রোহিঙ্গা শিবিরে আগুন: 'আমার চোখের সামনে তারা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে'

    • Author, সোয়ামীনাথান নটরাজন এবং খাদিজা আরিফ
    • Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে এক বিরাট অগ্নিকাণ্ডে এ পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন নিহত এবং ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যূত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ যদিও নিহতের সংখ্যা ১১ জন বলে উল্লেখ করছে। ইউএনএইচসিআর-এর হিসেবে প্রায় ৪০০ মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে।

সোমবার বিকেলে উখিয়ার বালুখালি শরণার্থী শিবিরে দ্রুত এই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুন যখন দ্রুত হাজার হাজার ঘরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ২৫ বছর বয়সী এক শরণার্থী সাইফুল আরাকানী দ্রুত ছুটে যান বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন বাড়িঘরের দিকে লোকজনকে উদ্ধারের জন্য।

"লোকজন আমার চোখের সামনেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল, অনেক মানুষ মারা গেছে", বলছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন:

আগুনে মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়া কিছু মানুষকে সাইফুল এবং আরও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক তাদের জ্যাকেট এবং কম্বল দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করেন।

সাইফুল একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার, কিন্তু এসময় তার হাতে মোবাইল ফোন ছাড়া আর কিছু ছিল না। তিনি তার ফোন দিয়েই এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে কিছু ছবি তোলেন।

"আমি ছবি তুলছিলাম, কিন্তু একই সঙ্গে আমি আমার কান্না থামাতে পারছিলাম না।"

সাইফুল যত ছবি তুলেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ছবিটি এক অগ্নিদগ্ধ শিশুর। আগুনে মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়া তার ছোট্ট দেহটি নিথর হয়ে পড়ে ছিল, তার পেটের কাছে তখনো ধরে রাখা একটা ছোট্ট খেলনা। সাইফুল জানায়, শিশুটি বাঁচেনি।

আগুনের বিরুদ্ধে অসহায়

বাংলাদেশের কক্সবাজারে ৩৪টি আশ্রয় শিবির আছে যেগুলোতে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী থাকে।

২০১৭ সালে মিয়ানমারে এক নির্মম দমন অভিযানের মুখে এরা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

রোহিঙ্গাদের এই আশ্রয় শিবিরগুলোর বাড়িঘর পাহাড়ের ঢালে এতটাই ঠাসাঠাসি করে তৈরি যে, একবার সেখানে আগুন লেগে যাওয়ার পর সেটি দ্রুত আরও কয়েকটি শিবিরে ছড়িয়ে পড়ে। বিরাট একটা অংশ জুড়ে আগুনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

উদ্ধার কাজ

সোমবার স্থানীয় সময় বিকেল তিনটায় সাইফুলের মা ঘরের বাইরে গিয়ে প্রথম আগুনের ধোঁয়ার কুন্ডলি দেখতে পান। প্রায় দুই কিলোমিটার দূর হতে দেখা যাচ্ছিল আগুনের শিখা এবং ধোঁয়ার কুন্ডলি।

"আগুনের শিখা প্রায় একশো ফুট উপরে উঠেছিল। আমি সাথে সাথে একটা গাড়িতে উঠে সেদিকে রওনা হই", বলছিলেন সাইফুল।

সাইফুল যখন ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছালেন, সেখানে অনেক মানুষের ভিড় জমে গেছে। অনেকেই তখন মরিয়া হয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন আগুন এরপর ক্যাম্পের কোনদিকে ছড়াবে।

"আমি দেখেছি, লোকজন চিৎকার করতে করতে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাচ্ছে। আমার মাকে বাঁচাও, আমার বোনকে বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। সেখানে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। কেউ জানে না কী করতে হবে", বলছিলেন সাইফুল।

দমকল কর্মীরা তখনো এসে পৌঁছায় নি, তার মধ্যেই স্থানীয় কিছু মানুষের সঙ্গে মিলে সাইফুল সেই আগুন আর ধোঁয়ার দিকে ছুটে গেলেন, জীবিত লোকজনের সন্ধানে।

