হেফাজত ইসলাম: মামুনুল হক গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বাগেরহাটে মিছিল, পুলিশের সাথে সংঘর্ষ

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সম্পাদক মামুনুল হকের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বাগেরহাটে সংগঠনের সমর্থকদের বের করা মিছিল পুলিশ ছত্রভঙ্গ করতে গেলে এক সংঘর্ষে তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে বাগেরহাটের মোল্লাহাটের উদয়পুর মাদ্রাসার সামনে এই ঘটনা ঘটে।
বাগের হাটের একজন পুলিশ কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেখানকার হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকরা একটি মিছিল বের করার চেষ্টা করছিল।
''আগে থেকেই আমাদের পুলিশ সদস্যরা প্রস্তুত ছিলেন। তারা দ্রুত সেখানে গিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়,'' অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মীর মোহাম্মদ শাফিন মাহমুদ বলেন।
''সেই সময় তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে মোল্লাহাট থানা ওসিসহ তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে,'' তিনি জানান।
তিনি জানান, এরপর থেকেই সেখানকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
এই ঘটনায় মোল্লাহাট থানায় একটি মামলা করার প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি জানান।
পুলিশের এই বক্তব্যের বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের কোন নেতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সংবাদদাতারা বলছেন, হেফাজত নেতা মামুনুল হকের নানা বাড়ি বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার উদয়পুর এলাকায়।
রোববার ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি মাদ্রাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হককে। মোহাম্মদপুর থাকার একটি নাশকতার মামলায় সোমবার তাকে সাতদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
বিতর্কের কেন্দ্রে মামুনুল
হেফাজত ইসলামের নেতা হলেও মামুনুল হক আলোচিত হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বিরোধী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে।
"আমাদের সকলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং ঘোষণা হল আমরা দেশে রাষ্টীয় পর্যায়ে ইসলামকে বাস্তবায়ন করতে চাই। আমাদের সেই প্রচেষ্টা সফল হলে, ইসলামি হুকুমত বাস্তবায়িত ত হলে ভাস্কর্য সরিয়ে না ফেলার কোন অবকাশ থাকবে না" সেই সময় বলছিলেন মামুনুল হক।
তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ মন্তব্য করেছিলেন 'হেফাজত নতুন রাজাকার হয়ে দাঁড়াচ্ছে', যার প্রতিবাদ করে বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিস এর মহাসচিব মামুনুল হক, একই সাথে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেছেন ভাস্কর্য বিরোধিতার সাথে রাজাকার হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিব জন্ম শতবর্ষের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলামের নেয়া কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে হেফাজতের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ব্যাপক সহিংস রূপ ধারণ করে, এবং সেই সহিংসতায় কমপক্ষে ১৭ জনের মৃত্যু হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় গত ২৬শে মার্চ থেকে তিন দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এবং ঢাকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় হেফাজতের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে।
হাটহাজারী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের থানা আক্রমণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি অফিসে অগ্নিসংযোগসহ নাশকতার নানা ঘটনা ঘটেছে। প্রাণহানি হয়েছে কমপক্ষে ১৭জনের।
সেই সহিংসতার পর নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে একটি রিসোর্টে একজন নারীসহ হেফাজত নেতা মামুনুল হকের অবস্থান করার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

ছবির উৎস, MASUK HRIDOY
গত তেসরা এপ্রিল সোনারগাঁও এলাকায় একটি রিসোর্টে মামুনুল হককে ঘেরাও করে রাখে স্থানীয় কিছু লোক এবং ক্ষমতাসীন দল-সম্পৃক্ত ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা। তাদের অভিযোগ, মামুনুল হক একজন নারীকে নিয়ে রিসোর্টে ঘুরতে গিয়েছেন। অন্যদিকে মামুনুল হক বলেন, মহিলাটি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর হেফাজতে ইসলামের সমর্থক এবং মাদ্রাসার ছাত্ররা পাল্টা হামলা চালিয়ে সেখান থেকে মি.হককে নিয়ে যায়।
এরপর সংসদে দেয়া বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শনিবার মামুনুল হক 'অপবিত্র কাজ করে সোনারগাঁও এর রিসোর্টে' ধরা পড়েছেন।
"এরা ধর্মের নামে এত কথা বলে, পবিত্রতার নামে এত কথা বলে, এখন অপবিত্র কাজ করে সোনারগাঁও এর রিসোর্টে ধরা পড়েছে দলটির যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। এখন সেটা ঢাকার জন্য নানা রকম চেষ্টা করছে তারা।"
প্রধানমন্ত্রী সংসদে তার ভাষণে বলেন, "এত আগুন জ্বালাও-পোড়াও করে তিনি (মামুনুল হক) বিনোদন করতে গেলেন রিসোর্টে, একজন সুন্দরী মহিলা নিয়ে। এরা ইসলাম ধর্মের নামে কলঙ্ক। এরা ইসলাম ধর্মকে ছোট করে দিচ্ছে।"
"এরা ধর্মকে কলুষিত করে দিচ্ছে, ধর্মের নামে ব্যবসা শুরু করেছে। বিনোদনের এত অর্থ কোথা থেকে আসে?" এমন প্রশ্নও তোলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।
জনগণের সম্পত্তি নষ্ট করা এবং ধর্মের নাম নিয়ে 'অধর্মের' কাজের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন প্রধানমন্ত্রী।
তবে মামুনুল হক পরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, 'প্রধানমন্ত্রী না জেনে অসত্য বক্তব্য দিচ্ছেন'। আর হেফাজতে ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, তারা 'বিব্রত ও হতভম্ব'।








