কোভিড: সংক্রমণের আকস্মিক বৃদ্ধিতে উদ্বেগের মুখে বিশেষ লকডাউনে বিচ্ছিন্ন চাঁপাইনবাবগঞ্জ

বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো একজন রোগী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে একটি জেলায় সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনাভাইরাস সংক্রমণ উদ্বেগজনকহারে বেড়ে যাওয়ার কারণে জেলাটিকে দেশের অন্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, সাত দিনের বিশেষ লকডাউনের মঙ্গলবার প্রথমদিনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাত্রীবাহী সব ধরনের যানবাহন বন্ধ রেখে মানুষের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

স্বাস্থ্যকর্মীরা বলেছেন, ভারতের সাথে সীমান্তবর্তী এই জেলায় সংক্রমণ আকস্মিকভাবে কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় দেশের অন্য অঞ্চলেও তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তারা জানিয়েছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় করোনাভাইরাস আক্রান্তদের মধ্যে ৪২জনের নমুনা ঢাকায় পরীক্ষা করে একজনের শরীরে ইণ্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার পাঁচ শতাংশেরও নিচে ছিল লম্বা সময় ধরে।

কিন্তু ঈদের পরে গত সাত দিনে জেলাটিতে লাফিয়ে লফিয়ে সংক্রমণ বেড়ে এর হার ৫৫ শতাংশে উঠে যায়।

গত সাত দিনে সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা তিনশো'র বেশি বলে বলা হচ্ছে।

আরও পড়ুন:

সারাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার যখন আট থেকে দশ শতাংশ, তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণের হার ৫০ শতাংশের বেশি।

ছবির উৎস, GOOGLE MAPS

ছবির ক্যাপশান, সারাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার যখন আট থেকে দশ শতাংশ, তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণের হার ৫০ শতাংশের বেশি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা: জাহিদ নজরুল চৌধুরী বলেছেন, সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়েছে এবং সেজন্য সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে জেলাটির সাথে সব জেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে।

"সারাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার এখন আট থেকে দশ শতাংশ। সে জায়গায় এখানে ৫০ শতাংশ। এটাই উদ্বেগের। আমরা যদি এখন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নেই, তাহলে পুরো দেশে যদি ছড়িয়ে পড়ে, সেটা খুবই খারাপ হবে। এটাই বেশি উদ্বেগের," তিনি মন্তব্য করেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের একজন বাসিন্দা ফারুকা বেগম সেখানে নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেন।

তিনি বিশেষ লকডাউনের প্রথমদিনে নিজের এলাকার বাইরে শহরের অন্য এলাকায় যেতে পারেননি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ির কারণে।

ফারুকা বেগম বলেছেন, করোনাভাইরাস নিয়ে তাদের জেলায় মানুষের মাঝে সাধারণভাবে কোন ভাবনাই ছিল না। কিন্তু এখন কিছুটা ভয় তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

"আমাদের অনেকে কিন্তু আগে মাস্ক ব্যবহার করতো না। এখন সুর পরিবর্তন হয়েছে মানুষের। কয়েকদিন আগেও বলতো যে আমাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জে কিছু হবে না। আমরা অনেক শক্তিশালী। আমরা আমটাম খাই, আমাদের অনেক শক্তি আছে। তবে এখন দু'দিন ধরে দেখছি, মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে এবং মাস্ক পরছে সবাই" বলেন ফারুকা বেগম।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাপাইনবাবগঞ্জের এক উপজেলা থেকে আরেক উপজেলার এবং অন্যান্য জেলার সড়ক ও রেল যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

সেখানকার জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ বলেছেন, শুধু পণ্য পরিবহণ চলাচল করতে পারছে। এছাড়া যেহেতু আমের মৌসুম শুরু হচ্ছে, সেজন্য আম বাগানগুলো থেকে আম নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সেটাও সতর্কতার সাথে করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

"এখানে থ্রিহুইলার, যাত্রীবাহী বাসসহ কোন যানবাহন চলছে না। এমনকি রিক্সাও চলাচল করতে দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু খাদ্য বা পণ্য পরিবহণ এবং ভারত থেকে বন্দর দিয়ে যে পণ্য আসছে-এগুলো আমরা চালু রেখেছি," বলেন মি: হাফিজ।

একটি জেলায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, একটি জেলায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

দেশের এই একটি জেলায় আকস্মিকভাবে সংক্রমণ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার কারণ কী হতে পারে-সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা করছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাবিবুল আহসান তালুকদার বলেছেন, ধান কাটার শ্রমিক এবং রাজমিস্ত্রীদের বড় অংশ চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। তাদের অনেকে ঈদের সময় এলাকায় ফিরেছিলেন। সেটাও সংক্রমণ বৃদ্ধির একটা কারণ হতে পারে।

এছাড়া জেলাটির শিবগঞ্জ উপজেলায় সোনামসজিদ স্থল বন্দরে দিয়ে ভারত থেকে পণ্য আনার ক্ষেত্রে ট্রাকের শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি সেভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ যাতায়াতকেও কারণ হিসাবে দেখছেন মি: তালুকদার।

সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় ইণ্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট প্রবেশ করেছে কিনা- এনিয়েও চাপাইনবাবগঞ্জে শংকা তৈরি হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মো: খুরশিদ আলম বলেছেন, আক্রান্তদের মধ্যে ৪২জনের নমুনা ঢাকায় পরীক্ষা করে একজনের শরীরে ইণ্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে।

"আমরা ৪২ জনের টেস্ট করে মাত্র একজনের ইণ্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট পেয়েছি। সে এখনও চিকিৎসাধীন আছে এবং ভাল আছে। বাকি রোগীরাও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে এবং ভাল আছে।"

তবে অধ্যাপক আলমের চিন্তা সেখানে সংক্রমণ বৃদ্ধি নিয়ে।

"সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টেরও সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি। ফলে যখনই সংক্রমণ বাড়বে, তখন বাড়বে আক্রান্তের সংখ্যা। আমাদের উদ্বেগ সেখানেই। কারণ ভাইরাস প্রতিনিয়ত এর চেহারা পাল্টায়। এটা চেহারা পাল্টিয়ে যদি আরও একটা সিভিয়ার ফর্মে গিয়ে অন্যদের আক্রান্ত করে, তখনতো সেটা আরও খারাপ হবে। সেজন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জকে টোটালি আলাদা করা হয়েছে" বলেন অধ্যাপক আলম।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়ে যারা আটকা পড়েছিলেন, তারাই শুধু এখন সীমান্ত দিয়ে ফিরতে পারবেন। তবে তাদের সেখানে বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হচ্ছে।

গত এক সপ্তাহে সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে ৬৯ জন বাংলাদেশি ফিরেছেন। তাদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে।