পশ্চিমবঙ্গে সুপার সাইক্লোন আম্পানের ব্যাপক ধ্বংসলীলা বিবিসির সংবাদদাতার চোখে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
সুপার সাইক্লোন আম্পান গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের ওপরে তাণ্ডব চালিয়ে চলে গেছে তিন দিনেরও বেশি হল।
বুধবার যখন সাইক্লোনের দাপট চলছে পুরোদমে, সেদিন বিবিসি-র পরিক্রমা অনুষ্ঠানে আমার সরাসরি সম্প্রচার মাঝপথেই বিঘ্নিত হয়েছিল টেলিফোন বিভ্রাটে। তারপর দুদিন সংবাদ জোগাড় করা আর সংবাদ পাঠানো যতটা কঠিন হয়ে গিয়েছিল, সেরকম পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে সুনামির খবর জোগাড় করে বিবিসি-র দপ্তরে পাঠানোর সময়।
যদিও সুপার সাইক্লোন আর সুনামির ধ্বংসের ব্যাপকতার মধ্যে কোনই তুলনা চলে না, তবু মোবাইল সংযোগ আর ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে খবর জোগাড় করা বা সেই খবর পাঠাতে গিয়ে যতটা সমস্যা হয়েছে গত ক'দিন, তাতে ২০০৪ সালের কথাই মনে পড়ছিল।
আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না, ক্ষয়ক্ষতি কোথায় কতটা হল, সেটা জানতে পারছি না। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই কলকাতা সহ তিনটি জেলায়।
পরের দিন সকাল থেকে জল নেই শহরের বাড়িগুলোতে।
ঝড়ের পরদিন রাস্তায় পা দিয়েই আন্দাজ পেয়েছিলাম যে কী পরিমাণ ধ্বংসলীলা চালিয়েছে সুপার সাইক্লোন আম্পান।

কয়েক পা পরপরই গাছ আর বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে আছে রাস্তায়। চেনা শহরটা যেন এক রাতেই পরিণত হয়েছে একটা ধ্বংসস্তুপে।
রাস্তাগুলোকে চেনা যাচ্ছে না - বড় বড় গাছ পড়ে আছে, আর তার মধ্যে দিয়ে এঁকে বেঁকে গাড়ি এগোচ্ছে। যেন জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। এমনকী কলকাতার খোদ কেন্দ্রে শহরের চিরচেনা রাস্তা পার্ক স্ট্রিট, ক্যামাক স্ট্রিটও ঝড়ের তাণ্ডবে জঙ্গলের চেহারা নিয়েছে।
কত হাজার গাছ যে উপড়ে গেছে কলকাতা শহরে, তা হিসাব করা কঠিন।

ছবির উৎস, Getty Images
কিছুটা মোবাইল সংযোগ সকালের দিকেও ছিল, তাতেই জানতে পারছিলাম কলকাতা শহরেও মৃত্যু হয়েছে অনেকের। কোথাও গাছ চাপা পড়ে মানুষ মারা গেছেন, কোথাও ঝড়ের দাপটে বাড়ি ভেঙ্গে গিয়ে তাতে চাপা পড়ে মারা গেছেন কেউ।
রওনা হয়েছিলাম দক্ষিণ ২৪ পরগণার দিকে। শহরের ধ্বংসস্তুপ পেরিয়ে জেলার রাস্তা ধরলাম, কিন্তু দৃশ্যপট খুব একটা পাল্টালো না।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

রাস্তার দুধারেই অসংখ্য গাছ আর বিদ্যুতের খুঁটি উল্টে পড়েছে। রাস্তায় ছড়িয়ে আছে বিদ্যুৎবাহী তার।
কোথাও পাকা বাড়ির টিনের চাল অথবা মাটির বাড়ির খড়ের চাল উড়ে গেছে, কোথাও টিনের ঘরের ওপরে বড় গাছ পড়ে সেটি দুমড়ে মুচড়ে গেছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগণার ক্যানিং ছাড়িয়ে মাতলা নদীর পাড়ে দেখছিলাম বেশ কয়েক জায়গায় নদী বাঁধ বা মীন-বাগদার ভেড়ির বাঁধ ভেঙে গেছে।
কোথাও বা মাছ ধরার ট্রলার কাৎ হয়ে পড়েছে।
যত অভ্যন্তরে ঢুকছি জেলার, ততই সাইক্লোনের ধ্বংসের ছবি আরও প্রকট হচ্ছে।

