মমতার বিশ্বস্ত সহকর্মী থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী
পড়ার সময়: ৭ মিনিট

শনিবার বেলায় কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তার সঙ্গে শপথ নিয়েছেন আরও পাঁচজন মন্ত্রী।

কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে ওই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ, অনেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সহ বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলির একাধিক মুখ্যমন্ত্রীও।

মি. অধিকারীর সঙ্গেই শনিবার শপথ নিয়েছেন আরও পাঁচজন মন্ত্রী। এরা হলেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক এবং ক্ষুদিরাম টুডু।

মি. অধিকারী বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হলেন, কিন্তু ঘটনাচক্রে কলকাতার ভবানীপুর আসন থেকে জয়ী দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী তিনি।

সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ওই আসন থেকে তিনবার ভোটে লড়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।

মমতা ব্যানার্জীর একসময়ের সতীর্থ বা রাজনৈতিক সহকর্মী থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তার কাছেই পর পর দুটো বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন মিজ. ব্যানার্জী - প্রথমবার ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে, আবার এ বছর তার ঘরের মাঠ বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে।

সোমবারের ভোট গণনায় বিজেপি রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে, যার ফলে ব্যানার্জীর সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং এই হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে।

শুক্রবার বিজেপি জানিয়েছে যে অধিকারীই রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হবেন এবং শনিবার তিনি শপথ গ্রহণ করবেন।

সম্ভবত মি. অধিকারীর এই রাজনৈতিক সাফল্যের জন্যই তার নাম ছাড়া অন্য কারো নাম শুক্রবার নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক দলের বৈঠকে আলোচিতই হয় নি।

ওই বৈঠকে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসাবে হাজির ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ।

মি. শাহ জানিয়েছেন, সর্বসম্মতিক্রমে শুভেন্দু অধিকারীকেই বেছে নিয়েছেন উপস্থিত সকলে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী সহ শনিবার শপথ নেওয়া কয়েকজন মন্ত্রী

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী সহ শনিবার শপথ নেওয়া কয়েকজন মন্ত্রী

দলের কর্মীদের কাছে 'হিরো'

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বিজেপির রাজনৈতিক পূর্বসূরি জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জন্ম ও কর্মস্থল যে রাজ্যে, সেই পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করার স্বপ্ন ভারতীয় জনতা পার্টির দীর্ঘদিনের।

বিজেপি ২০২১ সালেই পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছিল। তবে সেবছরের নির্বাচনে তারা মাত্র ৭৭টি আসনে জয়ী হতে পেরেছিল। পরে আবার তাদের দলের কয়েকজন বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করেছিলেন।

তার কিছুদিন আগেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সে বছরের নির্বাচনেও তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থানের কারণে দলের কর্মীদের কাছে 'হিরো' হয়ে উঠেছিলেন।

পরবর্তী পাঁচ বছরে তার সেই আক্রমণের ধার যেমন জোরালো হয়েছে, তেমনই হিন্দু ভোট মেরুকরণের জন্য তার কথায় বারে বারে উঠে এসেছে বাংলাদেশ থেকে আসা 'মুসলমান অনুপ্রবেশকারী' ও রোহিঙ্গাদের কথা।

এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে 'পরিবর্তনের' ডাক দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাদের প্রচারের মূল স্লোগানেও ছিল 'পাল্টানো দরকার' ইত্যাদি শব্দ, যা দিয়ে আসলে সরকার বদলেরই ডাক দিয়েছিল দলটি।

'পরিবর্তন' শব্দটার সঙ্গে অবশ্য শুভেন্দু অধিকারীর যোগ আজকের নয়। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের ইতি টেনে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকার, সেই পরিবর্তনেও শুভেন্দু অধিকারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

বামফ্রন্ট সরকারের পতনের সিঁড়ি তৈরি হয়েছিল যে দুটি ঘটনার মাধ্যমে, তারই অন্যতম ছিল নন্দীগ্রামে রাসায়নিক শিল্প তালুক গড়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক কৃষক বিক্ষোভ। ওই কৃষক বিক্ষোভ গড়ে তোলার পিছনে মি. অধিকারীর তৃণমূল স্তরে সাংগঠনিক কৃতিত্ব ছিল বলে অনেকে মনে করেন।

তখন অবশ্য মি. অধিকারী এখনকার মতো নন্দীগ্রামের বিধায়ক ছিলেন না। সেই সময়ে তিনি ছিলেন পাশের এলাকা কাঁথি দক্ষিণ আসনের বিধায়ক।

তিনি অবশ্য নন্দীগ্রাম কৃষক আন্দোলনের 'মুখ' ছিলেন না তখন, সেটা ছিলেন তার নেত্রী, সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী, যাকে হঠিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নাম ঘোষণার পরে সরকার গড়তে চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি রাজ্যপাল আরএন রভির (ডানে) হাতে তুলে দিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী (বাঁয়ে)

ছবির উৎস, WB BJP Media Cell

ছবির ক্যাপশান, মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নাম ঘোষণার পরে সরকার গড়তে চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি রাজ্যপাল আরএন রভির (ডানে) হাতে তুলে দিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী (বাঁয়ে)

কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি

বঙ্গোপসাগরের তীরের জেলা পূর্ব মেদিনীপুরের মানুষ শুভেন্দু অধিকারী। তার বাড়ি, জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র দীঘার কাছে, কাঁথি শহরে।

তার পরিবার আদ্যন্ত রাজনৈতিক - কংগ্রেস ঘরানায় বড়ো হয়েছেন তিনি।

তার বাবা শিশির অধিকারী মেদিনীপুর জেলা দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার অনেক আগে থেকেই সেখানকার অতি পরিচিত কংগ্রেস নেতা ছিলেন।

তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে ওঠার আগে যে দুজনকে মেদিনীপুরের কংগ্রেস নেতা বলে রাজনৈতিক মহল জানত, তাদেরই একজন ছিলেন শিশির অধিকারী। পোশাকেও একেবারে ছিলেন আগেকার কংগ্রেস নেতাদের মতোই - ধুতি-পাঞ্জাবী পরতেন। এখনও তাকে সেই পোশাকেই দেখা যায়।

তবে কংগ্রেস ছেড়ে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন মমতা ব্যানার্জী আলাদা দল করার পরেই।

তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন শিশির অধিকারী।

বাবার পথ ধরেই শুভেন্দু অধিকারীও একসময়ে কংগ্রেসেই ছিলেন। ছাত্র রাজনীতি দিয়ে শুরু করে পরে তার নিজের শহর কাঁথি পৌরসভার কংগ্রেসের ওয়ার্ড কাউন্সিলারও ছিলেন তিনি।

২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম থেকে নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে শুভেন্দু অধিকারী - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম থেকে নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে শুভেন্দু অধিকারী - ফাইল ছবি

নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সংগঠক

বাবা শিশির অধিকারীর সঙ্গেই তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০০৬ সালে তিনি কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য হিসাবেও নির্বাচিত হন। কাঁথি পৌরসভার চেয়ারম্যানের পদও সামলেছেন।

ওই ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা এলকার সংলগ্ন নন্দীগ্রামে রাসায়নিক শিল্প হাব গড়ার পরিকল্পনা করেছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। জমি অধিগ্রহনের বিরুদ্ধে সেখানকার কৃষকরা আন্দোলন শুরু করেন।

তৃণমূল স্তরে সেই আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী-ই, যদিও দলনেত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জী ছিলেন আন্দোলনের কাণ্ডারী।

তখন থেকেই মি. অধিকারী হয়ে ওঠেন মমতা ব্যানার্জীর দলের সংগঠন গড়ে তোলার অন্যতম রূপকার।

কয়েক বছর পরে, ২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে সেই সময়ের সিপিআইএমের হেভিওয়েট নেতা লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন শুভেন্দু অধিকারী। তার বাবা, শিশির অধিকারীও সেবছর এমপি হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন।

পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস দলে সাংগঠনিক গুরুত্ব বেড়েই চলেছিল শুভেন্দু অধিকারীর। তাকে রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলীয় 'জঙ্গলমহল'এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যে এলাকায় তখন মাওবাদীদের প্রবল প্রতিপত্তি।

প্রায় সাড়ে তিন দশক ক্ষমতায় থাকার পরে যে বছর বামফ্রন্ট সরকারকে হঠিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের ক্ষমতা দখল করল, সেই ২০১১-র নির্বাচনে অবশ্য প্রার্থী হন নি শুভেন্দু অধিকারী। তিনি তখনও এমপি।

বিধানসভায় শুভেন্দু অধিকারী ফিরে আসেন ২০১৬ সালে। জয় লাভ করার পর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জীর দ্বিতীয় দফায় পরিবহন মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

ততদিনে দলীয় সংগঠনেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন মি. অধিকারী। তাকে দলের যুব সংগঠনের নেতা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জী।

কিন্তু একই সময়ে মিজ. ব্যানার্জী তার ভাইয়ের ছেলে অভিষেক ব্যানার্জীর নেতৃত্বে 'যুব' নামের একটি সংগঠন গড়ে দেন মমতা ব্যানার্জী।

একটিই দলের দুটি যুব সংগঠন গড়ে তিনি তখন বার্তা দিয়েছিলেন যে অভিষেক ব্যানার্জীকেই তিনি রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।

'যুব' নামের সেই সংগঠনের সূচনা এবং অভিষেক ব্যানার্জীকে প্রতিষ্ঠা করার জনসভাটি হয়েছিল কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানেই।

ঘটনাচক্রে, শনিবার ওই ব্রিগেড প্যারেড ময়দানেই মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী।

সেই সময় থেকেই শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর দূরত্ব বাড়তে শুরু করে।

অবশেষে ২০২০ সালে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। তারপর থেকে ক্রমাগত তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব হয়েছেন তিনি, অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধেও কথা বলতে দেখা গিয়েছে তাকে।

একদা মমতা ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি, ২০১৫ সালে তোলা ছবি।

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, একদা মমতা ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি, ২০১৫ সালে তোলা ছবি।

