আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
শিশুর নিরাপত্তা: ঘরে দুর্ঘটনা ঠেকাতে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের জন্য যেসব বাড়তি সতর্কতা দরকার
- Author, শাহনাজ পারভীন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
দু'হাজার উনিশ সালের মার্চ মাসের এক বিকেল। একটু চা খাবেন বলে ১৬ মাস বয়সী ছেলে শিশুর মা আসমা খন্দকার চুলায় গরম পানি বসিয়েছেন।
মায়ের পিছন পিছন গুটিগুটি পায়ে ছেলেও যে কখন রান্নাঘরে ঢুকে গেছে - সেটি খেয়াল করেননি তিনি।
পানি ফুটে উঠলে একটি কাপে সেই টগবগে ফুটন্ত গরম পানি খানিকটা ঢেলে গুঁড়ো দুধের কৌটার দিকে হাত বাড়ালেন তিনি।
"মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য অন্যদিকে ঘুরেছি - আর শুনি চিৎকার। কাপ ধরে টান দিয়েছে দেখার জন্য। সাথে সাথে টগবগে গরম পানি ওর মুখে, পেটে এবং বাম হাতে", কথা গুলো বলতে গিয়ে শিউরে উঠছিলেন আসমা খন্দকার।
তিনি বলছেন, রান্নাঘরে কেউ না থাকলে সাধারণত বাইরে থেকে দরজা বন্ধ রাখা হয়।
সেদিন কয়েক সেকেন্ডের অসচেতনতায় যা ঘটেছে তার জন্য শিশুটিকে এক বছরের মতো কষ্ট পেতে হয়েছিল।
"ওকে হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে চারদিন সহ এগারো দিন হাসপাতালে রাখা হয়েছিল। পোড়া জায়গাগুলো পুরোপুরি সেরে উঠতে একমাসের মতো লেগেছিল। আর দাগ দুর হতে এক বছরের মতো। ওই ঘটনা যতবার চিন্তা করি আমি মা হিসেবে খুব অপরাধবোধে ভুগি" - ছেলের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে গলা বুঁজে আসছিল তার।
চিকিৎসক সেদিন বলেছিলেন, চোখে এবং বিশেষ করে গলায় গরম পানি না পড়াতে শিশুটি আরও বড় বিপদের কবল থেকে বেঁচে গেছে - কারণ গলায় শ্বাসনালী থাকে।
যেসব দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডাক্তার রিয়াজ মোবারক বলছেন, তার অভিজ্ঞতায় ঘরে দুর্ঘটনার শিকার শিশুকে সবচেয়ে বেশি নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে থাকে - পড়ে গিয়ে আঘাত, গরম পানি ও আগুনে পুড়ে যাওয়া, বোতাম, মার্বেল বা পয়সার মত ছোট কোন কিছু গিলে ফেলা, গলায় ফাঁস লাগা, অথবা ঘুমের ওষুধ বা বড়দের অন্য কোন ওষুধ, টয়লেট পরিষ্কারক, পোকা মারা ওষুধ - এমন কিছু খেয়ে ফেলা ইত্যাদি।
তবে ঘরের ভেতরে পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। তার কাছে নিয়ে আসা একটি মৃত শিশুর ঘটনা সম্পর্কে বলছিলেন অধ্যাপক রিয়াজ মোবারক।
"বাচ্চাটা কোন ফাঁকে বাথরুমে ঢুকে বালতিতে রাখা পানি নাড়াচাড়া করছিল। উপুড় হয়ে পানি ধরতে গিয়ে মাথাটা ভেতরে ঢুকে পানির নিচে চলে গিয়েছিল। সে নিজেকে আর টেনে তুলতে পারেনি। পাঁচ মিনিটের মত ওইভাবে ছিল। দেখুন মাত্র আধা বালতি পানি কিভাবে শিশুটির প্রাণ নিয়ে নিলো।"
বিবিসি বাংলায় সম্পর্কিত খবর:
বাংলাদেশের প্রধান উদ্ধারকারী সংস্থা হচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সংস্থাটির একজন পরিদর্শক নাসরিন সুলতানা বলছিলেন, "আমরা অনেক ধরনের উদ্ধার কাজে যাই। এর মধ্যে একটা বড় অংশ থাকে বৈদ্যুতিক তার ও আগুন সম্পর্কিত।"
"একবার এক বাসায় যেতে হয়েছিল একটি বাচ্চা বাথরুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা আটকে দিয়েছে। এখন আর ছিটকিনি খুলতে পারে না। আমরা গিয়ে দেখি সে ভেতরে কাঁদছে। বাবা মা বাইরে থেকে তাকে সান্তনা দিয়ে যাচ্ছে। আমরা পরে লক কাটার যন্ত্র দিয়ে দরজা কেটে তাকে বের করেছি।"