ছবির উৎস, আবদুর রউফ
সুন্দরবন লাগোয়া ওই এলাকায় ঝড়, সাইক্লোন, বন্যা, নদী বাঁধ ভেঙে চাষের ক্ষেতে জল ঢুকে যাওয়া - এসব দেখতে মানুষ অভ্যস্ত।
কিন্তু বাসন্তী এলাকার কালিডাঙ্গার প্রবীন বাসিন্দা বলাই নস্কর বলছিলেন, "এরকম ঝড় আমার জীবনে তো দেখিই নি। বাপ ঠাকুর্দার কাছে শুনিও নি এরকম ঝড়ের কথা। কপালজোরে প্রাণে বেঁচে গেছি।"
তার বাড়িটি পাকা। তাই সাহস করে পরিবারের মানুষদের নিয়ে বাড়িতেই থেকে গিয়েছিলেন মি. নস্কর।
তাই চোখের সামনেই দেখতে পেয়েছিলেন কীভাবে তাদের পুকুর পাড়ের তিনটি প্রকাণ্ড গাছ একসঙ্গে উপড়ে পড়েছিল।
ওই বাড়িরই পুত্রবধূ অর্চনা নস্কর জানাচ্ছিলেন, "চোখের সামনে দেখলাম তিন তিনটে গাছ ভীষণভাবে দুলতে দুলতে পুকুরের ওপর গিয়ে পড়ল। যদি পুকুরে না পড়ে বাড়ির দিকে পড়ত, বা পাশের বাড়ির ওপরে পড়ত, তাহলে সবাই মারা যেত।"
ঝড় থামার তিনদিন পরে যখন ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটা পরিষ্কার হচ্ছে অনেকটাই, তখন জানা যাচ্ছে দক্ষিণ আর উত্তর ২৪ পরগণা জেলায় সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সন্দেশখালি, হিঙ্গলগঞ্জ, গোসাবা বা সমুদ্রের কাছাকাছি সাগর, নামখানা, কাকদ্বীপ, আবার পূর্ব মেদিনীপুর - বিস্তীর্ণ এলাকায় কীভাবে তান্ডব চালিয়েছে আমপান।
হিঙ্গলগঞ্জ, মিনাখাঁ, হাসনাবাদ এসব অঞ্চলে বহু জায়গায় নদীবাঁধ ভেঙ্গে জল ঢুকেছে চাষের জমিতে। ঘরবাড়ি প্রায় আস্ত নেই কোথাওই। মানুষ পাকা রাস্তার ওপরে উঠে এসেছেন। গরু-ছাগলের মৃতদেহ, মাছের ভেড়ির বাঁধ ভেঙ্গে গিয়ে বেরিয়ে পড়া মরা মাছ - সবই দেখা যাচ্ছে রাস্তায়।
ধান অনেক জায়গাতেই কাটা হয়েছে, আবার কোথাও বাকি আছে। সেসব যেমন জলের তলায়, তেমনই সব্জির ক্ষেতে ঝড়ের আগে-পরে অবিরাম বৃষ্টির ফলে সব্জি পচে দুর্গন্ধ বেরচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images
"মাঠে টমেটো, বেগুন, বরবটি, লঙ্কা, উচ্ছে - এসব সব্জি ছিল। সব জলে ডুবে গেছে। পচে গিয়ে এখন গন্ধে টেঁকা যাচ্ছে না। পানের বরজ কোথাওই আর আস্ত নেই প্রায়।
''মাছ ধরার ইঞ্জিন নৌকা, জাল - এসবও গেছে," টেলিফোনে তিনদিন পরে যোগাযোগ করতে পেরেছিলাম পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় একেবারে বঙ্গোসাগরের উপকূলের বাসিন্দা দেবাশিষ শ্যামলের সঙ্গে।
পর্যটন কেন্দ্র দীঘা থেকে ২৫-৩০ কিলোমিটার অবধি এক-দেড় কিলোমিটার যে বিখ্যাত ঝাউবন ছিল, তা একেবারে ধবংস হয়ে গেছে।
"ওই ঝাউবনই আমাদের সমুদ্রের ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে বাঁচাতো। এখন আমরা পুরোপুরি এক্সপোজড হয়ে গেলাম," বলছিলেন মি. শ্যামল।
একদিকে সুপার সাইক্লোনের ক্ষয়ক্ষতি, অন্যদিকে ত্রাণ সামগ্রী বহু গ্রামেই এখনও না পৌঁছন নিয়ে মানুষের মধ্যে বিক্ষোভ বাড়ছে।
ত্রাণের অভাবে সাগর থেকে শুরু করে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল অথবা পূর্ব মেদিনীপুর - সব এলাকার মানুষই অভিযোগ করছেন।
যদিও মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও ত্রাণ নিয়ে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তা দেখতে নির্দেশ দিয়েছেন কর্মকর্তাদের।
ত্রাণ যেমন নেই, তেমনই বিদ্যুৎ সংযোগ, মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরো বিপর্যস্ত বেশিরভাগ গ্রামীণ এলাকায়।

ছবির উৎস, Ambarish Nag Biswas
তবে শনিবার রাতে যখন এই প্রতিবেদন লিখছি, তখন মহানগর কলকাতাতেও বহু এলাকা বিদ্যুৎহীন, মোবাইল সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না প্রায়ই। ইন্টারনেট কখনও আসছে, কখনও যাচ্ছে, বলতে গেলে নেই-ই।
শুক্রবার দুপুর থেকে বিদ্যুতের দাবিতে শহরের নানা অঞ্চলে পথ অবরোধ করেছেন সাধারণ মানুষ।
পুরসভার কর্মী, বিপর্যয় মোকাবিলা দল, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী - সকলেই গাছ কাটছে, কেটেই যাচ্ছ, তবুও শেষ হচ্ছে না।
সুপার সাইক্লোনের ধ্বংসলীলার মধ্যেই অনেকে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা শুরু করেছেন।
দক্ষিণ ২৪ পরগণার বাসন্তী থেকে ঝড়খালি যাওয়ার পথে দেখছিলাম ভরতগড় গ্রামের সঞ্জয় বারুই আর তার স্ত্রী কমলি বারুই সেই চেষ্টাই করছিলেন।

ঝড়ে তাদের মাটির বাড়ির খড়ের চাল উড়ে গিয়েছিল।
তিন চাকার ভ্যান রিক্সা চালিয়ে রোজগার করে কোনও মতে সংসার চালান বলছিলেন তিনি।
ঘরের চাল ছাওয়ার জন্য যে কাউকে ভাড়া করে আনবেন, সেই সামর্থ্যও নেই।
স্ত্রী একেক আঁটি খড় তুলে দিচ্ছিলেন স্বামীর হাতে। স্বামী সেই দিয়েই চাল ছাওয়ার চেষ্টা করছেন।