বিজেপিতে যোগদান

গেরুয়া শিবিরে যোগ দেওয়ার পরপরই ২০২১ সালে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী হিসাবে দাঁড়ান তিনি। পরাজিতও করেন। নির্বাচনী ফল মানতে চাননি মিজ ব্যানার্জী, বিষয়টা শেষপর্যন্ত আদালত অবধি গড়ায়।

তবে ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় না এলেও বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন তিনি।

বিধানসভা এবং রাজপথ দুই জায়গাতেই আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা গিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীকে। তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ইস্যু- বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিরোধীদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

তৃণমূল কংগ্রেস, মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে যেমন অতি আক্রমণাত্মক থেকেছেন তিনি, তেমনই বারে বারে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতেও তিনি অতি-সরব হয়েছেন বারে বারেই।

তার উত্থান পশ্চিমবঙ্গে এক উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে - এমন একটি রাজ্য যেখানে বিজেপি একসময় প্রান্তিক শক্তি ছিল।

কিন্তু উস্কানিমূলক ও সাম্প্রদায়িক মন্তব্যের কারণে বারবার বিতর্কের ছায়ায় মি. অধিকারীর উত্থানও ঢাকা পড়েছে।

২০২১ সালে, একটি বক্তৃতার জন্য নির্বাচন কমিশন তাকে নোটিশ জারি করে, যেখানে তিনি কথিতভাবে তার প্রতিপক্ষকে "বেগম" বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং তাকে ভোট দেওয়ার অর্থ একটি "মিনি-পাকিস্তান"-কে ভোট দেওয়া বলে মন্তব্য করেছিলেন।

গত বছর মি. অধিকারী এই ঘোষণা দিয়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিলেন যখন তিনি বলেছিলেন যে , ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে দলটি "মুসলিম বিধায়কদের বিধানসভা থেকে শারীরিকভাবে বের করে দেবে"।

এই মন্তব্যের জেরে টিএমসি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের অভিযোগ তোলে এবং এর ফলে বিধানসভায় বিশেষাধিকার প্রস্তাব আনা হয় ও তাকে বিধানসভা থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত একটি চিকিৎসা শিবিরে বিতরণ করা ওষুধ 'জন্ম নিয়ন্ত্রণ' ঘটাতে পারে এবং বাংলায় হিন্দু জনসংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে—এমন মন্তব্য করেও মি. অধিকারী সমালোচনার মুখে পড়েছেন । তার ওই মন্তব্যকে বিরোধীরা উস্কানিমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে ব্যাপকভাবে নিন্দা করেছেন।

এখন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই এই পরিবর্তনটি ঘটেছে নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতার মধ্যে।

বুধবার শুভেন্দু অধিকারীর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যাকে বিজেপি নেতারা একটি পরিকল্পিত হামলা বলে বর্ণনা করেছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, অজ্ঞাত পরিচয় হামলাকারীরা মি. রথের বাড়ির কাছে গুলি চালায়, যা রাজ্যে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর বিজেপিতে যোগ দেন তিনি।

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর বিজেপিতে যোগ দেন তিনি।

নারদা স্টিং অপারেশন

২০১৬ সালে নারদা নামের একটি সংবাদ পোর্টালের একটি স্টিং অপারেশনকে কেন্দ্র করে মি. অধিকারী বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।

ওই সংবাদ পোর্টালের গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড করা ভিডিওয়ে দেখা গিয়েছিল যে একজন বিনিয়োগকারী সেজে আসা ভুয়া ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে নগদ টাকা নিচ্ছেন।

ওই তালিকায় ছিলেন সেই সময়ের তৃণমূল কংগ্রেসে দু নম্বর নেতা বলে পরিচিত মুকুল রায়, মন্ত্রী মদন মিত্র, কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। শুভেন্দু অধিকারীর ফুটেজও দেখা যায় ওই স্টিং অপারেশনে।

সেই বছর রাজ্য নির্বাচনের আগে প্রকাশিত ভিডিওতে মি. অধিকারীকে তার অফিসে টাকা নিতে দেখা যায় বলে মনে হয়েছিল, যদিও তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি ফুটেজটির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা ওই ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছিলেন। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীকে কখনই গ্রেফতার করা হয় নি। ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ২০২০ সালে তিনি নাটকীয়ভাবে বিজেপিতে যোগ দেন।

তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করে যে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কারণেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি।

সমগ্র কর্মজীবন জুড়ে শুভেন্দু অধিকারী এমন একজন নেতার ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, যিনি তার আক্রমণাত্মক প্রচারশৈলীর জন্য সমর্থকদের কাছে প্রশংসিত, কিন্তু বিরোধীরা তার সেই সব ভাষণকে রাজনৈতিক উস্কানি বলে অভিযোগ করে থাকে। সমালোচকরা বলে থাকে মি. অধিকারীর ভাষণগুলি রাজ্যে ধর্মীয় বিভাজন আরও গভীর করতে সাহায্য করেছে।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে, তাকে এখন একজন তেজস্বী রাজনীতিবিদ থেকে প্রশাসকে রূপান্তরিত হওয়ার চাপের মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তার কাছে বড়ো চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং এমন একটি রাজ্য শাসন করা যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ অত্যন্ত গভীর।