লম্বা সময় কাজে স্বাস্থ্যের হানি, সুস্থ থাকতে যা করতে পারেন

স্ট্রোক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে স্ট্রোক, হৃদযন্ত্রের সমস্যা সহ নানা ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়।
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার করা এক যৌথ জরিপে বলা হয়েছে সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হয় যা মৃত্যু ঝুঁকি তরান্বিত করে।

স্ট্রোক, হৃদযন্ত্রের সমস্যা সহ নানা ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার করা যৌথ জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল এই জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়।

জরীপ থেকে যা জানা যাচ্ছে

২০০০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১৯৪ টি দেশ থেকে সংগ্রহ করা তথ্য উপাত্তের উপর ভিত্তি করে জরিপটি চালানো হয়েছে।

দীর্ঘ সময় কাজ সম্পর্কিত স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে এটিই প্রথম কোন বৈশ্বিক জরিপ।

নারী কাজ করছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লম্বা সময় চেয়ারে বসে কম্পিউটারে কাজ করার রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

বলা হচ্ছে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাজ করার জন্য ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪ লাখ মানুষের স্ট্রোকে মৃত্যু হয়েছে।

হৃদযন্ত্রের নানা ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে সাড়ে তিন লাখের মতো মানুষের।

২০০০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এরকম অধিক সময় ধরে কাজ করার কারণে হৃদযন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বেড়েছে ৪২ শতাংশ আর স্ট্রোকে মৃত্যু বেড়েছে ১৯ শতাংশ।

সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাজ করলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ-জনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে ৩৫ শতাংশ।

দীর্ঘ সময় কাজে যেসব সমস্যা হয়

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের নিটোরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মুহম্মদ সিরাজ-উল-ইসলাম বলছেন, দীর্ঘ সময় কাজ করার একটি বড় দিক হচ্ছে দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে থাকা।

ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস হলে পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বেধে যায়।

তিনি বলছেন লম্বা সময় নড়াচড়া না করলে এতে অনেক সময় ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস নামের একটি সমস্যা হতে পারে।

যাতে পায়ের মাংস পেশির ভেতর দিয়ে যে শিরাগুলো রয়েছে সেই শিরায় রক্ত জমাট বেধে যায়।

সম্পর্কিত খবর:

এই শিরাগুলোতে রক্ত চলাচল মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের সুস্থতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

শিরাগুলো হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্কে শরীরের অন্যান্য অংশের সাথে রক্ত চলাচলে সহায়তা করে। রক্ত জমাট বেধে গেলে সেই চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়।

পিঠে ব্যথা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দীর্ঘ সময়ে চেয়ারে বসে কাজ করলে মেরুদণ্ডে ব্যথা হতে পারে।

অধ্যাপক মুহম্মদ সিরাজ-উল-ইসলাম বলছেন, "সাধারণত এতে পায়ে ব্যথা হওয়ার সমস্যাই বেশি হয় কিন্তু এমনও হতে পারে যে একটি ছোট ক্লট (জমাট বাধা রক্ত) মস্তিষ্কে পৌঁছে গেল এবং কোন ধমনীতে আটকে গেল। এতে পক্ষাঘাত হতে পারে, স্ট্রোক হতে পারে। দেখা গেল ক্লট গিয়ে হৃদযন্ত্রের কোন অংশে আটকে গেল। তখন হৃদযন্ত্রে পর্যাপ্ত রক্ত পৌছায় না। এসব কারণে মানুষ মারাও যেতে পারে।"

ডা. ইসলাম বলছেন, দীর্ঘ সময়ে চেয়ারে বসে কাজ করার কারণে মেরুদণ্ডের পাশের মাংসপেশিতে ব্যথা হয় এবং একপর্যায়ে মেরুদণ্ডেও ব্যথা হতে পারে।

অনেক অল্প বয়সে এই সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন, তাতে কাজ করার সক্ষমতা কমতে থাকে।

কম্পিউটারের মনিটরের উচ্চতার সাথে যদি চোখের সামঞ্জস্য না থাকে এবং দীর্ঘ সময় কাজ করলে ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে।

