ঘূর্ণিঝড় আম্পান: পশ্চিমবঙ্গে গৃহহীন হাজার হাজার মানুষ ১০ দিন পরেও রাত কাটাচ্ছেন রাস্তায়

ছবির উৎস, Biswajit Hazra
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
সুপার সাইক্লোন আম্পান যে এলাকা দিয়ে বয়ে গিয়েছিল, সুন্দরবনের সেই প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে ঝড়ের দশ দিন পরেও হাজার হাজার মানুষ নিজের ঘরে ফিরতে পারেন নি, কারণ তাদের ঘরবাড়ি বলতে অবশিষ্ট কিছুই নেই।
এদের কেউ আশ্রয় নিয়েছেন এলাকার পাকা স্কুল বাড়ি অথবা ত্রাণ কেন্দ্রগুলিতে, আবার অনেকে রাস্তাতেই রাত কাটাচ্ছেন।
এরই মধ্যে জোয়ার এলেই চাষ অথবা বাস্তু জমি আবারও জলে ডুবে যাচ্ছে।
সুন্দরবনের একটি অঞ্চল মিনাখাঁ।
জায়গাটা দক্ষিণ আর উত্তর ২৪ পরগণার সীমানা ঘেঁষা। সেখানকার ট্যাংরামারি গ্রামের বাসিন্দা পবিত্র সর্দার বলছিলেন, "আমাদের এই এলাকার প্রায় হাজার কুড়ি মানুষের কারোর বাড়িই আস্ত নেই। মাটির বাড়িগুলো তো পুরোই ধ্বংস হয়ে গেছে, আর পাকা বাড়ি যে কটা আছে, তাও জলের তলায়। জোয়ার এলেই জলে ডুবে যাচ্ছে। কেউ দোতলা স্কুল বাড়ি বা ত্রাণ কেন্দ্রতে আছে, অনেকে রাস্তাতেই ত্রিপল বা প্লাস্টিক টাঙিয়ে থাকছে।"
কলকাতার বাসিন্দারা যখন তিন, চার বা পাঁচ দিন বিদ্যুৎ না পেয়ে হাহাকার করছিলেন, তখন দশ দিন পরে বিদ্যুতের পরিস্থিতির কথা জিজ্ঞেস করতে একটু ব্যঙ্গাত্মক ভাবেই হাসলেন মি. সর্দার।
"আর বিদ্যুৎ! একটা খুঁটিও নেই। সব উড়ে গেছে। বিদ্যুতের আশা কেউই করছি না আপাতত। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে যেটা একেবারেই ভুলে গেছি আমরা সেটা হল করোনার কথা। সামাজিক দূরত্ব বলুন বা অন্য কোনও নিয়ম, কিছুই মানা সম্ভব নয় এই সময়ে," বলছিলেন পবিত্র সর্দার।
সরকারি ত্রাণ সাহায্য কিছু কিছু এলাকায় যা পৌঁছচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

ছবির উৎস, Azizul Haldar
ত্রাণের ব্যাপারে একই চিত্র দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলাতেও।
ওই জেলাতেই আছড়িয়ে পড়েছিল সাইক্লোনটি।
মথুরাপুর অঞ্চলের পূর্ব রাণাঘাটা গ্রামের বাসিন্দা আজিজুল হালদার অঙ্ক অনার্সের ছাত্র। কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি গ্রামের ক্ষয়ক্ষতির একটা হিসাব বানিয়েছেন।
মি. হালদার জানাচ্ছিলেন এলাকায় একটা বাড়ি ছাদও আর আস্ত নেই।
"গ্রামের প্রতিটা বাড়িরই ছাদ উড়ে গেছে। অ্যাসবেস্টস হোক বা খড়ের চাল - সবারই মাথার ওপরে আকাশ। ওইভাবেই থাকতে হচ্ছে মানুষকে। সেদিন আবার বৃষ্টি হল, পুরোটাই বাড়ির মধ্যে পড়ল।
''আমরা খোঁজ নিয়ে দেখলাম গ্রামের প্রায় দুশো আড়াইশো পরিবার খুবই সঙ্কটে আছে। ত্রাণ সেভাবে এখনও কিছু আসে নি। ত্রিপল দেওয়া হবে বলে আজ স্লিপ বিলি হয়েছে," জানাচ্ছিলেন আজিজুল হালদার।
ঘূর্ণিঝড় এমন একটা সময়ে এসেছিল, যখন সারা দেশেই করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে লকডাউন চলছে। আর লকডাউনের কারণেই অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছে অনেক পরীক্ষা।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Azizul Haldar
রাজ্য বোর্ডের দশম শ্রেণীর মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হলেও বাকি থেকে গেছে ১২ ক্লাসের উচ্চমাধ্যমিকের বেশ কিছু পরীক্ষা।
আজিজুল হালদারের প্রতিবেশী আফসানা হালদারের দুটো পরীক্ষা বাকি থাকতেই লকডাউন শুরু হয়ে যায়।
আফসানার কথায়, "বই, খাতা সব ঝড় জলে ভিজে গিয়েছিল। এখন কিছুটা পড়ার অবস্থায় ফিরেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ তো নেই। তাই সেরকমভাবে পড়তে পারছি কই। আবার আমার কয়েকজন বন্ধুর তো পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ডও নষ্ট হয়ে গেছে। তারা কীভাবে পরীক্ষা দেবে জানি না। হয়তো কোনও ব্যবস্থা করবে স্কুল থেকে।"
ক্ষতিগ্রস্ত জেলার খণ্ডচিত্র যেমন এগুলি, অন্যদিকে মহানগরী কলকাতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে।

ছবির উৎস, Biswajit Hazra
কলকাতা পুরসভা বলছে শহরে পনেরো হাজারেরও বেশি গাছ উপড়িয়ে গিয়েছিল - যার সিংহভাগই কাটা হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সংযোগ প্রায় সব এলাকাতেই এসেছে, কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য দশদিন পরেও রয়েছে।
আর কলকাতার মানুষ যে বড় সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা হল মোবাইল বা ইন্টারনেট সংযোগ এখনও স্থিতিশীল হয় নি।








