সরকারি কর্মকর্তাদের নাগরিকদের সাথে আচরণ বিষয়ে কী নির্দেশনা আছে?

ছবির উৎস, AHSAN SADIK
- Author, তাফসীর বাবু
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কিংবা বিভিন্ন কারণে দায়িত্বে থাকা কোন কোন সরকারি কর্মকর্তার আচরণ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনাও দেখা যায়।
গেলো মে মাসেই ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জে সরকারি হটলাইন ৩৩৩ এ কল করে ত্রাণ চাওয়ার পরে জরিমানার মুখে পড়েছিলেন একজন সাহায্যপ্রার্থী।
দরিদ্র না হয়েও ত্রাণ চেয়েছেন এমন অভিযোগে ১শ জন দরিদ্র মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে হয় তাকে। এই নির্দেশ দিয়েছিলেন সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
কিন্তু পরে সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তি সত্যিই অভাবে আছেন এবং তিনি ঋণ করে জরিমানার টাকা জোগাড় করে ১শ জন দরিদ্র মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে বাধ্য হয়েছেন এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে সেই শাস্তি প্রত্যাহার হয়, তাকে ক্ষতিপূরণও দেয়া হয়।
এর কয়েকদিন পরেই বগুড়ায় উপজেলা পরিষদের ফুলগাছ খেয়ে ফেলায় ছাগল মালিককে জরিমানার ঘটনাটিও বেশ আলোচিত।
সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধি আছে?
বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি আচরণ বিধিমালা আছে ১৯৭৯ সালের। । এটির নাম সরকারি কর্মচারি (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯। এটি অবশ্য ২০০২ সালে এবং ২০১১ সালে দুই দফায় সংশোধিত হয়।
এই আচরণ বিধিমালায় মোট ৩৪টি নির্দেশনা আছে।
দেশে বা বিদেশে কারো কাছ থেকে উপহার বা পুরস্কার নেয়া, যৌতুক দেয়া-নেয়া, ব্যক্তিগত ব্যবসা, রাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী সহকর্মীর সঙ্গে আচরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি কর্মচারিদের কার্যক্রম কেমন হবে তার নির্দেশনা আছে।
তবে শুধু নাগরিকদের সঙ্গে আচরণ বিষয়ে আলাদা কোন বিধি নেই।
তবে নাগরিকদের সঙ্গে যে কোন অসদাচারণ শাস্তিযোগ্য হবে এমন একটি বিধি আছে ২০১৮ সালের সরকারি কর্মচারি (শৃংখলা ও আপিল) বিধিমালায়।
সেখানে অসদাচারণের সংজ্ঞাও দেয়া আছে।
আরো পড়তে পারেন
যেখানে অসদাচরণ বলতে বোঝানো হয়েছে- অসংগত আচরণ, চাকুরী-শৃংখলা হানিকর আচরণ কিংবা শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণকে।
যদিও এসবেরও বিস্তারিত আলোচনা নেই।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃংখলা ও তদন্ত অনুবিভাগের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব এ এফ এম হায়াতুল্লাহ বলেন, এই আচরণবিধি এবং চাকুরী বিধির প্রশিক্ষণ নিয়েই কর্মকর্তারা চাকুরীতে যোগ দিয়ে থাকেন।
তিনি বলছিলেন, "আচরণবিধিতে জনগণের কথা স্পেসিফিক না বলা থাকলেও সে কি কি করতে পারবে না, কোন কাজটা সরকারি কর্মচারীর জন্য শোভন, কোনটা অশোভন - এগুলো কিন্তু ডিটেইলস বলা আছে।"
"ভদ্রজনের জন্য অশোভন কোন আচরণ, সেটাই 'অসদাচারণ'। অর্থাৎ আমি যদি কোন অঙ্গ-ভঙ্গি করি, কোন শব্দ উচ্চারণ করি, এইযে নাগরিককে কান ধরে উঠবস করানো এগুলোও অসদাচারণ।"

ছবির উৎস, ARIFUL ISLAM/FACEBOOK
কী শাস্তি আছে?
