চালের বাজার: ভারত থেকে চাল আমদানি করছে বাংলাদেশ, কিন্তু কেন আমদানি করতে হচ্ছে?

    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে সরকারিভাবে ভারত থেকে পাঁচ লাখ টন চাল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেসরকারিভাবেও দশ লাখ টন চাল আমদানির সুযোগ দেয়া হচ্ছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড: নাজমানারা খানুম বিবিসিকে বলেছেন, "করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ভারত থেকে চাল আমদানিতে খরচ কম পড়ছে। সেজন্য সরকারিভাবে চাল আনা হচ্ছে ভারত থেকে।"

তবে বেসরকারি আমদানিকারকরা তাদের সুবিধা অনুযায়ী যে কোন দেশ থেকে চাল আমদানি করতে পারবে বলে ড: খানুম জানিয়েছেন।

এ বছরের শেষে আমন ধান আসার আগ পর্যন্ত লম্বা সময়ে বাজার স্থির রাখতে চাল আমদানির এই পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হচ্ছে।

চাল আমদানি করা হচ্ছে এমন এক প্রেক্ষাপটে যখন মোটা চালের দামও কেজি প্রতি ৫০টাকার বেশি।

যদিও সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে, এবছর বোরো ধানের উৎপাদন ভাল ছিল।

এরপরও কেন চাল আমদানি করতে হচ্ছে-এই প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুন:

কেন চাল আমদানি করতে হচ্ছে?

এই প্রশ্নে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরিষ্কার জবাব পাওয়া যাচ্ছে না।

খাদ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে চাল সহায়তা দেয়া এবং টিসিবি'র মাধ্যমে কম দামে বিক্রির পরও সরকারের কাছে বার লাখ টনের বেশি চাল বেশি মজুত রয়েছে।

অন্যদিকে এ বছর বোরো ধানের উৎপাদনও ভাল হয়েছে বলা বলা হচ্ছে। এরপরও সরকারি এবং বেসরকারিভাবে চাল আমদানি করতে হচ্ছে।

ড: নাজমানারা খানুম বলেছেন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে অভিযান চালিয়ে মজুতদারির কোন সন্ধান পাওয়া যায় নি।

এছাড়া চালকলগুলোও নিয়মিত মনিটরিংয়ে রয়েছে বলে বলে তিনি দাবি করেন।

একই সাথে তার বক্তব্য হচ্ছে, "বড় ব্যবসায়ী বা যারা অন্য ব্যবসা করে, তারা ধান কিনে রাখতে পারে।"

ড: খানুম চাহিদা এবং উৎপাদনের মধ্যে ঘাটতির বিষয়ে সঠিক কোন তথ্য না থাকার কথাও তুলে ধরেন।

"চাহিদা এবং উৎপাদন-এই দু'টোর মধ্যে একটা গ্যাপ আছে-সেটা খুঁজে বের করতে হবে।"

ভারত থেকে চাল আনার কারণ কী?

নিম্নআয়ের মানুষের মাঝে যে মোটা চালের চাহিদা বেশি, খুচরা বাজারে সেই চালের কেজি এখন ৫০টাকার ওপরে। সব ধরনের চালের দামই বেড়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বলেছেন, করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে চালের দাম যে বেড়েছে, সেটা নিম্নআয়ের মানুষ এবং মধ্যবিত্তদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এমন পরিস্থিতিতে চালের বাজারের অস্থিরতা থামাতে চাল আমদানির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

ড: খানুম বলেছেন, চলতি অর্থবছরে সরকারিভাবে পাঁচ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি নেয়া আছে এবং কিছু দরপত্রও আহবান করা হয়েছে।

"এই চাল ভারত থেকে আনা হচ্ছে। কারণ ভারত থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে চাল পাওয়া যাচ্ছে" বলেন ড: খানুম।

তিনি জানিয়েছেন, "মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ড এর পক্ষ থেকেও আমাদের কাছে চাল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিল এবং আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু তাদের দাম বেশি হওয়ায় ভারত থেকে আনা হচ্ছে।"

বেসরকারি খাতে আমদানির সুযোগ?

সচিব জানিয়েছেন, বেসরকারিভাবে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টন চাল আমদানির সুযোগ দেয়ার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সেই প্রস্তাবে সম্মতি দিলে বেসরকারিভাবে আমদানির সুযোগ মিলবে।

বেসরকারি আমদানিকারকরা যে কোন দেশ থেকে চাল আমদানি করতে পারবেন বলে খাদ্য সচিব বলেছেন।

তবে শীর্ষ পর্যায়ের একজন বেসরকারি আমদানিকারক আবুল বশর চৌধুরী বলেছেন, বেসরকারি আমদানিকারকরাও মূলত ভারত থেকেই চাল আমদানি করে থাকেন।

এর কারণ হিসাবে তিনিও উল্লেখ করেন যে, ভারত থেকে চাল পরিবহণ সহজ হয় এবং খরচ কম পড়ে।

তবে থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমার থেকেও তারা অনেক সময় চাল এনে থাকেন।

মি: চৌধুরী বলেছেন, বেসরকারভাবে চাল আমদানির সুযোগ দেয়ার ব্যাপারে সরকার তাদের এখনও কিছু জানায় নি।

তাদের এই সুযোগ দেয়া হলে তারা আন্তর্জাতিক বাজার যাচাই করে চাল আমদানির উদ্যোগ নেবেন।

দেশে বোরো ধানের পরে ডিসেম্বরে আমন আসার আগ পর্যন্ত বাজার স্থির রাখতে চাল আমদানি করা হচ্ছে। একইসাথে তিনি উল্লেখ করেছেন,

মজুদারি কে করছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড: সায়মা হক বিদিশা বলেছেন, মিল মালিক এবং চালের বড় ব্যবসায়ী মজুত করে থাকতে পারে। এই বিষয়কে তিনি বড় সমস্যা হিসাবে দেখেন।

সরকারিভাবে এখন যে ধান চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে, তার আগেই চালকল মালিকরা ধান কিনে মজুত করে রেখেছেন - এমন অভিযোগও উঠেছে।

তবে মিল মালিকদের সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেছেন, এবার মোটা চালের আবাদই কম হয়েছে। সেজন্য এর দাম বেশি রয়েছে।

একই সাথে তিনি পাল্টা অভিযোগ করেছেন যে, "বোরো ধান আসার সাথে সাথে মিলাররা কেনার আগেই কে বা কাহারা বাজারে ধান কিনে নিয়েছে। মিলাররা সেজন্য এবার বেশি ধান সংগ্রহ করতে পারেনি।"

তিনি কাকে আসলে ইঙ্গিত করছেন-সে ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিষ্কার করে কিছু বলেননি।

এদিকে, সরকারিভাবে ধান চাল সংগ্রহের সময় কয়েকদিন পরই ১৬ই অগাস্ট শেষ হচ্ছে।

মিল মালিকরা এই সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন।

তবে সচিব ড: খানুম বলেছেন, এই সময় বাড়িয়ে তারা অসত্য ব্যবসায়ীদের সুযোগ দিতে চাইছেন না।