আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইলিশ: বিদেশে রপ্তানির সুযোগ চান ব্যবসায়ীরা, সরকারের 'না', সমস্যা কোথায়?
- Author, সায়েদুল ইসলাম
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ইলিশ রপ্তানিতে আগ্রহী হয়ে উঠলেও বাংলাদেশের সরকার এখনি এই সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধুমাত্র ইলিশ মাছ রপ্তানি করতে না পারার কারণে তাদের অনেক রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। আর সরকার চাইছে, দেশের সব মানুষের জন্য ইলিশ মাছ সহজলভ্য করার পর রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিতে।
বাংলাদেশে মা ইলিশ ও জাটকা ধরায় কড়াকড়ির কারণে গত কয়েক বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন অনেক বেড়েছে। মৌসুমে এমনকি বড় ইলিশের দাম প্রত্যাশার চেয়েও কম দামে কেনা সম্ভব হচ্ছে।
বিশ্বের যেসব দেশে বাঙ্গালিরা বসবাস করেন, সেই সব দেশেই মূলত ইলিশের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আমেরিকা, ইউরোপের দেশগুলো, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় এই চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
কিন্তু রপ্তানির কারণে দেশের বাজারে ইলিশের জোগান কম থাকা এবং দামা বেড়ে যাচ্ছে এমন অভিযোগে ২০১২ সালের পয়লা অগাস্ট থেকে ইলিশ রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর এখন পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি।
বাংলাদেশে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ২ লাখ ৬০ হাজার টন ইলিশের উৎপাদন হলেও ২০১৯-২০২০ সালে মোট ইলিশের উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন। গত ১১ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ।
মূলত মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় সরকারের নেয়া নানা পদক্ষেপের কারণে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে।
ইলিশের উৎপাদন বেশি হওয়ায় মৌসুমের সময় বড় আকারে ইলিশের দাম অনেক কমে আসে। এক কেজি ওজনের ইলিশ আগে এক হাজার টাকায় বিক্রি হলেও গত মৌসুমে তা ছয় থেকে সাতশো টাকায়ও বিক্রি হতেও দেখা গেছে।
আরও পড়ুন:
যে কারণে ইলিশ রপ্তানির সুযোগ চান ব্যবসায়ীরা
ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দাম কমে যাওয়ার কারণে সীমিত আকারে ইলিশ রপ্তানির সুযোগ চান ব্যবসায়ীরা ইলিশের বাংলাদেশ থেকে বিদেশে মাছ রপ্তানিকারকরা।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী বেলায়েত হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''আমাদের কাছে যেসব মাছ রপ্তানির আদেশ আসে, সেখানে কেউ তো শুধু এক ধরণের মাছ কেনে না। বোয়াল, শিং, শোল, কৈ, পাবদা, চিংড়ির সঙ্গে বলা হয়, একটন বা হাফ টন ইলিশ দাও। এসব মিলিয়ে একটা মিক্সড কনটেইনার হয়।''
''কিন্তু দেখা যায়, শুধু ইলিশ মাছ দিতে না পারার কারণে আমাদের পুরো অর্ডারটাই বাতিল হয়ে যায়। ক্রেতারা তখন মিয়ানমার বা অন্য দেশ থেকে অর্ডার করে নেয়।''
তিনি জানান, সাধারণত এরকম একেকটি অর্ডার বা ইনভয়েস হয় দেড় থেকে দুই কোটি টাকার। তার মধ্যে ইলিশ মাছ থাকতে পারে পাঁচ-ছয় লাখ টাকার। এই কিছু ইলিশ দিতে না পারার কারণে পুরো অর্ডারটাই বাতিল হয়ে যায়।
মি. হোসেন বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ছয় লক্ষ টনের বেশি ইলিশ উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু বিদেশে বাংলাদেশে ইলিশ রপ্তানির চাহিদা রয়েছে বছরে তিন-চার হাজার টন। এটা রপ্তানির সুযোগ পেলে বাংলাদেশের ব্যবসার সুযোগ আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ থাকলেও গত বছর দুর্গাপূজার সময় শুভেচ্ছা হিসাবে ভারতে দেড় হাজার টন ইলিশ রপ্তানির সুযোগ দেয়া হয়।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ইরান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। তবে স্বাদের দিক থেকে বাংলাদেশে ইলিশ মাছ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশ ইলিশ মাছ রপ্তানির সুযোগ না পাওয়ায় স্বাদে কম হলেও ইলিশের সেই বাজারটি দখল করে নিয়েছে মিয়ানমার।
সেই সঙ্গে তাদের অন্যান্য মাছ রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি জানান। এই কারণেই তারা সীমিত আকারে ইলিশ রপ্তানি করতে দেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন।
সরকার কী বলছে?
ব্যবসায়ীদের এই দাবির সঙ্গে এখনো পুরোপুরি একমত নন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা।
তারা মনে করছেন, বাংলাদেশ থেকে এখনো ইলিশ রপ্তানির সময় আসেনি। কারণ সেটি করা হলে এখনো ইলিশের মতো মজাদার মাছটি তৃণমূল মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
বাংলাদেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রওনক মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''যদিও রপ্তানির বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার, তবে ঠিক এই মুহূর্তে রপ্তানির বিষয়ে আমরা ভাবছি না। কারণ ইলিশ আমাদের দেশের মানুষের কাছে খুবই উপাদেয় একটি খাবার। আমরা চাইছি, এটা আমাদের দেশের মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করার পরে হয়তো ভাবা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে ইলিশ রপ্তানির সুযোগ দেয়া যায় কি না, মৎস্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সেটা জানতে চেয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু তার ফলে ইলিশের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সেই চিন্তা থেকে সরে এসেছে।
সচিব রওনক মাহমুদ বলছেন, ''আমরা আশায় আছি, আমাদের দেশে ইলিশের উৎপাদন ছয় লক্ষ মেট্রিকটনেরও ওপরে যাবে। তখন চিন্তা করা হতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা চাই, যাতে একেবারে আমজনতার সবাই ইলিশ কিনতে পারে, সেই রকমভাবে সহজলভ্য করে তোলার বিষয়েই বেশি চিন্তা করছি।''
এর আগে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম বলেছেন, "আগামী পাঁচ বছরে ইলিশ রপ্তানি করা যৌক্তিক হবে না।"
তিনি বলেন, "এখনো গ্রামের অনেক মানুষ ইলিশের স্বাদ নিতে পারে না। তাদেরকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইলিশ খাওয়ার সুযোগ করে দিতে চাই। তারপর ইলিশ রপ্তানির কথা ভাবা যাবে।"
দু'হাজার বিশ সালের অক্টোবরে সরকার দুই বছরের মধ্যে এক লাখ টন ইলিশ রপ্তানির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সে অবস্থান থেকে সরে আসার যে ইঙ্গিত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর কথায় পাওয়া যাচ্ছে তাতে ধারণা করা যাচ্ছে যে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে সরকারের মধ্যেই ভিন্ন মতামত রয়েছে।
মন্ত্রী বলছেন, "যেভাবে উৎপাদন বেড়েছে তারপরেও দেশের সব মানুষ ইলিশের স্বাদ নিতে পারছে না। আমার মনে হয় আগে দেশের সব মানুষের কাছে ইলিশ পৌঁছাতে চাই আমরা, তার পর রপ্তানির কথা ভাবা যাবে।"