পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু: অভিযুক্তদের ধরতে আলটিমেটাম দিল সিলেটে নিহত রায়হানের পরিবার

সিলেটে পুলিশ হেফাজতে নিহত যুবক রায়হানের পরিবার আজ এক সংবাদ সম্মেলন করে অভিযুক্ত হত্যাকারীদের গ্রেফতারের জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে।

পরিবারটি বলছে, এই সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার করা না হলে তারা কঠোর আন্দোলন শুরু করবেন।

এদিকে তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই সূত্রে জানা যাচ্ছে, এ ঘটনাটিতে যে মামলা হয়েছে, তার এজাহারে কোন অভিযুক্তের নাম উল্লেখ করা হয়নি। অথচ ঘটনাটি আলোচনায় আসার পরই বন্দরবাজার ফাঁড়ির একজন উপপরিদর্শকের নাম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে সামনে চলে আসে। ওই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারও করা হয়। এখন তার হদিশও মিলছে না।

সিলেট শহরের একটি পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হানকে হত্যার অভিযোগ ওঠার পর দোষীদের গ্রেফতারের দাবিতে গত কয়েকদিন ধরেই সিলেটে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সমাবেশ অব্যাহত রয়েছে।

৭২ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা না হলে 'হরতাল, অবরোধ সহ কঠোর কর্মসূচী' পালন করা হবে বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

রায়হানের মা সালমা বেগম অভিযোগ করেন পুলিশ তদন্তে 'গাফিলতি' করছে বলেই ৭২ ঘণ্টা সময়সীমা বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।

তিনি বলেন, "পুলিশ আমাদের বারবার বিভিন্ন সময়সীমা বেঁধে দিলেও শেষ পর্যন্ত কাউকেই আটক করতে পারেনি। এর আগে তারা নিজেরাই আমার ছেলের ময়নাতদন্ত করে রিপোর্ট দিয়েছিল। একবার বললো দুর্ঘটনা, একবার বললো স্ট্রোক করেছে, আবার একবার বললো গণপিটুনিতে মারা গেছে। পরে পিবিআইয়ের দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্তে উঠে এলো যে তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল।"

রায়হানের চাচা ও রায়হানের মা সালমা বেগমের বর্তমান স্বামী হাবিবুল্লাহ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সিলেট মেট্রোপলিটনের পুলিশ কমিশনার তাদের বাসায় এসে দুইদিনের মধ্যে এই ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। দুইদিন পার হয়ে যাওয়ার পরও তদন্তের কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।

ঐ ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, পিবিআই'কে।

মি. হাবিবুল্লাহ বলেন, পিবিআইয়ের তদন্তে এখন পর্যন্ত সন্তুষ্ট তারা।

মি. হাবিবুল্লাহ বলেন গত কয়েকদিনের মত আজও সিলেট শহরের বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করা হবে।

"বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার সহ বৃহত্তর সিলেটের অনেক জায়গাতেই মানব বন্ধন কর্মসূচী পালন করা হবে। এখনই মিছিল বা হরতালের মত কঠোর কর্মসূচী আমরা দিতে চাই না। ৭২ ঘণ্টা পার হওয়ার পর আমরা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবো।"

আরো পড়তে পারেন:

মামলার এজাহারে নেই অভিযুক্ত এসআই আকবরের নাম

রায়হানকে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর সোমবার সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেনসহ চারজন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হলেও ঐ ঘটনায় পুলিশের করা মামলাটি 'অজ্ঞাতনামা' আসামীদের নামে করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন সিলেট বিভাগ ও মেট্রোপলিটনের পিবিআইয়ের এসএসপি মোহাম্মদ খালেদুজ্জামান।

মি. খালেদুজ্জামান বলেন, "হত্যা এবং পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, এই ধারায় একটি মামলা হয়েছে অজ্ঞাতনামা আসামীদের নামে। আসামীদের শনাক্ত করা এবং তাদের গ্রেফতারের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।"

রায়হানের ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনও পিবিআইয়ের হাতে না এলেলেও ময়নাতদন্তে তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানান মি. খালেদুজ্জামান।

মি. খালেদুজ্জামান বলছেন, এই ঘটনায় এরই মধ্যে একটি বিভাগীয় তদন্ত করা হয়েছে।

"ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি একটি বিভাগীয় তদন্ত পরিচালিত হয়েছে, সেই তদন্তের আলোকে এরই মধ্যে একটা অ্যাকশন নেয়া হয়েছে। মামলার এজাহারে নির্দিষ্ট করে কারো নাম নেই, আমরা এখন নিশ্চিত হচ্ছি যে ফাঁড়ির কোন কোন পুলিশ সদস্য ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন অথবা আরো নতুন কারো নাম সংযুক্ত করা প্রয়োজন কি না।"

কী ঘটেছিল রায়হানের সাথে?

শনিবার ভোররাতে সিলেটের কাষ্টঘর এলাকা থেকে রায়হান আহমেদকে আটক করে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আসা হয়।

এরপর ভোররাতের দিকে অপরিচিত নম্বর থেকে মামাতো ভাই আবদুর রহমানের কাছে ফোন করে রায়হান। সেসময় মামাতো ভাই আবদুর রহমানকে টাকা নিয়ে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আসতে বলেন তিনি।

সকালে রায়হানের বাবা ফাঁড়িতে গেলে সেখান থেকে তাঁকে হাসপাতালে যেতে বলা হয়। হাসপাতালে গিয়ে রায়হানের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন তিনি।

রায়হান আহমেদের মৃত্যু সম্পর্কে ফাঁড়ির পুলিশের দাবি, ছিনতাইয়ের অভিযোগে এলাকাবাসী গণপিটুনি দিলে তারা গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

কিন্তু সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে কোন গণপিটুনি দেখা যায়নি। এই ফুটেজ প্রকাশিত হলে ঘটনার মোড় ঘুরে যায়।

রায়হানের পরিবারের পক্ষ থেকে হেফাজতে থাকাকালীন পুলিশের নির্যাতনের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে এমন অভিযোগ তোলা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের দায়ী করে একটি মামলা করা হয়

ঐ ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে মানুষ।

অভিযুক্ত উপ-পরিদর্শক আকবর হোসেন যাতে বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য দেশের সকল ইমিগ্রেশনকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়ে বৃহস্পতিবার চিঠি দিয়েছে ঘটনার তদন্তের দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন।