ব্রাহ্মণবাড়িয়া নৌকাডুবি: ২২ জনের মৃতদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় অনেক মানুষ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৌকাডুবির ঘটনায় শনিবার সকালে একটি শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। এ নিয়ে ওই ঘটনায় ২২ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা করেছে দমকল বিভাগ। তবে নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় এখনো সেখানে অবস্থান নিয়ে রয়েছে শত শত মানুষ।

শুক্রবার সন্ধ্যেবেলায় শতাধিক যাত্রীবাহী নৌকাটি একটি মালবাহী নৌযানের ধাক্কা লেগে নিমজ্জিত হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা মোঃ তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''এই পর্যন্ত আমরা ২২ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছি। আর কেউ নিখোঁজ আছে বলে আমাদের কাছে দাবি করেনি।''

নিখোঁজ থাকার তথ্য থাকলে তাদের উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানানা। নিমজ্জিত নৌকাটির ভেতরে কারও মৃতদেহ নেই বলে তিনি বলছেন।

তবে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংবাদিক মাসুক হৃদয় জানিয়েছেন, এখনো অন্তত ৩০ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে তাদের স্বজনরা দাবি করেছেন।

তিনি জানাচ্ছেন, নৌকাটি একটি গভীর খালে ডুবলেও বর্ষাকালে সেখানকার বিল ও নদী মিলেমিশে যায়। ফলে মৃতদেহ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন স্বজনরা।

যেখানে নৌকাডুবি হয়েছে, তার কাছাকাছি একটি নির্মাণাধীন সড়ক রয়েছে। বিজয়নগর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কের সঙ্গে সংযুক্তকারী এই সড়কের ওপরে এখন প্রশাসন, ফায়ারসার্ভিস এবং স্থানীয় শত শত মানুষ অবস্থান করছেন।

সাংবাদিক মাসুক হৃদয় বলছেন, ''শত শত স্বজন অপেক্ষা করছেন। তাদের অনেকের আত্মীয়স্বজন এখনো নিখোঁজ রয়েছে। গতকাল রাত থেকেই তারা এখানে বসে রয়েছেন।''

শুক্রবার বিকালে সাড়ে চারটার দিকে চম্পকনগর ঘাট থেকে ১৫০ জনের বেশি যাত্রী নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে ট্রলারটি রওনা হয়।

সন্ধ্যা ছয়টার দিকে বিজয়নগরে লইছকা বিলে বালুবাহী একটি স্টিলের নৌকার সঙ্গে যাত্রীবাহী নৌকাটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। নৌকার পেছনে থাকা আরেকটি বালুবাহী ট্রলার ছিল, সেটিও এই নৌকাকে সজোরো ধাক্কা দিলে যাত্রীবাহী নৌকাটি উল্টে ডুবে যায়।

খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস। মধ্যরাতে সেটি স্থগিত করা হলেও শনিবার সকাল থেকে আবার শুরু করা হয়েছে।

ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী ছিল নৌকায়

যাত্রীবাহী নৌকায় ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হচ্ছিল বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

ডু্বে যাওয়া নৌকায় ছিলেন ফারুক মিয়া। তিনি সাংবাদিকদের বলছেন, ''নৌকাডায় অনেক মানুষ ছিল, জায়গা ছিল না, কোনমতে আমি ছ্যাওডা (নৌকার ছই বা ছাদ) ধরছি। ভিতরে যাওয়ার মতো কোন পরিবেশ নাই। একজনের সাথে একজন লাইগা ছিল, এত মানুষ। আমি সামনে ছিলাম, নীচ থেকে অনেক কষ্ট কইরা বাইর হইছি, আমি মারাত্মক ব্যথা পাইছি।''

নৌকার যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে সাংবাদিক মাসুক হৃদয় জানাচ্ছেন, এমনিতে এসব নৌকায় ৭০/৮০ জন যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করে। তবে শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনেক মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন, যেহেতু এইদিন অনেক চিকিৎসক ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে এখানে আসেন। ফলে এদিন ভীড় বেশি ছিল আর নৌকাটিতে ধারণক্ষমতা অনেক বেশি যাত্রী নেয়া হয়েছিল।''

''কয়েকজনের মৃতদেহের সঙ্গে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন আটকে ছিল, কারও কারণ শরীরের সাথে থাকা ব্যাগে ওষুধপত্র ছিল। বোঝা যাচ্ছিল তারা ডাক্তার দেখাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছিলেন।'' বলছেন মাসুদ হৃদয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে ১০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এই ঘটনায় সাতজনকে আসামী করে বিজয়নগর থানায় একটি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওসি মীর্জা মোঃ হাসান।

তাদের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বালুবাহী ট্রলারের চালক ও মালিক রয়েছেন।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর: