ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ, সহিংসতা - হাসপাতালে 'লাশের স্তুপ', চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকেরা

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
- Author, সোরুস পাকজাদ, রোজা আসাদি, বিবিসি নিউজ পারসিয়ান, এবং হেলেন সুলিভান
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে একের পর এক সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় এত মানুষ হতাহত হয়েছেন যে অনেক হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। তাদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকসহ হাসপাতালগুলোর কর্মীদের।
ইরানের তিনটি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বিবিসির সাথে কথা বলেছেন, তারা জানিয়েছেন, তাদের হাসপাতালগুলাে সংঘাত-সহিংসতায় আহত ও নিহতদের ভিড় সামলাতে সমস্যায় পড়ছে।
হতাহতদের বেশিরভাগের শরীরে গুলির ক্ষত রয়েছে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
তেহরানের একটি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বিবিসিকে বলেন, "অনেক তরুণের মাথায় এবং বুকে সরাসরি গুলি লেগেছে।"
তেহরানের আরেকটি হাসপাতালের কর্মীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, শরীরে গুলি এবং রাবার বুলেটের ক্ষত নিয়ে আসা বহু মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছেন তারা।
এদিকে, ইরানে সহিংস পদ্ধতিতে বিক্ষােভ দমনের জবাব সামরিক হামলার মাধ্যমে দেয়া হবে বলে শুক্রবার পুনরায় হুশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরান অভিযােগ করেছে, দেশটির শান্তিপূর্ণ বিক্ষােভকে 'সহিংস নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং ব্যাপক ভাঙচুর' এর রূপ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের অভিযােগের জবাবে মি. ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, "ইরান এখন 'স্বাধীনতা' চায়, হয়ত অন্য যেকােন সময়ের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা করতে পুরােপুরি প্রস্তুত।
সতর্কতা: প্রতিবেদনে মৃত্যু এবং সহিংস আঘাতের বর্ণনা রয়েছে।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
২০২২ সালে তেহরানে পুলিশ হেফাজতে কুর্দি নারী মাহসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় দেশটিতে হওয়া বিক্ষোভের পর চলমান আন্দোলনকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই সপ্তাহ আগে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট, ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি দিয়ে দেশটিতে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষােভ শুরু হয়েছিলাে।
ক্রমে সে বিক্ষােভ দেশটির সব প্রদেশে এবং ১০০র বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্রমে তা সহিংস হয়ে ওঠে।
ধারনা করা হচ্ছে, সরকারি বাহিনীর হামলায় ইতিমধ্যে শত শত বিক্ষােভকারী নিহত ও আহত হয়েছেন। বহু মানুষ আটক হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও আহত ও নিহত হয়েছেন। স্থানীয় একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৪ জন সদস্য এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন।
বিবিসি পারসিয়ান নিশ্চিত হয়েছে, রাশত্ শহরের পুরসিনা হাসপাতালে শুক্রবার রাতে ৭০ জনের মরদেহ নিয়ে আসা হয়েছিল।
কিন্তু হাসপাতালের মর্গে এত মরদেহ রাখার জায়গা ছিল না, ফলে অনেকের লাশ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিবিসির কাছে 'ভয়াবহ' অভিজ্ঞতার বর্ণনা তুলে ধরেছেন।
সংঘর্ষের ঘটনার পর হাসপাতালটিতে রোগির চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, আহতদের কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) করার পর্যন্ত সময় ছিল না বলে জানিয়েছেন সেখানকার চিকিৎসকরা।