দীর্ঘ সময় কম্পিউটারে কাজ করলে চোখেরও সমস্যা বাড়ে। দীর্ঘ সময় শারীরিক কোন শ্রম না করলে ডায়াবেটিস হতে পারে।

মানসিক চাপ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ মনের উপরও প্রভাব ফেলে।

মানসিক চাপ বাড়ে

দীর্ঘ সময় ধরে কাজ শুধু শরীর নয় মনের উপরও প্রভাব ফেলে।

ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট ডা. ইশরাত শারমিন রহমান বলছেন, "খুব বেশি সময় যাদের নিয়মিত কাজ করতে হয় তারা তাদের কাজকে আর পছন্দ করেনে না এমন হতে পারে। এতে কাজ নিয়ে বিরক্তি চলে আসে, কাজে অনুপস্থিতি বেড়ে যায়। যথেষ্ট বিশ্রাম না হওয়ার কারণে ক্লান্তি বোধ তৈরি হয়, কাজে ভুল বেড়ে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এরকম নানা সমস্যা হতে পারে।"

তিনি আরও বলছেন, এসব বিষয় ধীরে ধীরে একজন কর্মীকে অবসাদগ্রস্ত করে তোলে।

তাদের উদ্বেগ বেড়ে যেতে পারে। অনেকে সাময়িক মানসিক শান্তির জন্য মাদক বা অ্যালকোহলে নেশাগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে।

অনেক সময় পারিবারিক পরিবেশ ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট হয়।

ক্লাান্তি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যথেষ্ট বিশ্রাম না হওয়ার কারণে ক্লান্তি বোধ তৈরি হয়।

সুস্থ থাকতে যা করতে পারেন

অনেক পেশার জন্য দীর্ঘ সময় কাজ করা একটি বাস্তবতা। ব্যাংক, এনজিও কর্মী, ডাক্তার, সাংবাদিক এরকম অনেক পেশার মানুষ রয়েছে তাদের কাজের পরিধি নয়টা পাঁচটা থাকে না।

অধ্যাপক মুহম্মদ সিরাজ-উল-ইসলাম বলছেন, এসব মানুষদের উচিত হবে প্রতি এক ঘণ্টায় একবার পাঁচ মিনিটের জন্য জোরে জোরে একটু হেটে নেয়া।

এতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে যা হৃদযন্ত্রের জন্য ভাল। কম্পিউটারের মনিটরের উচ্চতা এমনভাবে রাখতে হবে যাতে তা চোখের উচ্চতার সমান হয়।

অনেকক্ষণ টাইপ করতে হলে হাতের কনুই চেয়ারের দুইপাশের হাতলে রেখে নিতে পারেন।

টাইপ করার মাঝেও বিরতি দেয়া উচিত। চোখের আরামের জন্য কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকা, সবুজ কোন গাছের দিকে তাকিয়ে থাকলে উপকার পাওয়া যায়।

হাঁটা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হাঁটলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে।

ডা. ইশরাত শারমিন রহমানও কাজের ফাকে ছোট বিরতি নেবার কথা বলছেন।

কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে এক কাপ চা অথবা কফি নিয়ে সহকর্মীদের সাথে একটু গল্প করা, পছন্দের কারো সাথে ফোনে কথা বলা, পছন্দের কোন গান শোনা এসব পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

অফিস থেকে ছুটি নেয়া জরুরী বলছেন এই চিকিৎসক। ছুটি নিয়ে কোথাও অবকাশ যাপনে যাওয়ার কথা বলছেন তিনি। সেটি হতে পারে নিজের শহরের আশপাশে কোথাও।

তিনি বলছেন, "অফিসে না বলতে শিখতে হবে। বাড়িতে কাজ নিয়ে যাওয়া যাবে না। চাপ তৈরি হচ্ছে মনে হলে সেটা সরাসরি জানিয়ে দিতে হবে।"

হয়তো সবার সমস্যা এক রকম হবে না, সবার জন্য সমাধানও একরকম নয়। তবুও এই পরামর্শগুলো কাজে লাগতে পারে।

ভিডিওর ক্যাপশান, যে ভাবে বুঝবেন আপনি বিষন্নতায় ভুগছেন