আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
হেফাজতে ইসলাম: শাপলা চত্বর সমাবেশের আট বছর পরে টিকে থাকার চেষ্টায় ইসলামপন্থীদের সংগঠনটি
- Author, আকবর হোসেন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
২০১৩ সালের ৫ই মে ঢাকার শাপলা চত্বরে কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে বিশাল এক সমাবেশের মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।
সেই ৫ই মে সমাবেশকে কেন্দ্র নানা ধরণের গুজব এবং আলোচনার জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে।
শাপলা চত্বরের সেই সমাবেশের পর হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচী এবং তারপরে রাতের বেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের সেখান থেকে হটিয়ে দেয়া হলেও এর একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতি।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, ৫ই মে হেফাজতে ইসলামীর সেই সমাবেশ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বেশ বিচলিত করে তোলে।
হেফাজতে ইসলামের সেই সমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতার মামলা দায়ের করা হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ হেফাজতে ইসলামের নেতাদের বিরুদ্ধে তখন বড় আকারের কোন ধড়-পাকড়ে যায়নি।
সংগঠনটির কিছু কেন্দ্রীয় নেতাকে আটক করা হলেও কিছুদিন পরে তাদের জামিনে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর হেফাজতে ইসলামের সাথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এক ধরণের 'সমঝোতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক' দৃশ্যমান হয়।
কিন্তু আট বছরের মাথায় এসে সে সম্পর্ক এখন পুরোপুরি উল্টে গেছে। নরেন্দ্র মোদী বিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপর বেশ কঠোর হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
হেফাজতে ইসলামীর প্রায় ডজনখানের কেন্দ্রীয় নেতাকে গত কয়েক সপ্তাহে গ্রেফতার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখন সংগঠনটিকে টিকে রাখার চেষ্টায় আছেন।
এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরপাকড় এবং অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের ভেতরে নানামুখী সংকটের মুখে হেফাজতে ইসলামী কমিটি বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে।
হেফাজতের টিকে থাকার চেষ্টা
২০১৩ সালের ৫ই মে সমাবেশের এক বছরের মধ্যেই হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন আমীর প্রয়াত শাহ আহমদ শফীর সাথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এক ধরণের সমঝোতা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে তখনকার হেফাজতে ইসলাম প্রধান আহমদ শফীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এক 'শোকরানা মাহফিলেও' যোগ দেন শেখ হাসিনা।
কিন্তু সরকারের সাথে আহমদ শফীর সে সখ্যতা হেফাজতে ইসলামের ভেতরে অনেকে পছন্দ করতেন না।
এসব অপছন্দের বিষয়গুলো তখন অনেকটা 'সুপ্ত অবস্থায়' ছিল বলে উল্লেখ করেন ইসলাম বিষয়ক লেখক শরীফ মোহাম্মদ, যিনি নিজেও এক সময় হেফাজতে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
আহমদ শফীর মৃত্যুর পরে হেফাজতে ইসলামীর ঐক্যে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আহমদ শফীর মৃত্যুর পর জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলামের যে নতুন কমিটির সাথে সরকারের বেশ দূরত্ব ছিল।
এরপর ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরের বিরুদ্ধে সহিংস বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতির ইঙ্গিত মেলে।
এখন হেফাজতে ইসলামের নেতারা পুলিশি ধরপাকড় সামাল দিতেই ব্যস্ত। পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য দফায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ প্রার্থীও হচ্ছেন হেফাজতে ইসলামের নেতারা।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক এবং আইনগতভাবে হেফাজতে ইসলামের উপর জোরালো চাপ সৃষ্টি করেছে।
শরীফ মোহাম্মদ মনে করেন, সরকার হেফাজতে ইসলামের উপর যে চাপ তৈরি করেছে সেটি তাদেরকে 'পোষ মানানোর' একটি কৌশল হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ মনে করেন, হেফাজতে ইসলাম সরকারের পছন্দের বাইরে গিয়ে কোন কাজ করতে পারবে না।
