গ্রেফতার ও অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার সম্পর্কে আইনে যা বলা আছে

    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার ব্যক্তির মা গণমাধ্যমে পাঠানো এক ইমেইল বার্তায় বিচারের আগে তার ছেলেকে ধর্ষক বা হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশে প্রায়শই দেখা যায়, খুব আলোচিত কোন অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাবার নাম, এমনকি বিস্তারিত ঠিকানাসহ সংবাদমাধ্যমে বাড়ির ছবি প্রকাশিত হয়।

অন্যদিকে খুনি, ধর্ষক, ডাকাত বা ছিনতাইকারী শব্দগুলো লিখে প্রায়শই গ্রেফতার ব্যক্তির গলায় ঝুলিয়ে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ

মানবাধিকার কর্মী, আইন ও শালিস কেন্দ্রের উপ-পরিচালক নীনা গোস্বামী বলছেন, বিচার প্রক্রিয়া শুরুর আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করলে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে না।

তিনি বলছেন, "কোন ব্যক্তি গ্রেফতার হলে তার আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে। এটি তার মানবাধিকার। সেটি সে করতে পারে যখন বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

"তার আগে মধ্যবর্তী যে সময়টুকু থাকে অনেক সময় দেখা যায় আগেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন রকম ট্যাগ লাগানো হয়। কিন্তু সেসময় সে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারে না কারণ বিচার শুরু হয়নি তাই তার তখন কিছু বলারও সুযোগ থাকে না।"

অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার ও আইন

ঢাকায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের যে শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে, তার নাম ও ছবি প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে যা বাংলাদেশে দণ্ডনীয় অপরাধ। পরে অবশ্য সেই ছবি সরিয়ে ফেলা হয়।

কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া শুরুর আগেই গ্রেফতার ও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা বাংলাদেশের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথাকথিত মিডিয়া ট্রায়ালের কারণে বিচারের আগেই অভিযুক্তরা জনমনে দোষী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যান।

আরো পড়ুন:

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খুরশীদ আলম বলছেন, "আমার জানা মতে নির্দিষ্ট কোন আইন নেই। শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে কিছু প্রভিশন আছে। কিন্তু এই আইনের আগেই হাইকোর্ট ডিভিশনের বেশ ক'টি রায় আছে।

"সেখানে বলা হয়েছে, শিশু যদি কোন মামলায় আসামী হয় তাকে আসামী বলা যাবে না। যদি কোন নারী হয় তাহলে তার ছবি ও নাম প্রকাশ করা যাবে না।

"হাইকোর্টের এরকম রায়ও আছে যে মিডিয়া ট্রায়াল যে করে, পুলিশ যে তাদের হাজির করে এগুলোর ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা আছে। কিন্তু সমস্যাটা হল এগুলো মনিটরিং করা হচ্ছে না।"

দু'হাজার বারো সালে একজন বিচারককে ফেনসিডিলসহ আটকের পর পুলিশ তাকে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করলে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলো যে গ্রেফতার বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটকের পর কোন ব্যক্তিকে যেন গণমাধ্যমের সামনে হাজির না করা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেটি মানা হচ্ছেনা।

অভিযুক্তর পরিবারের উপরে চাপ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার অধ্যাপক কাবেরী গায়েন বলছেন, গণমাধ্যম যেভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে উপস্থাপন করে তার কারণে প্রায়শই অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিবার এবং আত্মীয় স্বজনও চাপের মুখে পরে।

তিনি বলেন, "প্রায়শই দেখা যায় খুবই উত্তেজিত রিপোর্টিং করা হয়। অভিযুক্তর পরিবারকে নিয়ে যেভাবে টান দেয়া হয়, যে ভাষা ব্যাবহার করা হয় সেটা কাঙ্ক্ষিত নয়।

"যেমন অনেক দিন আগের কথা মনে আছে রিমা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় খুকুকে সবাই দোষী হিসেবে কিভাবে সাব্যস্ত করেছিল, মিন্নির ক্ষেত্রেও দেখুন। এরশাদ শিকদারের ক্ষেত্রে আরও কত কিছু টেনে সেনসেশনাল করা হয়েছিল। একজন অভিযুক্তরও পরিবার আছে আত্মীয় স্বজন আছে। তারাও হেনস্থার শিকার হন।"

বিচারে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা

খুব চাঞ্চল্যকর, আলোচিত অপরাধের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যে ধরনের জনমত তৈরি হয় সেই প্রেক্ষিতে অভিযুক্তর অধিকার প্রসঙ্গে কথা বলাও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

অভিযুক্তর পক্ষে কোন আইনজীবী দাঁড়াতে রাজি হননি এমন নমুনাও বাংলাদেশে রয়েছে।

নীনা গোস্বামী বলছেন, এতে বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি বলেন, "সকলেই তো মানুষ। যখন বারবার একজন অভিযুক্তকে এইভাবে উপস্থাপন করা হয় তখন ঘটনাটির মধ্যে আরও কিছু আছে কিনা, ঘটনাটি অন্য কোনভাবে দেখার সুযোগ আছে কিনা তা হয়ত চোখের আড়ালে চলে যায়। যা তদন্ত ও পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় একটা নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশঙ্কা থাকে।"