মুসলিম-প্রধান একটি জেলা মালেরকোটলার সৃষ্টিকে ঘিরে ভারতে যে বিতর্ক

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে একটি নবাবি আমলের শহরের নাম মালেরকোটলা।
ইতিহাস বলে, প্রায় পৌনে ৬০০ বছর আগে আফগানিস্তান থেকে আসা ধর্মগুরু শেখ সদরউদ্দিন-ই-জাহান এই নগরের পত্তন করেছিলেন।
তার বংশধর বায়াজিদ খান ১৬৫৭ সালে মালেরকোটলা নবাবির সূচনা করেন, আর সেখানকার শেষ নবাব ইফতিকার আলি খান প্রয়াত হন ১৯৮২ সালে।
এখন সেই মুসলিম-প্রধান মালেরকোটলাকে পাঞ্জাবের আলাদা একটি নতুন জেলা হিসেবে ঘোষণা করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং।
জানানো হয়েছে, এখনকার সাংরুর জেলা থেকে একটি অংশ কেটে নিয়ে সৃষ্টি করা হচ্ছে পাঞ্জাবের এই ২৩তম জেলা।
ডেমোগ্রাফির দৃষ্টিতে নতুন এই জেলায় মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন।

ছবির উৎস, Getty Images
গত শুক্রবার ঈদের দিন অমরিন্দর সিং ঘোষণা করেন, "এই ঐতিহাসিক দিনে আমি মালেরকোটলার জন্য কিছু করতে পেরে গর্বিত।"
"ব্যক্তিগতভাবে আমাদের পাটিয়ালা রাজবংশের সঙ্গে মালেরকোটের নবাবদের সঙ্গেও দারুণ সুসম্পর্ক ছিল, নবাব ইফতিকার আলি খানকে আমি ডাকতাম 'চাচাজি' বলে।"
"ঐতিহাসিকভাবেই সারা বিশ্বের শিখ সম্প্রদায়ের স্মৃতিতে মালেরকোটলার একটা আলাদা জায়গা আছে, সম্মান আছে।"
পাঞ্জাব ক্যাবিনেটের একমাত্র মুসলিম সদস্য রাজিয়া সুলতানাও জানান, আলাদা মেডিকেল কলেজ, মহিলা কলেজ, মহিলা থানা ও বাসস্ট্যান্ড স্থাপনের ঘোষণা করে সরকার মালেরকোটলাকে ঈদের উপহারে ভরিয়ে দিয়েছে।
আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
"এই প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থও, যাতে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা খরচ হবে বলেও ধরা হচ্ছে", বলেন মিস সুলতানা।
পাঞ্জাব সরকারের এই ঘোষণার পরদিনই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা যোগী আদিত্যনাথ টুইট করেন, "বিশ্বাস বা ধর্মের ভিত্তিতে কোনও ধরনের বিভেদ করা ভারতীয় সংবিধানের মূল আদর্শের বিপরীত।"
"কাজেই মালেরকোটলাতে আলাদা জেলা তৈরি করা কংগ্রেসের বিভাজনকারী নীতিরই পরিচায়ক", আরও মন্তব্য করেন তিনি।
মালেরকোটলার শিখ ও মুসলিমরা অবশ্য তার এই ব্যাখ্যা মানতে প্রস্তুত নন।
তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বেশ কয়েকশো বছর ধরে এই শহরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চমৎকার সম্প্রীতির একটা পরম্পরা আছে।
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post
পাঞ্জাব গুরদোয়ারা প্রবন্ধক সমিতির সদস্য অজিত সিং যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, "শিখদের দশম গুরু গোবিন্দ সিংয়ের দুই বাচ্চা ছেলেকে ১৬৫৭ সালে মুঘল গভর্নর ওয়াজিদ খান সরহন্দে দেওয়ালের ইঁটে জীবন্ত চাপা দিয়ে মেরেছিলেন।"
"তখন কিন্তু মুসলিম হয়েও মালেরকোটলার নবাব শের মোহাম্মদ খান তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। তখন থেকেই শিখরা মালেরকোটলার প্রতি চরম কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ।"
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মহম্মদ খলিলও বিবিসিকে জানান, সাতচল্লিশে দেশভাগের সময়ও মালেরকোটলায় কোনও দাঙ্গাহাঙ্গামা পর্যন্ত হয়নি।
তার কথায়, "শিখ ও মুসলিমরা তখন পরস্পরের মধ্যে সম্পত্তি বিনিময় করে এপার-ওপার করেছেন ... কিন্তু শহরে সাম্প্রদায়িকতার কোনও আঁচ পর্যন্ত লাগেনি।"
পৃথক মালেরকোটলা জেলার গঠনকে তাই শিখ ও মুসলিমদের মধ্যে সম্প্রীতির নিদর্শন হিসেবেই পাঞ্জাব দেখছে।

ছবির উৎস, Getty Images
রাজনৈতিক ইসলামের গবেষক ও অধ্যাপক মঈদুল ইসলাম আবার বিবিসিকে বলছিলেন, মহামারি সামলানোর ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতেই আদিত্যনাথ মালেরকোটলাতে সাম্প্রদায়িকতার রং চড়াচ্ছেন বলে তার বিশ্বাস।
ড: ইসলামের কথায়, "উত্তরপ্রদেশে বিজ্ঞানের চর্চা কখনওই ছিল না, আর বিজেপি-শাসিত এই রাজ্যটি যে কোভিড একেবারেই সামলাতে পারেনি তা তো সবাই দেখতেই পাচ্ছেন।"
"ফলে যখনই দেশের কোথাও একটা সংখ্যালঘু বা মুসলিম সিম্বলিজমের জায়গা তৈরি হচ্ছে, কোভিড সমালোচনা থেকে পাশ কাটাতে সেটা নিয়ে এ ধরনের টুইট, বা প্ররোচনামূলক কথাবার্তার অবতারণা করা হচ্ছে।"
"আমি তো বলব আদিত্যনাথের এই টুইট একেবারে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার চেষ্টা", মন্তব্য মঈদুল ইসলামের।
পাঞ্জাবের বিজেপি এমপি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সোমপ্রকাশ অবশ্য রবিবার আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে গিয়ে মালেরকোটলা জেলার গঠনকে স্বাগত জানিয়েছেন।
কিন্তু পাঞ্জাবের মুসলিমদের জন্য আলাদা একটা জেলার আদৌ কী দরকার ছিল, বিজেপির তরফে এই ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা এরপরও থেমে নেই।