ছবির উৎস, Getty Images
"প্রায় ৩৮ জন মারা গেছেন, যাদের মধ্যে অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে...বিশেষ করে যাদের মাথায় ও হৃদপিণ্ডে সরাসরি গুলি লেগেছে," বলেন তেহরানের ওই হাসপাতালটির একজন চিকিৎসক।
এছাড়া গুলিতে আহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন বলে জানা যাচ্ছে।
"সংঘর্ষে এত বেশি মানুষ নিহত হয়েছে যে মর্গে মরদেহ রাখার জায়গা নেই," বিবিসিকে বলছিলেন তেহরানের ওই হাসপাতালের ওই চিকিৎসক।
এ অবস্থায় একটির ওপর আরেকটি মরদেহ রাখা হয়।
"এক পর্যায়ে মর্গে জায়গা না হওয়ায় প্রার্থনা কক্ষে নিয়ে গিয়ে মরদেহগুলো স্তূপাকারে রাখা হয়," বলেন হাসপাতালের চিকিৎসক।
হতাহতদের মধ্যে বেশির ভাগই বয়সে তরুণ।
"তাদের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। অল্প বয়সে এভাবে প্রাণ হারানোয় তাদের দিকে তাকাতে আমার কষ্ট হচ্ছিল," বলেন হাসপাতালের আরেক কর্মী।
মরদেহ হস্তান্তরের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিহতদের স্বজনদের কাছে সাত বিলিয়ন রিয়াল, যা প্রায় সাত হাজার মার্কিন ডলারের সমান অর্থ চেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিবিসি সহ বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের ইরানের ভেতর থেকে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারছে না।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় পুরোপুরিভাবে বিচ্ছিন্ন রয়েছে, যার ফলে তথ্য পাওয়া ও যাচাই করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ছবির উৎস, UGC
গত শুক্রবার রাতে স্টারলিংক স্যাটেলাইট সংযোগের মাধ্যমে যোগাযোগ করে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন ইরানের অন্যতম প্রধান চক্ষু হাসপাতাল ফারাবি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক।
তিনি জানিয়েছেন যে, রোগির চাপ বাড়তে থাকায় জরুরি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দিতে হাসপাতালটি বেশ সংকটের মুখে পড়েছে।
এ অবস্থায় সাধারণ রোগি ভর্তি এবং অস্ত্রোপচার স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ছুটিতে থাকা চিকিৎসকসহ সকল কর্মীকে ডেকে পাঠানো হয়েছে।
বিক্ষোভ দমনের ক্ষেত্রে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রায়ই শর্টগানের গুলি নিক্ষেপ করে থাকেন। এবারের আন্দোলনের সময়েও সেটি লক্ষ্য করা গেছে।
মধ্য ইরানের কাশান শহরের একজন চিকিৎসক বিবিসিকে বলেন, শর্টগানের গুলির আঘাতে বিক্ষোভকারীদের অনেকের চোখ নষ্ট হতে বসেছে।
তেহরানের একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসক বিবিসিকে জানান, হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি।
"আমি একজনকে দেখেছি, যার চোখে গুলি লেগে মাথার পেছন থেকে গুলি বেরিয়ে গিয়েছে," বলেন ওই চিকিৎসক।
গত বৃহস্পতিবার রাতে গুলিবিদ্ধ অনেক রোগি হাসপাতালে আসে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
"মধ্যরাতের দিকে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে একদল লোক দরজা ভেঙে গুলিবিদ্ধ একজন ব্যক্তিকে ভেতরে ফেলে রেখে যায়। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাকে বাঁচানো যায়নি, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সে মারা গিয়েছে," বলেন তেহরানের স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসক।
বৃহস্পতিবার ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর শিরাজের একটি হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে বিবিসি একটি ভিডিও বার্তা পায়।
তিনি জানান, বিপুল সংখ্যক আহতদের হাসপাতালে আনা হচ্ছে। কিন্তু এত রোগির ভিড় সামলানোর জন্য যতজন সার্জন প্রয়োজন, সেটি হাসপাতালের নেই।

ছবির উৎস, Office of the Iranian Supreme Leader/WANA (West Asia News Agency)
ইরান থেকে পাওয়া শুক্রবার রাতের কিছু ভিডিওতে তেহরানের রাস্তায় নেমে যানবাহনে আগুন দিতে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের।
এছাড়া রাজধানী তেহরানের কাছে কারাজে একটি সরকারি ভবনেও আগুন ধরিয়ে দিতে দেখা যায়।
বিক্ষোভ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ায় সেটি সামাল দিতে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর রীতিমত বেগ পেতে হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।
দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার রাতের সহিংসতা চলাকালে তেহরানে অন্তত ২৬টি ভবনে আগুন লাগানো দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যদিও ওইসব ঘটনায় কেউ নিহত হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
শুক্রবার বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে একাধিক সমন্বিত সতর্কতা জারি করেছে ইরানের সরকার।
দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, 'সশস্ত্র হামলাকারীদের' বিরুদ্ধে তারা কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শুক্রবার এক ভাষণে বলেছেন, "কয়েক লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ক্ষমতায় এসেছে" এবং বিক্ষোভের মুখে তারা "পিছু হটবেন না।"
যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ইরানে বিক্ষোভ ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বিক্ষোভকারীরা "মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার চেষ্টা করছে" বলে মন্তব্য করেছেন আলি খামেনি।

ছবির উৎস, Getty Images
এদিকে, ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত ইরানের শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভি দেশটির চলমান বিক্ষোভকে "চমৎকার" বলে বর্ণনা করেছেন।
সাধারণ ইরানিদের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
"আমাদের লক্ষ্য এখন আর কেবল রাস্তায় নামা নয়। শহরের কেন্দ্রগুলো দখল করাই এখনকার লক্ষ্য," সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় বলেন রেজা পাহলভি।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বসবাসরত পাহলভিও এখন দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমের এক পোস্ট বলেন, "ইরান স্বাধীনতার পথে হাঁটছে, যা সম্ভবত এভাবে দেখা যায়নি।"
যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষেভকারীদের সাহায্য করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।
একইভাবে বিক্ষোভে সমর্থন দিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডের লেইন। গত শনিবার তিনি 'সহিংস দমন-পীড়নের' নিন্দা জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক শুক্রবার বলেছেন, ইরানে চলমান বিক্ষোভে প্রাণহানির ঘটনায় তারা 'খুবই উদ্বিগ্ন'।
"বিশ্বের সব দেশে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকার জনগণের রয়েছে এবং সরকারের উচিৎ তাদের সেই অধিকার রক্ষা করা," বলেন তিনি।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস শুক্রবার একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। সেখানে তারা ইরানি কর্তৃপক্ষের প্রতি 'মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার" আহ্বান জানিয়েছেন।