কৌতূহলের বয়স
অধ্যাপক রিয়াজ মোবারক বলছেন, শিশুরা যখন হাত দিয়ে কিছু ধরতে শেখে, দুলেদুলে হাঁটতে শুরু করে - তখন ছোট্ট এই বয়সে সব কিছুতে তার কৌতূহল তৈরি হয়।
"সব কিছু একটু নেড়েচেড়ে দেখা, জানালার গ্রিলে বেয়ে উঠে যাওয়া, টেবিল, চেয়ারে ওঠার চেষ্টা করা - এমন অনেক কিছুই তারা করে। "
ছোট্ট শিশুটির জীবনে এসব কাজ অনেক বড় সফলতা। কিন্তু প্রায়শই এই বয়সী শিশুদের কৌতূহল আর ঘরের খুব সাধারণ আসবাব, তৈজসপত্র এমনকি খেলনাও অনেক সময় তার বিপদের কারণ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা সংস্থা এনএইচএস বলছে দেশটিতে প্রতি বছর পাঁচ বছর ও তার নিচের বয়সী ৪০ হাজারের মতো শিশুকে নানা ধরনের দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় - যা ঘটে ঘরের ভেতরেই এবং যেসব দুর্ঘটনা খুব সহজে প্রতিরোধযোগ্য।
অধ্যাপক রিয়াজ মোবারক বলছেন, "বেশিরভাগ বাচ্চা নয় মাস বয়স থেকে এক বছর - এরকম সময়ে বস্তুর অস্তিত্ব বুঝতে শেখে। দুই বছরের দিকে সাধারণত শিশুরা হাঁটা শুরু করে। যখন তারা হাঁটা শেখে, কোনকিছু ধরতে শেখে তখন তাদের কৌতূহল তৈরি হতে থাকে।"
"সেসময় তারা অনেক কিছু করে যার বিপদ সম্পর্কে তারা বোঝে না - কারণ তাদের মধ্যে বিপদের বোধটা তখনো তৈরি হয়নি, কিন্তু কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তারা অনেক কিছু এক্সপ্লোর করে দেখতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে।"
শিশুর নিরাপত্তায় যা করা যেতে পারে
যে কয়েকটি ঘটনা শুরুর দিকে বর্ণনা করা হয়েছে তার সবগুলোই একটি বিষয়ে ইঙ্গিত দেয় - আর তা হল, শিশুদের দিক থেকে দৃষ্টি সরানো যাবে না, এক মুহূর্তের জন্যও অসচেতন হওয়া যাবে না।
ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক নাসরিন সুলতানা কয়েকটি পরামর্শ দিচ্ছেন।
*শিশুর জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে এমন সকল বস্তু তার হাতের নাগালের বাইরে রাখা। যেমন ম্যাচ, লাইটার, ছুরি, কাঁচি, স্টেপলার, নেইলকাটার, ঔষধ, জীবাণু ও কীটনাশক ইত্যাদি।
* মুখে ঢোকানো যায় এমন ছোট খেলনা না দেয়া।
* পুঁতি, মার্বেল, এগুলো ঘরে না রাখা। কয়েন বা বোতামের জন্য শক্ত করে বন্ধ করা যায় এমন বাক্স ব্যবহার করা।
* লম্বা তার রয়েছে এমন কিছু, যেমন মাল্টি-প্লাগ সরিয়ে রাখা, দেয়ালে প্লাগের ফুটো বন্ধ রাখা।
* রান্নাঘর ও বাথরুমের দরজা সবসময় বন্ধ রাখা।
* দরজা আছে এমন সকল আসবাবপত্র তালা বন্ধ রাখা। 'সেফটি লক' ব্যবহার করা।
* যেকোনো ধরনের বোতলের মুখ শক্ত করে আটকে রাখা।
* বিদ্যুৎ, গ্যাসের লাইন বা চুলা কোন ধরনের সমস্যা দেখা দিলে সাথে সাথে সারিয়ে ফেলা।
* ঘরের ভেতরে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য 'চাইল্ড প্রুফিং' করা। যেমন আসবাবের কোণার জন্য 'কর্নার প্যাড', দরজায় 'ডোর স্টপার', ঘরের নিচের দিকে প্লাগের 'সকেট কাভার', দরজায় ও সিঁড়িতে ছোট গেট বা 'চাইল্ড প্রুফিং গেট' বসানো। এই সব বস্তুই বাংলাদেশে অনলাইনে কিনতে পাওয়া যায়।
* এসব কেনা সম্ভব না হলে ঘর থেকে কার্পেট, কোণা যুক্ত আসবাব সরিয়ে রাখা। ছিটকিনির ফুটোতে কাঠি জাতীয় কিছু ঢুকিয়ে বন্ধ রাখা। প্লাগের ফুটোয় ভাল আঠাযুক্ত টেপ লাগিয়ে দেয়া।
মনে রাখতে হবে এই সব পদক্ষেপই যে যথেষ্ট তা ভাবার কিন্তু কোন কারণ নেই।