বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার গুজবে সহিংসতা, সরকার পরিস্থিতিকে যেভাবে দেখছে

ধর্ম অবমাননার, গুজব, বাংলাদেশ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়ার কথা বলেছে।
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশে একাধিক মন্ত্রী বলেছেন, ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে কোন কোন গোষ্ঠী পর পর কয়েকটি সহিংস ঘটনা ঘটিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে বলে সরকার মনে করছে।

লালমনিরহাটে একজনকে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ক'দিন পরেই কুমিল্লায় হিন্দুদের কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

সরকার বলছে গুজব ছড়িয়ে উস্কানি দেওয়ার জন্য এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে তারা কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলেছে।

ইতোমধ্যে সরকারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জনসাধারণকে কোন ধরনের গুজব বা উস্কানিমূলক বক্তব্যে কান না দেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

কিন্তু মানবাধিকার কর্মীরা বলেছেন, এর আগেও বিভিন্ন সময় ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে আলোচিত সহিংস ঘটনাগুলোর বিচার হয়নি। সেজন্য এখন সরকারের ঘোষণা কতটা কার্যকর হবে- তা নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে।

আরও পড়ুন:

লালমনিরহাটের পর কুমিল্লা

ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার গুজবে কুমিল্লার মুরাদনগরে হিন্দু ধর্মবলম্বীদের কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে গত রোববার। এই ঘটনার পেছনে সংঘবদ্ধ কোন গোষ্ঠী রয়েছে বলে সেখানকার পুলিশ ধারণা করছে।

এর দু'দিন আগেই গত বৃহস্পতিবার লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামে শহীদুন্নবী জুয়েল নামের ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

লালমনিরহাটে নৃশংস হামলায় নিহত হন শহীদুন্নবী জুয়েল।

ছবির উৎস, TOUHIDUNNABI

ছবির ক্যাপশান, লালমনিরহাটে নৃশংস হামলায় নিহত হন শহীদুন্নবী জুয়েল।

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আবিদা সুলাতানা বলেছেন, পাটগ্রামে সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে নৃশংস্ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে-বিভিন্ন পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদে তারা এমন তথ্য পেয়েছেন।

"যে দু'জন আগন্তক এসেছিলেন, এখানে নামাজ পড়ার জন্য, তাদের সাথে যে কোন বিষয়ে একজনের বাদানুবাদ হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতেই মুহুর্তে এই গুজবটি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়িয়ে দেয়ে। একটা অস্থিতিশীল অরাজক অবস্থা সৃষ্টির চিন্তা হয়তো তাদের মাঝে ছিল, যেখানে সাধারণ মানুষকেও একত্রিত করা হয়।"

তিনি আরও বলেছেন, "কেউ কেউ সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছে সহিংসতা সৃষ্টির। তারা একটা অরাজক এবং ভীতিকর অবস্থা তৈরি করতে চেয়েছিল। তার প্রমাণ পাই আমরা, যেমন ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে আগুন দেয়া হয়েছে, ন্যাশনাল ব্যাংকেও কিছু ভাঙচুর হয়েছে। এবং ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও বেশ কিছু লোক রাস্তার ওপর আগুন জ্বালিয়ে সহিংস অবস্থায় অবস্থান নেয়। এগুলো কিন্তু ভিডিও করেও ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।"

সরকারের একাধিক সিনিয়র মন্ত্রী বলেছেন, ফ্রান্সে ইসলাম এবং ইসলামের নবীর কার্টুন নিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের প্রতিবাদে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবাদ বিক্ষোভ হচ্ছে। কিন্তু সেই সুযোগ নিয়ে কোন কোন গোষ্ঠী গুজব ছড়িয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে এবং পর পর দু'টি ঘটনায় সে ধরনের তথ্য সরকার পেয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেছেন।

আট বছর আগে ধর্ম অবমাননার গুজবে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ পল্লীতে হামলায় ১৩টি বৌদ্ধ মন্দিরে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়েছিল।

ছবির উৎস, MAJORITY WORLD

ছবির ক্যাপশান, আট বছর আগে ধর্ম অবমাননার গুজবে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ পল্লীতে হামলায় ১৩টি বৌদ্ধ মন্দিরে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়েছিল।

গুজবের বিরুদ্ধে কঠোর

লালমনিরহাট এবং কুমিল্লায় সহিংসতার প্রেক্ষাপটে এক সরকারি তথ্য বিবরণীতে গুজব সৃষ্টিকারীদের সম্পর্কে কোন তথ্য পেলে তা অবিলম্বে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ মুরাদ হাসান বলেছেন, গুজবের বিরুদ্ধে সরকার এখন কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

"গুজব বা উস্কানিমূলক যে কোন বক্তব্যে, বিশেষ করে ধর্মীয় ইস্যুতে, সম্প্রতি লালমনিরহাটে বা বিভিন্ন জায়গায় যে ঘটনাগুলো ঘটছে, এগুলো সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথেই দেখছে। এখন এই গুজব রটনাকারী যারা তারা তো দেশে বা দেশের বাইরে থেকে এ ধরনের অপচেষ্টা চালানোর পায়তারা করে। এখানে জনমনে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়, ফলে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি ও অস্থিরতা তৈরি হয়।"

তিনি আরও বলেছেন, "এ ধরনের পরিবেশ যারা তৈরি করবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ীই ব্যবস্থা নিতে সরকার বদ্ধ পরিকর। এটাই আমাদের সিদ্ধান্ত।"

২০১৬ সালে কুমিল্লার নাসিরনগরে ধর্ম অবমাননার গুজবে হিন্দুদের মন্দিরে এবং বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছিল।

ছবির উৎস, MASUK HRIDOY

ছবির ক্যাপশান, ২০১৬ সালে কুমিল্লার নাসিরনগরে ধর্ম অবমাননার গুজবে হিন্দুদের মন্দিরে এবং বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছিল।

বিশ্লেষকরা দেখছেন ভিন্নভাবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খন্দকার ফারজানা রহমান বলেছেন, "অনেক অসচেতনতা রয়েছে। আমরা অনলাইনে যতটা অথেনটিক নিউজ শেয়ার করি তার চেয়ে বেশি শেয়ার করি নিজের মতামত।"

"সে কারণে দেখা যায়, স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা আসলে ঘৃণা ছড়াই বা ঘৃণা প্রমোট করি।প্রশাসনের নজরদারিরও অভাব রয়েছে," বলেন তিনি।

আট বছর আগে ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামু, উখিয়া এবং টেকনাফে ফেসবুকে গুজবের জের ধরে ১৩টি বৌদ্ধ মন্দিরে এবং তাদের বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনায় ১৯টি মামলার কোনটিরই এখনও বিচার হয়নি।

এরপর ২০১৬ সালে কুমিল্লার নাসিরনগরে ধর্ম অবমাননার গুজবে হিন্দুদের মন্দিরে এবং বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছিল।

পরের বছরই ২০১৭ সালে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় সহিংসতা হয়েছিল।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেছেন, আলোচিত এই ঘটনাগুলোর কোনটিতেই এখনও বিচার হয়নি। সে কারণে ঘটনা এবং নৃশংসতা আরও বাড়ছে বলে তারা মনে করেন।

"দীর্ঘ দিন ধরে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও কোন কোন ঘটনায় মামলা এবং কিছু তৎপরতা দেখা যায়। কিন্তু চুড়ান্তভাবে মামলার নিস্পত্তি হচ্ছে না। সেজন্য এমন ঘটনা যারা ঘটায়, তাদের সামনে কঠিন কোন বার্তা নেই।"