কুমির: খাল থেকে বাংলাদেশে বিলুপ্ত কুমির উদ্ধারের চেষ্টা ব্যর্থ, 'অহেতুক' আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান

    • Author, নাগিব বাহার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের ফরিদপুরের একটি জলাশয় থেকে তিনদিন কুমির উদ্ধারের চেষ্টা করে আপাতত রণে ভঙ্গ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয়রা।

জলাশয়টিতে অন্তত সাত দিন ধরে একটি কুমির অবস্থান করছে।

ফরিদপুর জেলার সদর উপজেলার নর্থচ্যানেল ইউনিয়নে পদ্মা নদীর সাথে সংযুক্ত একটি খাঁড়ি বা খালে কুমিরটি অবস্থান করছে বলে জানা গেছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই কুমিরটি মিঠা পানির কুমির, যেই প্রজাতিকে ২০০০ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অব নেচার) স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে।

বিলুপ্ত ঘোষণা করার আগে বাংলাদেশের জলাধারগুলোতে শেষবার এই ধরণের কুমির দেখা গিয়েছিল ১৯৬২ সালে।

তবে ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত তিনবার বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এই ধরণের কুমির দেখা গেছে বলে জানান বন বিভাগের কর্মকর্তারা।

আরো পড়তে পারেন:

তিনদিন ধরে কুমির ধরার চেষ্টা

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় গত ২৪শে জুলাই একজন স্থানীয় বাসিন্দা প্রথমবার কুমিরটি দেখতে পান।

কুমির দেখা যাওয়ার খবর প্রকাশিত হলে গত বুধবার বন অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের ১২ জনের একটি দল কুমিরটি ধরার জন্য ফরিদপুর যান।

ঐ দলটির নেতৃত্বে ছিলেন বন অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের একজন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল।

বিবিসি বাংলাকে নির্মল কুমার পাল বলেন, "আমরা শুরুতে খবর পেয়েছিলাম যে কুমিরটি আটকা পড়েছে। তাই দ্রুত সেটিকে উদ্ধার করতে যাই।"

"কিন্তু যাওয়ার পর দেখতে পাই কুমিরটি আটকা পড়েনি। নদীর সাথে সংযুক্ত যেই জলাধারে কুমিরটি রয়েছে সেখান থেকে চাইলেই এটি চলে যেতে পারে, কারণ চ্যানেলটির দুইদিকই নদীর সাথে যুক্ত।"

মি. পালের ধারণা চলে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া স্বত্ত্বেও একই স্থানে কুমিরটি বেশ কয়েকদিন অবস্থান করার কারণ সেখানে তার জন্য পর্যাপ্ত খাবারের সংস্থান।

"যেখানে কুমিরটি রয়েছে সেখানে একটি মাছের ঘের তৈরি করা আছে। ঠিক ঐ জায়গায় কুমিরটি অবস্থান করছে। আমার ধারণা সেখানে পর্যাপ্ত খাদ্য পাচ্ছে বলেই কুমিরটি সেখানে অবস্থান করছে।"

মি. পালের ভাষ্যমতে, কুমিরটি আকারে বেশ বড়, এর দৈর্ঘ্য ৮ থেকে ১০ ফিট হতে পারে।

মিঠাপানির কুমির সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না, কাজেই এই কুমিরটি ঐ অঞ্চলের মানুষের জন্যও কোনো ধরণের ঝুঁকির কারণ না হলেও স্থানীয় জনগণ কিছুটা আতঙ্কিত হওয়ায় বন বিভাগের দলটি কুমিরটি ধরার চেষ্টা চালায়।

তবে ২৮শে জুলাই থেকে ৩০শে জুলাই পর্যন্ত কয়েক দফায় কুমিরটি ধরার চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত কুমিরটি ধরা সম্ভব হয়নি।

বন বিভাগের কর্মকর্তা নির্মল কুমার বলেন, "আমাদের পরিকল্পনা ছিল কুমিরটি ধরে হয় নদীতে ছেড়ে দেবো অথবা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে নিয়ে রাখবো, যেখানে আরো দু'টি মিঠাপানির পুরুষ কুমির রয়েছে।"

কিন্তু দুই দিন স্থানীয়দের সাথে কয়েক দফায় চেষ্টা করেও কুমিরটি ধরতে সক্ষম হয়নি বন বিভাগের দলটি।

এই সময়ের মধ্যে অন্তত দু'বার কুমিরটিকে জালে আটক করা সম্ভব হলেও দুইবারই কুমিরটি জাল ছিড়ে বের হয়ে যায়।

"প্রথমবার জালটি ছিল ছোট, কুমিরটি সেই জাল ছিড়ে বের হয়ে যায়। পরদিন স্থানীয়দের সহায়তায় বড় জাল দিয়ে কুমিরটিকে ধরা সম্ভব হয়, কিন্তু ঐ জালটিও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তাই কুমিরটি আবারও জাল ছিড়ে বের হয়ে যায়।"

শুক্রবার দ্বিতীয় দফায় কুমির ধরার চেষ্টা ব্যর্থ হলে বন বিভাগের দলটি উদ্ধারকাজ স্থগিত ঘোষণা করে।

স্থানীয়দের 'অহেতুক' আতঙ্ক

কুমির উদ্ধারকাজ স্থগিত করার পর বন বিভাগের কর্মকর্তারা স্থানীয়দের সতর্ক করতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেন বলে জানান বন্যপ্রাণী সম্প্রসারণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা অঞ্চলের মৎস বিশেষজ্ঞ মফিজুর রহমান, যিনি ঐ উদ্ধার অভিযানের সাথে যুক্ত ছিলেন।