সরকারি কর্মচারি বিধিমালায় বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত আছে। সেখানে অসদাচারণকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলা হয়েছে।
সব অপরাধেরই শাস্তি মূলত: দুই ধরণের - লঘুদণ্ড এবং গুরুদণ্ড।
লঘুদণ্ড আছে চার ধরণের।
- তিরস্কার
- নির্দিষ্ট মেয়াদে পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত
- জরিমানা এবং
- বেতন গ্রেডের অবনমন
গুরুদণ্ডও আছে চারটি।
- বেতন গ্রেডের অবনমন
- বাধ্যতামূলক অবসর
- চাকুরী থেকে অপসারণ এবং
- বরখাস্ত
জনপ্রাশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এফ এম হায়াতুল্লাহ বলছেন, কেউ অসদাচারণ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অন্যকোন অপরাধ করলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারিত হবে।
কোন অভিযোগ আসলে তাকে নোটিশ, তদন্ত, বিভাগীয় মামলা সবকিছুরই লিখিত এবং সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। কেউ শাস্তি পেলে এর বিরুদ্ধে আপিলও করা যায়।
শাস্তি কি হয়?
মি. হায়াতুল্লাহ বলছেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আচরণবিধি মানছেন কি-না, অসদাচারণ করছেন কি-না সেসব বিষয়ে তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পদ্ধতি আছে। এটা শুধু অসদাচারণ নয়, অন্য অপরাধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
"মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যক্রম জেলা প্রশাসকের সাধারণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। জেলা প্রশাসকের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে থাকে বিভাগীয় কমিশনারের। এভাবেই অধঃস্তনের উপর উর্দ্ধতনের চেক এন্ড কন্ট্রোল সিস্টেম আছে।"
মি. হায়াতুল্লাহ বলছেন, অভিযোগ আসলে বা কারো কোন অপরাধ ধরা পড়লে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার অসংখ্য উদাহারণ আছে।
অনেকেই শাস্তি পেয়েছেন, চাকুরিচ্যুতও হয়েছেন।
তবে তদন্ত এবং বিভাগীয় মামলার প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগে বলে স্বীকার করছেন তিনি।
তিনি বলছেন, "তদন্ত হতে সময় লাগাটা অস্বাভাবিক নয়। হয়তো একবছর, দুই বছর সময় লেগে যায় বিচারটা শেষ হতে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ততদিনে হয়তো ভুলে যায়।"
"দেখা গেছে, অনেক আলোচিত ঘটনায় অভিযুক্তরা এখন গুরুদণ্ড ভোগ করছেন। আমরা সাজার বিষয়টা প্রজ্ঞাপন আকারে দিয়ে দিই। কিন্তু তখন হয়তো সেভাবে আলোচিত হয় না।"
এরপরও কেন অসদাচারণ ঘটছে?
মি. হায়াতুল্লাহ এর জন্য ব্যক্তি'র দায় দেখছেন।
তিনি বলছেন, প্রশিক্ষণ এবং সুস্পষ্ট নিয়ম-কানুন জানার পরও যদি কেউ সেটা লংঘন করে, তার দায় ব্যক্তির উপরই বর্তায়। এর পেছনে পারিবারিক শিক্ষা এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে জনগণের সঙ্গে কর্মকর্তাদের উদ্ধত আচরণ এবং অসদাচারণের জন্য আর সবকিছুর সঙ্গে প্রশাসনের রাজনীতিকীকরণকেও অনেকে দায়ী করে থাকেন।
জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলছেন, সরকারি কর্মচারীদের জনবান্ধব করতে রাজনৈতিক ব্যবস্থারও দায় আছে।
তিনি বলছেন, "আমরা একটা মন্দ প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখানে ডেমোক্রেসি যদি ফাংশনাল হয়, তাহলে কিন্তু জনপ্রশাসনও কিন্তু অধিকতর জনমুখী হতে বাধ্য।"
"পাশাপাশি উপরের কর্মকর্তাদেরও ভাবতে হবে যে, তারা শুধু জনগণের সেবা দেয়ার জন্যই দায়বদ্ধ," বিবিসিকে বলেছেন মি. মজুমদার।








