বাংলাদেশের নাটক-সিনেমায় পুলিশের চরিত্র: স্বাধীনভাবে কাজ করা কি কঠিন হয়ে উঠছে

    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

অ্যাপে রিলিজ করা একটি সিনেমার কিছু সংলাপ ও দৃশ্যের জন্য একজন পরিচালক ও একজন অভিনেতাকে আটকের পর অনেকে বলছেন - বাংলাদেশে নাটক, সিনেমা কিংবা সাহিত্যে পুলিশের চরিত্র নিয়ে স্বাধীন ভাবে কাজ করাই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নবাব এলএলবি নামের চলচ্চিত্রটির অর্ধেক অংশ আই থিয়েটার নামের একটি অ্যাপে মুক্তি দেয়া হয়েছে গত ষোলই ডিসেম্বর।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সেন্সর বোর্ডে সিনেমাগুলোকে সেন্সর সার্টিফিকেট নেয়ার বিধান থাকলেও এ সিনেমাটির ক্ষেত্রে তা হয়নি - অ্যাপে মুক্তি দেয়ার কারণে।

কিন্তু সেখানেই একটি দৃশ্যে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগের কারণে পর্নগ্রাফি আইনের লঙ্ঘন হয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশ।

কিন্তু এ অভিযোগে সরাসরি পরিচালক ও অভিনেতাকে আটক না করে আলোচনা করেও এর সমাধান করা যেতো বলে মনে করছেন তরুণ নির্মাতা ও লেখক আশফাক নিপুন।

তিনি বলেন, "আর্ট-কালচার তো ফুল-লতাপাতা দিয়ে বানাতে পারবোনা। আশেপাশের পরিবেশ ও বাস্তবতা নিয়েই ছবি বানাতে হবে। এখন যদি বিভিন্ন কমিউনিটি যদি আমাকে এমবার্গো দেয়ার চেষ্টা করে যে আপনি কিছু করতে হলে পারমিশন নিতে হবে বা পছন্দ না হলে জেলে পাঠাতে পারবো - এটা এ্যালার্মিং।"

তার আশংকা - এটা শুরু হলো পুলিশ দিয়ে, কিন্তু সামনে হয়তো বিচারকরা বলবেন বা ডাক্তাররা বলবেন তাদের চরিত্রগুলো নিয়ে।

"তখন তো কারো গল্পই বলা যাবেনা। আমরা যে কতটা কূপমণ্ডূকতার দিকে যাচ্ছি এটা তারই প্রমাণ। অথচ নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য বা ওয়েব কনটেন্টে থাকা চরিত্রগুলো তার পুরো কমিউনিটিকে প্রতিনিধিত্ব করেনা। সেখানে নিতান্তই ব্যক্তি চরিত্র ফুটে ওঠে"।

তিনি বলেন, গল্পের প্রয়োজনে চরিত্র আসে অর্থাৎ যখন একজন ব্যবসায়ী খারাপ এমন চরিত্র দেখানো হয়, তার মানে এই নয় যে পুরো ব্যবসায়ী সম্প্রদায় খারাপ।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

যদিও চলচ্চিত্রে পুলিশকে উপস্থাপনা নিয়ে পুলিশের দিক থেকে এমন প্রতিক্রিয়া এবারই নতুন নয়।

২০১৫ সালের এপ্রিলে চলচ্চিত্র পরিচালক, পরিবেশক ও প্রযোজকদের চিঠি দিয়ে পুলিশের চরিত্রে অভিনয় ও পোশাক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ মেনে চলতে বলা হয়েছিলো পুলিশের পক্ষ থেকে।

চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলছেন, সেবার তারা পুলিশের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও করেছিলেন।

"যেহেতু সেন্সরের বাইরে গিয়ে ওটিটিতে রিলিজ করেছে - তাই এটি একান্তই তার ব্যাপার।.. তবে যে সংলাপগুলো দিয়েছে, আমরা সবসময় আন্দোলন করে আসছি সেন্সর বোর্ড তুলে দিয়ে সার্টিফিকেশন বোর্ড করার জন্য। কিন্তু এমন অশ্লীল কিছু দিলে তাহলে আমাদের এই চাওয়াটাই ব্যাহত হবে। আমি বলবো, এটি আসলেই অশ্লীলতার পর্যায়ে পড়ে।"

তবে এবারে পরিচালক ও অভিনেতাকে আটকের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন এবং অভিযোগটিও নির্দিষ্ট। তিনি বলছেন বাংলাদেশের অনেক সিনেমায় অনেক কড়া কড়া সংলাপ আছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে - কিন্তু সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি কখনো।

আবহমান কাল ধরেই বিচারক, পুলিশ, আইনজীবী, ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক নেতার ভূমিকা উঠে এসেছে বাংলাদেশের বহু সিনেমায়।

কখনো নায়ক, কখনো ভিলেন হয়েছেন এসব চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতারা।

কিন্তু সংলাপের জন্য কাউকে কখনো হেনস্থা হওয়ার উদাহরণ খুব একটা পাওয়া যায়না।

তবে অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্য অরুণা বিশ্বাস বলছেন এ ঘটনাকে এভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ নেই - কারণ এখানে এমনভাবে অশ্লীলতা এসেছে যা সমাজের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

"আমাদের দেশে দেশপ্রেমের বহু ছবি আছে। পুলিশের নির্যাতনের ওপর বহু ছবি আছে। কিন্তু এমন অশ্লীল কথা বলার যৌক্তিকতা নেই। আমি এটাকে সমর্থন করিনা"।

চলচ্চিত্র গবেষক ও লেখক ডঃ তপন বাগচী অবশ্য বলছেন, শিল্প সংস্কৃতিতে সমাজের ক্ষত তুলে ধরা হয় তাই পুরো বিষয়টিকে শিল্প হিসেবেই দেখতে হবে।

তিনি বলেন সিনেমা সমাজের নেতিবাচক দিকগুলোকেই তুলে ধরে এবং সঙ্গত কারণেই পুলিশের সেসব চরিত্রগুলোই বেশি দেখা যায়।

এটিকে শিল্প হিসেবে বিবেচনা না করে পাল্টা ব্যবস্থা নিলে সেটি সিনেমা নির্মাণ শিল্পকেই বড় চাপে ফেলবে বলে মনে করেন তিনি।