কোভিড: করোনাভাইরাসের প্রভাবে যেভাবে গোটা পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাবা-মাই পরিবারের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এ কারণে তাদের তুলনা দেয়া হয় বটবৃক্ষের ছায়ার সাথে।
সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় অনেক পরিবার হারিয়েছেন তাদের পরিবারের সেই পরম আশ্রয়ের ছায়া।
ওই পরিবারগুলো এখনও সেই শোক সামলে উঠতে পারেননি।
প্রথমে মা, দু'দিন পর বাবা
ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক বোরহানুল হক সম্রাট অল্প ব্যবধানে তার জীবনের সবচেয়ে নির্ভরতার দুই ছায়া হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
কোভিডে আক্রান্ত হয়ে প্রথমে মা আর দুইদিনের মাথায় তার বাবা মারা যান।
কাজের সূত্রে তারা সাত ভাইবোন ঢাকায় থাকলেও বয়স্ক বাবা মা থাকতেন কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে।
সম্প্রতি ওই জেলায় করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে মা বাবা দুজনই আক্রান্ত হয়ে পড়েন।
এরপর তাদের ঢাকায় এনে কোনভাবে চিকিৎসা করাতে পারলেও শেষ রক্ষা হয়নি কারও।
মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে মা বাবাকে হারিয়ে এখন শোকে স্তব্ধ মি. হক ও তার পুরো পরিবার।
মহামারী যেন তাদের মাথার ওপর ভরসার ছায়াটুকু কেড়ে নিয়েছে।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
মেনে নেয়া কঠিন
মি. হক বলেন তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে কথাগুলো বললেও তার সচেতন ও অবচেতন মনের সাথে তিনি প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলছেন।
তিনি এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না তার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই।
"এই অভিঘাত নেয়ার মতো না। এখনও আমার মাথার ৮০% মনে করে মা আছে, আব্বা আছেন,'' তিনি বলেন।
''এই ঘোরটা কাটছে না। যারা আমাদের পরিবারটিকে মালা গেঁথে রেখেছিলেন। আজ তারাই নাই।
''এখন চোখ খুললেই শুধু রোদ। মাথায় ওই ছায়াটা নাই। একদম তছনছ হয়ে গেছি।"
ভয়াবহ বাস্তবতা
ভয়াবহ এই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার কথা ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন কুমিল্লার এক চিকিৎসক।
বিবিসি বাংলার সাথে কথা বললেও তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি।
সম্প্রতি করোনাভাইরাসের কবলে তিনি মাকে হারান এরপর বাবাও কোভিডে আক্রান্ত হন।
চিকিৎসার পর বাবার স্বাস্থ্য পরীক্ষায় করোনাভাইরাস নেগেটিভ এলেও কোভিড পরবর্তী জটিলতায় চলতি মাসে তিনিও মারা যান।
ছয় মাসের ব্যবধানে বাবা মা দুইজনকে হারিয়ে এখন শোকে বিহ্বল এই তরুণ চিকিৎসক।
সবকিছুর পেছনে নিজেকেই দোষারোপ করছেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
এদিকে খুলনার মহানগরীর বাসিন্দা জুলফিকার আলীর বাবা মা একইদিনে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন।
কয়েক-ঘণ্টার ব্যবধানে মা বাবা হারানোর এই শোক প্রকাশের কোন ভাষা তার নেই।
"আমাকে আল্লাহপাক আমাকে কষ্টটা একটু বেশি করেই দিয়েছেন।
''আমরা আত্মীয় স্বজনরা সান্ত্বনা দিচ্ছেন কিন্তু পিতা মাতার জায়গা তো সারা পৃথিবীর সব মানুষ মিলেও পূরণ করতে পারবে না।" কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে মি. আলী।
কোভিডের প্রভাবে পরিবার ছিন্নভিন্ন
এই একেকটি অভিজ্ঞতাই বলে দেয় যে করোনাভাইরাসের প্রভাব একটি পরিবারকে কতোটা ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে।
এক্ষেত্রে প্রতিকারের আশা না করে প্রবীণদের করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে প্রতিরোধের ওপরেই বেশি জোর দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের গত ৭দিনের হিসেবে দেখা যাচ্ছে যে কোভিডে যারা মারা গেছেন তাদের ৭০-৮০ শতাংশের বয়স ৫১ বছরের বেশি।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মাহফুজা রিফাত বলেন যে, সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে সে অনুযায়ী চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
তাই প্রবীণরা যেন কোন অবস্থায় আক্রান্ত না হন সে ব্যাপারে পরিবারের অন্যদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
গ্রামে গ্রামে সংক্রমণ
এরপরও যদি বয়স্ক কারও মধ্যে কোভিড-১৯ এর লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে বিন্দুমাত্র দেরী না করে চিকিৎসা শুরুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মিস রিফাত।
"আগে করোনাভাইরাসের বিস্তার ছিল শুধু ঢাকা আর জেলা শহরগুলোয় এখন কিছু সারা বাংলাদেশে গ্রামে গ্রামে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে,'' তিনি বলেন।
''যেহেতু চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতা আছে সেজন্য বয়স্করা যেন আক্রান্ত না হন সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
''এরপরও আক্রান্ত হলে চিকিৎসায় কোন অবস্থায় দেরি করা যাবে না।"
বয়স্কদের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি
করোনাভাইরাসের নতুন যে ভ্যারিয়েন্টগুলো ছড়িয়ে পড়েছে সেগুলোয় সব বয়সী মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে।
কিন্তু বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা এবং আগে থেকেই নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাদের মৃত্যুর আশঙ্কা বেশি থাকে।
এ কারণে দ্রুত তাদের কোভিডের টিকা দেয়ার প্রয়োজন বলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।