মফিজুর রহমান বলেন, "স্বাভাবিকভাবেই কুমিরটির খবর পাওয়ার পর ঐ অঞ্চলের মানুষ একইসাথে উৎসাহী এবং আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। আমরা যখন কুমির ধরার কার্যক্রম চালানোর সময় দুই দিনই অনেক মানুষ জলাধারের কাছে দাঁড়িয়েছিল।"

তবে উৎসাহের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে 'অহেতুক ও অযৌক্তিক' আতঙ্কও বিরজা করছিল বলে মন্তব্য করেন মি. রহমান।

মিঠাপানির কুমির নিজে থেকে আগ্রাসী হয়ে মানুষকে আক্রমণ করে না, তাই কুমিরটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে জানান মি. রহমান।

"এখানে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে কুমির নিয়ে একটি ভয় তৈরি হয়েছে। তবে আমরা গতকাল সারাদিন এলাকার মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছি যেন তারা কুমিরটি নিয়ে আতঙ্কিত না হয়।"

স্থানীয় মসজিদ থেকে মাইকিং করে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করে ঐ এলাকার বাসিন্দাদের বিভিন্ন রকম সতর্কতামূলক নির্দেশনা দেয়া হয়।

কুমিরটিকে কেউ দেখলে যেন আক্রমণ বা উত্যক্ত না করে, সেবিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানান মি. রহমান। আপাতত স্থানীয়রা যেন ঐ জলাশয়টি ব্যবহার না করেন, সেবিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

কীভাবে ফিরে আসছে বিলুপ্ত কুমির?

বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই বিলুপ্ত প্রজাতির কুমিরটি কীভাবে ফরিদপুরের জলাধারে এলো, সেসম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণা দিতে পারেননি বন বিভাগের কর্মকর্তারা।

তবে খুলনা অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল ধারণা করেন যে কুমিরটি ভারত থেকে নদীপথে এসে থাকতে পারে।

"বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হলেও ভারতে এই জাতের কুমির রয়েছে। আর এখন যেহেতু প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে ও নদীর পানির উচ্চতা বেড়েছে, এমন হতেই পারে যে এই কুমিরটি ভারত থেকে পদ্মা নদী হয়ে এই জলাধারে আশ্রয় নিয়েছে।"

বাংলাদেশের জলাশয়ে ১৯৬২ সালের পর মিঠাপানির কুমির দেখা যায় ২০১৫ সালে মাগুরায় মধুমতি নদীতে, অর্থাৎ ৫৩ বছর পর।

এরপর ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুইবার এই ধরণের কুমির দেখা যায়। এর মধ্যে একটি ছিল পাবনায় এবং আরেকটি রাজশাহীতে।

এই তিনটি কুমিরের মধ্যে দু'টিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল এবং সেগুলোকে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে রাখা হয়।

মৎস বিশেষজ্ঞ মফিজুর রহমান বলেন, "আমরা আশা করছিলাম, যদি এই কুমিরটি নারী হয় এবং গাজীপুরে থাকা পুরুষ কুমিরের সাথে প্রজননের মাধ্যমে যদি তাদের বংশবৃদ্ধি করানোর পদক্ষেপ নেয়া যায়, তাহলে হয়তো আবারো বাংলাদেশের নদীতে মিঠাপানির কুমিরের উপস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।"

ইতিবাচকভাবে দেখছে বনবিভাগ

যেই অঞ্চলে কুমিরটি অবস্থান করছে সেখানকার মানুষ কিছুটা আতঙ্কিত হলেও বন বিভাগ মিঠা পানিতে কুমির পাওয়া যাওয়ার ঘটনাকে বেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান বাংলাদেশের জলাশয়গুলোতে মিঠা পানির কুমিরের থাকার মত পরিবেশ থাকলেও মানবসৃষ্ট নানা কারণে এই প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে।

"মাছ ধরায় অনেকদিন ধরেই বেড় জাল ব্যবহার করে জেলেরা, যেসব জালে এই ধরণের কুমির আটকা পড়ে। তখন অনেকক্ষেত্রেই জেলেরা এসব কুমির মেরে ফেলতো।"

"আবার এসব কুমিরের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর জন্য তাদের যে দীর্ঘদিন সময় ও সুযোগ দিতে হয়, লোকালয়ের আশেপাশে থাকায় সেই সুযোগও তারা পায় না। আবার অনেকসময় মানুষ বা অন্যান্য প্রাণী কুমিরের ডিমগুলো নষ্ট করে ফেলে। যার ফলে এই ধরণের কুমির বিলুপ্ত হয়েছে।"

তবে গত ছয় বছরে চার বার বাংলাদেশের জলাশয়ে এই ধরণের কুমির দেখতে পাওয়াকে ইতিবাচক বলে মনে করা হচ্ছে।

"হয়তো এই কুমিরগুলো ভারত থেকে এসেছে, কিন্তু আমাদের জলাধারগুলোতে তাদের খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে বলেই হয়তো এসেছে", বলেন মৎস কর্মকর্তা মফিজুর রহমান।

"আমরা যদি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে পারি এবং আমাদের জলাধারগুলোতে এই জাতের কুমিরের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে হয়তো বহু বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটি প্রাণীকে আবার আমাদের পরিবেশে ফিরে পাবো।"