কুমিল্লায় হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনায় খোঁজ নিচ্ছে ভারত

কুমিল্লার মুরাদনগরে হামলার শিকার একটি বাড়ি
ছবির ক্যাপশান, কুমিল্লার মুরাদনগরে হামলার শিকার একটি বাড়ি

বাংলাদেশে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগরে হিন্দুদের ওপর হামলা ও হিন্দু মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তারা এই বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে।

দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে বিবিসির নির্দিষ্ট এক প্রশ্নের মুখে মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীবাস্তব জানান, 'এই ঘটনাটির ব্যাপারে ঢাকায় আমাদের হাই কমিশন ও উপ-দূতাবাস বাংলাদেশের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলছে। তাদের কাছে বিষয়টি আমরা উত্থাপন করেছি।'

অনুরাগ শ্রীবাস্তব আরও বলেন, 'আমাদের এটাও জানানো হয়েছে যে বাংলাদেশ সরকার কুমিল্লার ওই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।'

'কীভাবে সেখানে সহিংসতার সূচনা হল, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো সেটা তদন্ত করে দেখছে। সেখানে যাতে এই ধরনের কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না-ঘটতে পারে, সেটা ঠেকানোর জন্যও পুলিশ ও প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।'

এর আগে হিন্দু পরিবারের ওপর হামলার ঘটনা সামনে আসার পর ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস বিষয়টি নিয়ে ঢাকার সঙ্গে কথা বলতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছিল।

ভারতের পার্লামেন্টে কংগ্রেসের দলনেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী বিবিসিকে বলেছেন, অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে এই ধরনের ঘটনার প্রভাব সীমান্তের এপারেও পড়তে পারে। সেজন্য তারা চান বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের কাছে উত্থাপন করা হোক।

বাংলাদেশ কী বলছে?

ভারতের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

তবে এই প্রসঙ্গে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''এই ঘটনা আসলে একটা দুর্ঘটনা, সেটা ওই দেশেও হয়। কোন সরকারই চায় না যে এগুলো হোক। আমাদের দেশ সম্প্রীতির দেশ। আমাদের দেশে মাইনরিটিরা যত সুখে আছে, অন্য অনেক দেশে সে অবস্থা নেই।''

''এরকম একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে আমরা তার বিচারের ব্যবস্থা করি, সেজন্য আমাদের কাছে তদবির করার দরকার নেই বা পরামর্শের দরকার নেই। আমরা নিজে থেকেই এ ব্যাপারে অ্যালার্ট। সম্প্রীতি কোথাও নষ্ট হোক, এটা আমরা চাই না, এটা আমাদের একটা প্রায়োরিটি ইস্যু।'' বলছেন মি. মোমেন।

তিনি বরং অন্যদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন, যাতে তাদের নিজের ঘরে এরকমের দুর্ঘটনা না হয়।

আরো পড়ুন:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

পহেলা নভেম্বর বাংলাদেশের কুমিল্লার মুরাদনগরে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার গুজব তুলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আড়াই'শ মানুষের বিরুদ্ধে বাঙ্গরা বাজার থানায় একটি মামলাও করা হয়েছে।

হামলার প্রতিবাদে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সংগঠন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এক সংবাদ সম্মেলন করে ঢাকাসহ দেশের জেলা-উপজেলায় প্রধান রাস্তায় দুই ঘণ্টার অবস্থান এবং প্রতিবাদ মিছিলের কর্মসূচিও পালন করেছে।

বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার গুজবে কয়েকদিন ধরে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেক্ষেত্রে সংখ্যালঘুদের টার্গেট করা হচ্ছে বলে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ অভিযোগ করেছে।

মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এখন পর্যন্ত যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তাতে ধর্ম অবমাননার বিষয় নেই বরং স্থানীয় রাজনীতির উপাদান আছে। তবে পূর্নাঙ্গ তদন্ত শেষেই বলা যাবে কি হয়েছিলো বা কেনো হয়েছিলো।

মি. তালুকদার জানান, রবিবারের ওই ঘটনার সাথে জড়িত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে এবং পুরো ঘটনার তদন্ত চলছে।

কী ঘটেছিল রোববার:

ঘটনাস্থল মুরাদনগর উপজেলার পূর্ব ধইর ইউনিয়নের কোরবানপুর গ্রামে সোমবার গিয়েছিলেন কুমিল্লার সাংবাদিক গাজীউল হক সোহাগ।

মি. হক বলছেন, ওই গ্রামের অধিবাসী কিশোর দেবনাথ কিষান, যিনি ফ্রান্সে বসবাস করছেন, তিনি গত শনিবার দুপুরে ফেসবুকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করে স্ট্যাটাস দেন।

ওই স্ট্যাটাসে একমত পোষণ করে মন্তব্য করেন তার প্রতিবেশী শংকর ও অনিল নামে দু ব্যক্তি।

এতে আপত্তি জানিয়ে স্থানীয়রা সেখানে বিক্ষোভ মিছিল করে। রাতেই শংকর ও অনিলকে আটক করে পুলিশ। পরদিন রোববার তাদের আদালতে পাঠানো হয়।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ভারতের রিপাবলিক টিভিতে বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতনের খবর

ছবির উৎস, REPUBLIC TV

ছবির ক্যাপশান, ভারতের রিপাবলিক টিভিতে বাংলাদেশের হিন্দু নির্যাতনের খবর

পরিস্থিতি শান্ত করতে মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গুরা থানার ওসি রোববার বিকেলে কোরবানপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সম্প্রীতি সমাবেশ ডাকেন, যেখানে স্থানীয় ইসলাম ধর্মের নেতৃস্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।

সেই সমাবেশ থেকেই একদল লোক উঠে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বনকুমার শিবের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে।

আরেকটি দল শংকর দেবনাথের বাড়িতে গিয়ে হামলা ও মন্দিরে আক্রমণ করে।

পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন গিয়ে চেয়ারম্যানের বাড়ির আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

গাজীউল হক বলছেন, রবিবারের হামলায় ৮/১০ টি বাড়িঘর ভাংচুর করা হয়।

পরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পক্ষ থেকে তিনটি মামলা হয়, যেখানে ২৯৬ জনকে আসামী করা হয়েছে।