesen

ছবির ক্যাপশান, দক্ষিণ আমেরিকার বনের রাজা জাগুয়ার।

আধুনিক বিশ্ব বাঘের সাথে নির্মম আচরণ করেছে

একটি হিংস্র প্রাণী হিসেবে পরিচিত হলেও গত ১০০ বছরে বাঘের ৯০ শতাংশ আবাসভূমি ধ্বংস হয়েছে।

সম্প্রতি বছরগুলোতে বাঘের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও পরিবেশ সংস্থা আইইউসিএন একে বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রেখেছে।

কমতে কমতে সারা বিশ্বে এখন বাঘের মোট সংখ্যা প্রায় ৩,৫০০।

একই ঘটনা ঘটেছে জাগুয়ারের বেলাতেও।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় বিচরণ করতো জাগুয়ার।

তাদের সংখ্যা কমে এখন অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে।

নতুন এই গবেষণার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির জন্য বাঘ এবং জাগুয়ারের আবাসভূমি ধ্বংস হচ্ছে।

গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, অন্তত ১০০টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাঘ এবং জাগুয়ারের বিচরণক্ষেত্রগুলিকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে।

রাস্তাঘাট অনেক সময় বাঘের বিচরণক্ষেত্রকে কেটে টুকরো করে ফেলে। ফলে বাঘকে সেখান থেকে সরে যেতে হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রাস্তাঘাট অনেক সময় বাঘের বিচরণক্ষেত্রকে কেটে টুকরো করে ফেলে। ফলে বাঘকে সেখান থেকে সরে যেতে হয়।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:

অরণ্যের ভেতর নানা ধরনের নির্মাণকাজের জন্য যেসব ক্ষয়ক্ষতি হয় গবেষকরা তা বিশ্লেষণ করেছেন এবং দেখতে পেয়েছেন, বাঁধের জন্য জলাধার তৈরি করতে গিয়েছে বাঘের বিচরণক্ষেত্রের ১৩,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পানিতে ডুবে গেছে।

বাঘের সংখ্যার ওপর এর গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে বলে গবেষকরা মনে করছেন।

"বাঁধ নির্মাণের ফলে জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রতি পাঁচটি বাঘের একটি তার আবাসভূমি হারিয়েছে," বলছেন এই গবেষকদের একজন ইউনিভার্সিটি অফর পোর্তোর অ্যানা ফিলিপা পামেরিম।

"এই আবাসভূমি নষ্ট হওয়ার ফলে সার্বিকভাবে বাঘের সংখ্যা কমেছে।"

"বাঁধ নির্মাণ না করা হলে বাঘের সংখ্যা এখনকার চেয়ে ২০% বেশি হতো," বলছেন চীনের শেনজেনে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষক ড. লুক গিবসন। তিনিও এই গবেষণার একজন অংশ।

থাইল্যান্ডের চিউ লান লেক। একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য এখানে বাঘের বিচরণভূমিতে তৈরি করা হয় বিশাল এক জলাধার।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, থাইল্যান্ডের চিউ লান লেক। একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য এখানে বাঘের বিচরণভূমিতে তৈরি করা হয় বিশাল এক জলাধার।

"অনেক নীতিনির্ধারক বিশ্বব্যাপী বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি এমনকি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য স্থির করেছেন। তাই এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।"

কোন কোন দেশে বাঘের জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন হয়েছে।

এর পেছনে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে গবেষণায় বলা হচ্ছে।

একটু একটু করে বিপন্ন হচ্ছে বাঘ

জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের সময় রাস্তাঘাট তৈরি করতে হয়। এর ফলে যেসব অরণ্য অখণ্ড ছিল তা কেটে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

উনিশশো আশির দশকে থাইল্যান্ডের চিউ লান প্রকল্পের চারপাশে ১৬৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়।

এর মাধ্যমে ছোট-বড় ১০০টিরও বেশি দ্বীপ সৃষ্টি হয়।

"এর কিছুদিন পর ঐ এলাকা থেকে সব বাঘ পালিয়ে যায়," বলছেন ড. গিবসন।

ব্রাজিলের বালবিনায় একটি বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রায় ৩,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পানিতে তলিয়ে দেয়া হয়। এই জায়গায় একসময় জাগুয়ার বিচরণ করতো।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ব্রাজিলের বালবিনায় একটি বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রায় ৩,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পানিতে তলিয়ে দেয়া হয়। এই জায়গায় একসময় জাগুয়ার বিচরণ করতো।

"এর ফলে অরণ্যের একেবারে মাঝখানে একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জলাধার নির্মাণ করা হলে বাঘেরা আর খণ্ড খণ্ড জঙ্গলে আর টিকে থাকতে পারে না।," বলছেন তিনি।

জাগুয়ারদের জন্য ঝুঁকিটা আসছে ভবিষ্যতে

বর্তমানে নানা ধরনের নির্মাণের মধ্য দিয়ে জাগুয়ারের ২৫,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ইতোমধ্যেই ধ্বংস হয়েছে।

জাগুয়ার যেসব এলাকায় বিচরণ করে সেখানে বাঁধের সংখ্যা চারগুণ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এসব বাঁধের অনেকগুলোই তৈরি হবে অ্যামাজনের অরণ্যে।

জাগুয়ার চড়ে বেড়ায় এমন এলাকায় ব্রাজিল অন্তত ৩০০টি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।

অ্যামাজনের অরণ্যে নদীর পারে বসে আছে একটি জাগুয়ার।

ছবির উৎস, MAURO PIMENTEL

ছবির ক্যাপশান, অ্যামাজনের অরণ্যে নদীর পারে বসে আছে একটি জাগুয়ার।

এজন্য পরিবেশের ক্ষতির চেয়েও অর্থনৈতিক উন্নতির লাভ বেশি হবে কিনা এই গবেষণার বিজ্ঞানীরা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

"পরিবেশ সংরক্ষণকারীদের জন্য এটা একটি বিপদের ঘণ্টা বাজাবে," বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিল কার্টার।

"অনেক বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই ভূমি পরিকল্পনাকারী, জ্বালানি উৎপাদক এবং ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে নিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণকারীদের কাজ শুরু করতে হবে। তা না হলে ঐ এলাকার প্রাণীকুল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে," বলছেন তিনি।

ভিডিও: যেভাবে শিকার ধরে রয়েল বেঙ্গল টাইগার [ইংরেজি ভাষায়]