কিন্তু সেখানে তিনি যা দেখলেন, জীবনে ভুলবেন না।

"আমি দেখেছি আমার মতো অনেক মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমি তাদের সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। আমি তাদের বাঁচাতে চেয়েছিলাম, যদি তাতে আমার প্রাণ যায়, তবুও।"

"আমি অনেক শিশু, বৃদ্ধা, পুরুষ মানুষকে আমার হাতে এবং কাঁধে করে বহন করেছি, এদের অনেকে ছিলেন গুরুতর আহত।"

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে সাইফুল একজন মানুষের আর্তধ্বনি শুনলেন, তিনি সাহায্য চাইছিলেন।

"উনার নাম সালিম। তার বয়স হবে ৪০ এর কাছাকাছি। তিনি কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, দয়া করে আমার মেয়ে আর আমার স্ত্রীকে বাঁচাও। আমি বেঁচে আছি, কিন্তু আমার মেয়েকে বাঁচাও।"

ধ্বংসস্তুপের ভেতর দিয়ে এগিয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা এই লোকটির পরিবারকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেলেন, তারা দুজনকেই জীবিত অবস্থায় বের করে আনতে পেরেছিলেন।

সাইফুল গত চার বছর ধরে শরণার্থী শিবিরে আছেন। তিনি জানেন, মানুষকে যখন কেউ দেখে না, তখন কেমন লাগে। সেজন্যেই তিনি তার সম্প্রদায়ের মানুষকে সাহায্য করার জন্য এত চেষ্টা করেছেন।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতি বর্গকিলোমিটার জায়গায় থাকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। কাজেই সেখানে জরুরি সেবা সংস্থার কর্মীদের ঢোকাটাই ছিল এক কঠিন কাজ। সেখানে পানির কোন লাইনও নেই। সাইফুল জানান, এক ঘন্টা ধরে শরণার্থীরা বালতি ভরে পানি আনার জন্য ছোটাছুটি করেছেন। দমকল বিভাগের ফায়ার ইঞ্জিন যখন আসলো, তখন বিকেল ৪টা ৪০ মিনিট।

কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্সও তখন এসে পৌঁছেছে। যাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল, সাইফুল তাদের অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে সাহায্য করলেন। যাদেরকে তিনি উদ্ধার করতে পেরেছিলেন, তাদের অন্তত একজন পরে হাসপতালে মারা গিয়েছিল বলে তিনি জানতে পারেন।

"দশজন মানুষ আমার সামনে মারা গেছে। এদের মধ্যে চারজন কম বয়সী শিশু, এদের বয়স হবে এক হতে ছয় বছর।"

ঘটনার পরের চিত্র

সন্ধ্যা নাগাদ আগুন যখন মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে, অনেক সাহায্য সংস্থা এসে পরিস্থিতি যাচাই করার চেষ্টা করছিল, যারা সবকিছু হারিয়েছে, তাদের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছিল।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার হিসেবে, প্রায় ৫৬০ জন মানুষ আহত হয়েছে, ৪৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যূত হয়েছে। প্রায় দশ হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। ত্রাণ সংস্থা অ্যাকশন এইডের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর বিবিসিকে জানিয়েছেন, যারা বাড়িঘর হারিয়েছে তাদের জন্য তারা এরই মধ্যে অস্থায়ী আশ্রয় বানাতে শুরু করেছেন।

"আমরা দুটি কমিউনিটি সেন্টারে কিছু অভিভাবকহীন শিশুসহ প্রায় ২০০ জনকে আশ্রয় দিতে পেরেছি। কিছু শুকনো খাবার বিতরণ করেছি। ক্যাম্প ইনচার্জদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা ১২০০০ লিটার খাবার পানিও বিতরণ করেছি।"

সাইফুল জানান, তার কমিউনিটির অবস্থা দেখে তিনি মুষড়ে পড়েছেন। তবে কিছু মানুষকে যে অন্তত উদ্ধার করতে পেরেছেন সেটা ভেবে তিনি কিছুটা সান্তনা খুঁজে পান।

"আমার মনে হয় না আজ রাতে আমি ঘুমাতে পারবো। অসহায় সেই নারী আর শিশুদের কান্না এবং চিৎকার এখনো আমার কানে বাজছে। আমার শুধু মনে হয়, আমি যদি আরও কিছু মানুষের জীবন বাঁচাতে পারতাম!"