ফোন করে ত্রাণ চাওয়ার শাস্তি: মেয়ের গয়না বন্ধক রেখে উল্টো ৬০ হাজার টাকার ত্রাণ দিতে হয়েছে যাকে

ছবির উৎস, AHSAN SADIK
নারায়ণগঞ্জে এক সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উল্টো শাস্তি স্বরূপ একশো জন দুঃস্থ ব্যক্তিকে ত্রাণ দিতে বাধ্য করেছেন, এমন অভিযোগ ওঠার পর জেলা প্রশাসন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
সদর উপজেলার নাগবাড়ী এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ ফরিদ আহমেদ বিবিসিকে বলেন, তিনি গত বুধবার ৩৩৩ নম্বরে ফোন দিয়ে সরকারের কাছে খাদ্য সহায়তা চান।
করোনা মহামারিকালীন দুর্যোগে দরিদ্র ও দুঃস্থ মানুষ যাতে ঘরে বসেই সাহায্য পেতে পারে সেজন্য ৩৩৩ নম্বরের এই হটলাইনটি চালু করে সরকার।
মি. আহমেদ বলছেন, দুই দিন পর তাকে একটি ফিরতি ফোন করা হয় এবং তার পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। এসময় তাকে ত্রাণ দেয়া হবে বলেও নিশ্চিত করা হয়।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরা ত্রাণ নিয়ে মি. আহমেদের বাড়িতে যান।
ফরিদ আহমেদ বলছেন, তিনি যে ভবনটিতে থাকেন, সেটি একটি চারতলা বাড়ি, এটি তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। মি. আহমেদরা সাত ভাই-বোন বাড়িটির মালিক। সেই হিসেবে নিজের ভাগে পাওয়া ফ্ল্যাটটিতে পরিবার নিয়ে থাকেন মি. আহমেদ।
ইউএনও ত্রাণ নিয়ে এসে যখন জানতে পারেন যে, ফরিদ আহমেদের চার তলা ভবনের মালিকানা আছে, তখন তিনি ত্রাণসামগ্রী না দিয়ে উল্টো ফরিদ আহমেদকে নির্দেশ দেন একশোটি দুঃস্থ পরিবারকে ত্রাণসামগ্রী দেবার জন্য।

ছবির উৎস, AHSAN SADIK
ফরিদ আহমেদ বিবিসিকে বলছেন, তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি একটি হোসিয়ারি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। যেখানে তিনি সপ্তাহে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পান।
বিবিসি বাংলার আরো খবর:
ফলে তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়ির একাংশের মালিক হলেও, তিনি অত্যন্ত দরিদ্র এবং ত্রাণ তার সত্যিই দরকার ছিল।
কিন্তু ইউএনওর দেয়া নির্দেশ অনুযায়ী একশো জনকে ত্রাণ দিতে তার ষাট হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এই টাকা জোগাড় করতে তার বেশ কষ্ট হয়েছে। এজন্য তাকে মেয়ের গয়না বন্ধক রাখতে হয়েছে এবং কর্জ করতে হয়েছে।
এই ঘটনাটি নিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে।
অনেকে এমন প্রশ্নও করছেন যে, ইউএনওর তরফ থেকে এ ধরণের শাস্তি দেয়া কতটা আইনসিদ্ধ?
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শামীম বেপারী বলছেন, প্রশাসনের আইন অনুযায়ী এমন শাস্তির কোন উল্লেখ নেই।
মি. বেপারী তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটির প্রধান, যে কমিটিটি নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক গঠন করেছেন ঘটনা খতিয়ে দেখতে।

ছবির উৎস, AHSAN SADIK
এ বিষয়ে ইউএনও আরিফা জহুরার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে শামীম বেপারী বলছেন, ভুল বোঝাবুঝি থেকেই পুরো ঘটনাটি ঘটেছে।
"সেদিন সেখানে কোন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়নি। যার কারণে শাস্তি দেয়ার বিষয়টি আসে না", বিবিসিকে বলেন মি. বেপারী।
তবে তদন্ত শেষ হলে বোঝা যাবে আসলে কী ঘটেছিল, উল্লেখ করেন মি. বেপারী।
শামীম বেপারী আরো বলেন তদন্তে তারা জানতে পেরেছেন, ফরিদ আহমেদের আসলেই ত্রাণের কোন প্রয়োজন ছিল না। তিনি ৩৩৩ নম্বরে ফোন করেছিলেন এটা দেখতে যে আসলেই সাহায্য পাওয়া যায় কিনা।
তবে শামীম বেপারীর এই অভিযোগ অস্বীকার করে ফরিদ আহমেদ বলেন, "দরকার না হলে তো আর আমি ফোন করে ত্রাণ চাইতাম না।"
এদিকে শামীম বেপারী বলেন, ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে মূলত দিনমজুর, রিক্সাচালক, যানবাহন শ্রমিক, বেদে পল্লী, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বা করোনার কারণে কাজ হারিয়েছেন এমন মানুষজন সাহায্য চাইতে পারবেন। কোন বেতনভোগী ব্যক্তি এই দুঃস্থদের তালিকায় পারেন না।
তিনি বলেন, মি. আহমেদ একটি হোসিয়ারি কারখানায় কাজ করেন এবং মাস শেষে তিনি প্রায় ১২ হাজার টাকার মতো বেতন পান। যার কারণে তিনি এই খাদ্য সহায়তা কর্মসূচীর আওতাভুক্ত হতে পারেন না।
এদিকে এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার পর নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় এক ব্যক্তি ফরিদ আহমেদকে ষাট হাজার টাকা দিয়েছেন বলে জানাচ্ছেন তিনি।