"হেফাজতে ইসলামের অস্তিত্ব হয়তো সামনে থাকবে, কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের একটি বি-টিম হয়ে তারা থাকবে," বলেন অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ।
তবে পরিস্থিতি হয়তো বদলেও যেতে পারে। এমন ধারণাও রয়েছে অনেকের মনে।
২০১৩ সালের ৫ই মে পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের কথা উল্লেখ করেন শরীফ মোহাম্মদ বলেন, কিছুদিন পরে হয়তো ভিন্ন চিত্রও হতে পারে।
"পাঁচই মে ঘটনার পরে সরকারের সঙ্গে ভয়ঙ্কর দূরত্ব ছিল। ওটা যখন উৎরানো সম্ভব হয়েছে, এবারও হয়তো সেটা হতে পারে। সমঝোতার কোন চিত্র হয়তো চলেও আসতে পারে," বলেন মাওলানা শরীফ মোহাম্মদ।
বর্তমান সংকট সমাধানের জন্য হেফাজতে ইসলামের বর্তমান নেতৃত্ব কতটা পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছে সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শরীফ মোহাম্মদ।
হেফাজতে ইসলামের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সংগঠনটি টিকিয়ে রাখা। একদিকে সরকারের চাপ এবং অন্যদিকে সংগঠনের ভেতরে দ্বন্দ্ব - এ দুটো পরিস্থিতি বেসামাল করেছে হেফাজতে ইসলামকে।
সেজন্য হেফাজতে ইসলামের কমিটি বিলুপ্ত করে দিয়ে তড়িঘড়ি করে আরেকটি আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। কারণ, জুনায়েদ বাবুনগরী অংশের আশংকা ছিল তাদের প্রতিপক্ষ হয়তো সংগঠনটি দখল করে নেবে।
কমিটি বিলুপ্ত করার আগে হেফাজতে ইসলামের কয়েকজন সিনিয়র নেতা কমিটি থেকে পদত্যাগও করেছেন।
শরীফ মোহাম্মদ বলেন, তারা হয়তো হেফাজতে ইসলামের ব্যানার টিকিয়ে রেখে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার হতে চায়। এছাড়া সরকারের সাথে উত্তেজনার কারণে কওমি মাদ্রাসায় পড়াশুনা যাতে বিঘ্নিত না হয় সেটিও নিশ্চিত করতে চায় বর্তমান নেতৃবৃন্দ।
এই পরিস্থিতি থেকে হেফাজতে ইসলামীর বর্তমান নেতৃবৃন্দ কতটা কাটিয়ে উঠতে পারবে সেটি নিয়ে সংশয় আছে হেফাজতে ইসলামের ভেতরে।
"হেফাজত নামের ব্যানারটা হয়তো গুটানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও হতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন ইস্যুতে কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রিক প্লাটফর্ম বন্ধ হয়ে যাবে বলে আমার মনে হয় না," বলেন শরীফ মোহাম্মদ।
সরকার-হেফাজত বন্ধুত্ব
বিশ্লেষকদের ধারণা , ২০১৩ সালের ৫ই মে পরবর্তী সরকার ও হেফাজতে ইসলামের মধ্যে 'সুসম্পর্ক' গড়ে ওঠার পেছনে কিছু রাজনৈতিক কারণ ছিল।
২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও নির্বাচন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির আন্দোলনের কারণে রাজনৈতিক পরিস্থিতি টালমাটাল হয়ে উঠে। তখন সরকার চায়নি হেফাজতে ইসলাম নতুন আরেকটি প্রতিপক্ষ হয়ে তাদের সামনে আসুক।
সেজন্য শাপলা চত্বরের সমাবেশ থেকে তাদের হটিয়ে দিলেও কয়েকমাস পরে সমঝোতার পথেই হেঁটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ বলেন, হেফাজতে ইসলাম সংগঠনটি যাতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর করায়ত্ব না হয় সে চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ সরকার।
তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলাম নিজেদের অরাজনৈতিক হিসেবে দাবি করলেও ২০১৩ সালে তারা যেসব দাবি উত্থাপন করেছিল তার বেশিরভাগ দাবির রাজনৈতিক চরিত্র ছিল।
সেজন্য হেফাজতে ইসলামকে জামায়াতের ইসলামীর বিকল্প একটি ইসলামী দল হিসেবে ক্ষমতাসীনরা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ।
উভয় পক্ষের মধ্যে সুসম্পর্কের ধারাবাহিকতায় কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের মর্যাদা দেয় সরকার এবং একই সাথে কওমি মাদ্রাসাগুলোর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে 'কওমি জননী' উপাধি দেয়া হয়।
হেফাজতে ইসলামের দাবির মুখে সুপ্রিম কোর্টের সামনের অংশ থেকে একটি ভাস্কর্যও সরিয়ে নেয়া হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে হেফাজতে ইসলাম রাজনীতিতে নিজেদের একটি 'শক্তিশালী প্রেশার গ্রুপ' হিসেবে ভাবতে শুরু করে।
কওমি মাদ্রাসার সাথে সম্পৃক্তরা মনে করেন, হেফাজতে ইসলাম এখন বেশ চাপে পড়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
তবে সংগঠন হিসেবে হেফাজতে ইসলাম টিকে থাকুক কিংবা না থাকুক, কওমি মাদ্রাসা-ভিত্তিক যে মতাদর্শ এবং বিভিন্ন ইসলাম সংক্রান্ত যে কোন ইস্যুতে তাদের একত্রিত হবার প্লাটফর্ম বন্ধ হবে না। এমনটাই মনে করেন মাওলানা শরীফ মোহাম্মদ।