ইভ্যালিসহ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর আগাম অর্থ পাওয়া বন্ধ হচ্ছে

ইভ্যালি

ছবির উৎস, evaly.com.bd

ছবির ক্যাপশান, ইভ্যালি বলছে , পেমেন্ট নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে এখন তাদের ব্যবসার ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে হবে।
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে ইভ্যালিসহ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে গ্রাহকের কাছে পণ্য সরবরাহ করার আগে সেই পণ্যের জন্য কোন অর্থ পাবে না।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লোভনীয় নানা রকম অফার দিয়ে গ্রাহকের কাছে পণ্য সরবরাহের আগেই অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অর্থ নিচ্ছে এবং তা নিয়ে মানুষের হয়রানির অভিযোগ এসেছে।

সেজন্য কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, পণ্য গ্রাহকের হাতে পৌঁছানোর পরই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অর্থ পাবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা নিয়ন্ত্রণ করবে।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, সরকারি এই সিদ্ধান্ত তারা মেনে নিয়ে এখন সেভাবে তারা তাদের নীতিমালা তৈরি করবে।

ইভ্যালি এবং আলেশা মার্টসহ ১০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সর্বশেষ দু'টি বেসরকারি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক এবং ব্যাংক এশিয়া, ক্রেডিট, ডেবিট এবং প্রি-পেইড কার্ডের লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে।

এর আগে ব্র্যাক ব্যাংক লেনদেন বন্ধ করেছে।

আরও পড়ুন:

কী সিদ্ধান্ত হয়েছে?

বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর যে বৈঠক হয়, সেই বৈঠকের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেছেন, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর পেমেন্ট পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছেন।

"তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পেমেন্ট গেটওয়েগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হবে যে পণ্য ডেলিভারির পর গেটওয়েরা যখন তথ্য পাবে, এটা নিশ্চিত হওয়ার পর তারা পেমেন্টটা ই-কমার্স কোম্পানির জন্য রিলিজ করবে।

''পণ্য ডেলিভারির আগ পর্যন্ত তারা পেমেন্টটা হোল্ড করে রাখবে," বলেন মি. রহমান।

তিনি আরও জানিয়েছেন, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডে লেনদেনের গেটওয়ে আছে, এর মাধ্যমে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সাথে গ্রাহকের লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করবে।

লেন-দেন বন্ধের কার কী?

এমন সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মি. রহমান বলেছেন, "সমস্যা হচ্ছে যে, কিছু ই-কমার্স কোম্পানি ভোক্তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যথাসময়ে পণ্য দিচ্ছে না। এবং কিছু কোম্পানির হাতে অনেক ভোক্তার টাকা জমা হয়ে গেছে।"

"কিছু মার্চেন্ট যারা পণ্য সরবরাহ করে, তাদেরও টাকা জমা হয়ে আছে। এসব কোম্পানির কাছে। এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে ইভ্যালি একটা। এর সাথে আরও কোম্পানি আছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেই কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে" বলে উল্লেখ করেন মি. রহমান।

তবে ইভ্যালিসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান পণ্য সরবরাহ করার তিনমাস আগে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছে।

এই অর্থ নেয়ার ক্ষেত্রে অর্ধেক দামে বা কম দামে পণ্য দেয়ার নানা রকম লোভনীয় অফার দেয়া হচ্ছে। এটাই এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার অন্যতম ভিত্তি বলা হয়।

কিন্তু এই পদ্ধতিতে মানুষের হয়রানির নানা অভিযোগের তুলে ধরে সরকারি কর্তৃপক্ষ এখন বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছে।

ইভ্যালি কর্তৃপক্ষ কী বলছে?

ইভ্যালির কর্ণধার মোহাম্মদ রাসেল অবশ্য বলেছেন, পেমেন্ট নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে এখন তাদের ব্যবসার ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে হবে।

"কাস্টোমারের পেমেন্ট সিস্টেমে একটু পরিবর্তন আনবে। আমরাও এটাকে স্বাগত জানাই। নীতিনির্ধারকরা যে নিয়মকানুন করবেন, আমরাও চাই না তার বাইরে যেতে।"

তিনি আরও বলেন, "আগে পেমেন্ট করলে আমরা তা পেয়ে যেতাম। পণ্য সরবরাহকারির সাথে সেভাবেই ব্যবস্থা ছিল।

''এখন সরবরাহকারিকে যদি আমরা কনভিন্স করতে পারি যে আমাদের পেমেন্ট হোল্ড আছে এবং এখন আপনারা প্রোডাক্টটা দেন।"

একইসাথে মোহাম্মদ রাসেল মনে করেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রাথমিক।

"ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার বিষয় নিয়ে এবং এই ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হয়তো আমাদের সাথে আলোচনা করবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট

ছবির উৎস, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, ইভ্যালিসহ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো লোভনীয় যে সব অফার দিচ্ছে, তাতে ঝুঁকি রয়েছে। এই বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে যেকোন সময় তাতে ধস নামতে পারে।

এটাকে উদ্বগের বিষয় বলে বলছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

মূল্য ছাড় কি ঝুঁকিপূর্ণ?

তবে ইভ্যালির মোহাম্মদ রাসেল বলেছেন, বিভিন্ন যেসব অফার এখন রয়েছে, সেগুলো তাদের ব্যবসার কৌশল হিসাবে সাময়িক সময়ের জন্য।

"ই-কমার্সের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করার জন্য প্রোডাক্টের ব্যাপারে এ ধরনের অফার দেয়া হয়েছে। লোভতো ফাইন্যান্সিয়াল। আমি নিজেওতো বড় বড় ব্র্যাণ্ডগুলোর কাছে কাছে ডিসকাউন্ট দেখি।

''গ্লোবালি ব্য্যাণ্ডগুলোও ডিসকাউন্ট দেয়। আমাদের ব্র্যান্ডকে ঐভাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি" বলেন মোহাম্মদ রাসেল।

কিন্তু ইভ্যালিসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় একটা অভিযোগ হচ্ছে ফ্রিজ এবং টেলিভিশনের মতো পণ্য বাজার দরের অর্ধেক দামে দেয়ার কথা বলে তিন মাস আগে টাকা নেয়া হচ্ছে।

একটি টেলিভিশনের বাজার দর যদি ৫০,০০০ টাকা হয়, সেই টেলিভিশন ২৫,০০০ টাকায় দেয়া কীভাবে সম্ভব হচ্ছে-এটা আরও ঝুঁকি তৈরি করছে কীনা?

এই প্রশ্ন করা হলে ইভ্যালির মোহাম্মদ রাসেল পাল্টা প্রশ্ন করেন যে, "৫০ হাজারেরটা ২৫ হাজারে দিলে ঝুঁকি হচ্ছে - আর ৫০ হাজারেরটা ৫০ হাজারে দিলে কী ঝুঁকি হবে না?"

"আমরা কিন্তু একবারও বলছি না যে, আশি হাজার টাকার প্রোডাক্টটা সারাজীবন পঞ্চাশ হাজার টাকায় দিতে থাকবো। আমরা বলছি, আমরা কিন্তু ওভার দ্য টাইম।

''আমাদের ইভ্যালির শুরুতে কিন্তু ডিসকাউন্টের পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। এখন কিন্তু অনেক কমে আসছে," বলেন মোহাম্মদ রাসেল।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসার ব্যাপারে এখনও কোন নীতিমালা নেই।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, এখন দ্রুত একটি নীতিমালা তৈরি করা এবং তার আগে কিছু নির্দেশনা ঠিক করা হবে।

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর: