নিখোঁজদের খোঁজে তাদের স্বজনদেরই ভোগান্তি, মা নিজেই খুঁজে বের করলেন সন্তানের কবর

    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

মনোয়ারা হোসেন যখন ফোনের জবাব দিয়েছেন সেসময় তিনি ছিলেন বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করার দাতব্য সংস্থা আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম-এর কার্যালয়ে।

১৩ই জানুয়ারি নিখোঁজ হওয়া ছেলের কবরের খোঁজ জানতে গিয়েছিলেন তিনি।

নিখোঁজ হওয়ার পর দেড় মাস ধরে নানাভাবে খুঁজেছেন ২৩ বছর বয়সী ছেলে সাদমান সাকিবকে।

রাজধানীর ভাটারা থানায় সাধারণ ডায়েরি করে তিনি তার ছেলে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে পুলিশকে অবহিত করেছেন এবং র‍্যাব ও সিআইডির কার্যালয়ে গিয়েছেন।

কিন্তু শেষমেশ তিনি নিজেই খুঁজে পেয়েছেন ছেলের হদিস। তবে জীবিত নয়, পেয়েছেন মৃত ছেলের কবরের সন্ধান।

বিবিসি বাংলাকে সৌদি আরব প্রবাসী মনোয়ারা হোসেন জানিয়েছেন, "ও নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন ছেলের মোবাইল নম্বরে ফোন দিতাম। সবসময় বন্ধ পেয়েছি। হঠাৎ গত মাসের শেষের দিকে ফোনটা চালু পাই। হাতিরঝিল থেকে এক মহিলা উত্তর দেয়। আমি নিজে হাতিরঝিল গিয়েছি আমার ছেলেকে খুঁজতে। তারপর হাতিরঝিল থানায় গিয়ে জানলাম আমার ছেলের ভাগ্যে কি জুটেছে।"

হাতিরঝিল থানায় এই ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, ১৪ই জানুয়ারি বিকেল চারটা নাগাদ হাতিরঝিল সংলগ্ন মধুবাগ ব্রিজের নিচে একটি মরদেহ ভাসতে দেখা যায়।

কিছুটা ফুলে ওঠা মরদেহটি উদ্ধার করে প্রথমে পুলিশ সেটির সুরতহাল সম্পন্ন করে। তারপর মরদেহটি পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে।

এই কর্মকর্তার দেয়া তথ্যমতে ময়নাতদন্তের পর সেখানেই মরদেহটি পড়েছিল দেড় মাসের মত। ১১ই ফেব্রুয়ারি মরদেহটি আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামকে দেয়া হয় দাফনের জন্য।

সাদমান সাকিবের জন্ম সৌদি আরবে। তিন বছর বয়সে একবার বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলেন। এর ২০ বছর পর তিনি আবার বাংলাদেশে এসেছিলেন।

মনোয়ারা হোসেন প্রশ্ন তুলেছেন, "হাতিরঝিল থানা থেকে ভাটারা থানার কতই বা দূরত্ব? আমি দেড় মাস ধরে থানা, র‍্যাব, সিআইডিসহ নানা জায়গায় গেলাম। এই সময়ের মধ্যে তাদের এক শাখা থেকে আর এক শাখায় তথ্য দেয়ার কি কোন ব্যবস্থা ছিল না? সিম কার্ডের মাধ্যমে আমাকেই খুঁজে বের করতে হল যে আমার ছেলেটা আর নেই।"

নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে পুলিশ যা করে থাকে

বাংলাদেশে কোন ব্যক্তি নিখোঁজ হলে তার স্বজনদের এমন অভিজ্ঞতা নতুন নয়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধানের জন্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আলাদা কোন বিভাগ ও ডাটাবেজ নেই।

তদন্ত এগিয়ে নিতে থানায় জিডি করার পর স্বজনদেরই ছুটতে হয় পুলিশের পিছুপিছু।

মনোয়ারা হোসেন বলছেন, "আমার ছেলে তো প্রভাবশালী বা প্রশাসনের কারো ছেলে না। তাই তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি।"

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার এডিসি ইফতেখায়রুল ইসলাম জানিয়েছেন কেউ নিখোঁজ হলে প্রথম ধাপ হচ্ছে থানায় জিডি করা।

"ব্যাপারটি যদি এমন হয় যে নিখোঁজের ঘটনার সাথে অপহরণ ও কোন ধরনের মুক্তিপণের বিষয় জড়িত নেই, হারিয়ে গেছে বা বাসা থেকে কিছু না বলে চলে গেছে, তখন স্থানীয় থানাকে জিডি করে ব্যাপারটি অবহিত করতে হয়।"

নিখোঁজ ব্যক্তির ব্যাপারে জিডি করার পর ঘটনার খোঁজ খবর নিতে পুলিশের একজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

তিনি যদি সন্দেহ করবার মতো কিছু আছে বলে মনে করেন তখন আদালতের কাছে বিষয়টি তদন্তের জন্য আবেদন করেন।

ইফতেখায়রুল ইসলাম জানিয়েছেন, যে জেলায় ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে সকল থানায় এবং পার্শ্ববর্তী জেলার থানাগুলোতে বেতার বার্তা পাঠানো হয়।

যাতে ব্যক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে তথ্য চাওয়া হয়। গোয়েন্দা বিভাগও একটি ছায়া তদন্ত করে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা কি আসলেই তেমন, কতটা দ্রুততার সাথে সেটি কারা হয় সেনিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

তবে ইফতেখায়রুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা, তথ্য, তাদের সম্পর্কে করা সাধারণ ডায়রি এসব সম্পর্কিত কোন ডাটাবেজ এখনো তৈরি হয়নি।

বিভাগীয় পর্যায়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের একটি হিসেব রাখা হয়। তবে নানা অপরাধ ও অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে পুলিশের একটি ডাটাবেজ রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের নিউজ পোর্টালে কিছুদিন যাবত 'লষ্ট এন্ড ফাউন্ড' বলে একটি অংশ রয়েছে যাতে ছবি ও বিস্তারিত তথ্যসহ 'সন্ধান চাই' এমন খবর দেয়া হচ্ছে।

'অসনাক্তকৃত মৃতদেহ' নামে আর একটি অংশে মরদেহের ছবি দিয়ে অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের পরিচয় সম্পর্কে খোঁজ চাওয়া হয়।

তবে বিষয়গুলো এখনো খুব একটা গোছানোভাবে হচ্ছে না। অনেক নিখোঁজ ব্যক্তি সম্পর্কে এখানে কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

পুলিশ মাঝে মাঝে হারিয়ে যাওয়া কোন শিশু খুঁজে পেলে তার ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে থাকে।

যেসব ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে

বিশ্বব্যাপী অনেক দেশে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্য, ছবি ও আঙুলের ছাপসহ ডাটাবেজ রয়েছে।

পুলিশে সকল শাখায় সেসম্পর্কে বার্তা চলে যায়, যেকোনো শাখা সেখানে সার্চ করতে পারে। মরদেহ পাওয়া গেলে সেটি মিলিয়ে দেখা হয় নিখোঁজ ব্যক্তিদের ডাটাবেজে।

বাংলাদেশে কোন বেওয়ারিশ মরদেহ পাওয়া গেলে তাতে গুরুতর আঘাত না থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব পায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান খন্দকার ফারজানা রহমান মনে করেন, "যখন আমাদের দেশে কেউ নিখোঁজ হয়, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি খানিকটা আন্ডারমাইন করে। অনেক সময় বলা হয় ব্যক্তি হয়ত লোন নিয়ে ফেরত না দিতে পেরে নিজেই মিসিং হয়েছে। ঘটনার গুরুত্ব বিচার করে মাঝে মাঝে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। "

বাংলাদেশে এগারো কোটির মতো মানুষের হাতে জাতিয় পরিচয়পত্র রয়েছে যাতে আঙুলের ছাপসহ বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।

সিম কার্ড তুলতে গেলেও আঙুলের ছাপ দিতে হয়। এসব তথ্যের সমন্বয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরি করা খুব সহজ বলে তিনি মত দিয়েছেন।

ফারজানা রহমান বলছেন, "একটা ডাটাবেজ থাকা খুবই দরকার। প্রতিটি থানায় কয়টি মিসিং পারসন জিডি হচ্ছে সেটা ছবিসহ যদি ডাটাবেজে থাকে, তাহলে বেওয়ারিশ যেসব মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে তার সাথে ছবি মিলিয়ে খুব সহজেই জানা যায় এই মৃত ব্যক্তি আর নিখোঁজ ব্যক্তির একই ব্যক্তি কিনা। আবার কোনো থানায় যদি তথ্য থাকে তাহলে অন্য থানা সেটা খুব সহজে পেয়ে যাবে।"

তিনি মনে করেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়টি গুরুত্ব পায় না বলে সেসম্পর্কে ডাটাবেজ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও নেই।