করোনা ভাইরাস: ঘূর্ণিঝড়ের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে কি স্বাস্থ্য বিধি মানা হচ্ছে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, মুন্নী আক্তার
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা: এনামুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পান থেকে রক্ষা করতে প্রস্তুতি হিসেবে প্রায় ২৪ লাখ মানুষকে সাইক্লোন শেল্টারে নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের এই সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যার অংশ হিসেবে উপকূলীয় এলাকায় আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৪ হাজার করা হয়েছে।
এর আগে উপকূলে সাড়ে পাঁচ হাজার আশ্রয় কেন্দ্র ছিল।
তবে এতো কিছুর পরও কি আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে?
এ বিষয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যাচ্ছে যে, সেখানে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা তো দূরের কথা আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় আম্পান বাংলাদেশের যেসব জেলায় আঘাত হানছে তার মধ্যে অন্যতম সাতক্ষীরা জেলা। জেলার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর এলাকার বাসিন্দা জি এম শফিকুল আজম। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে তিনি পুরো পরিবার নিয়ে স্থানীয় একটি সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছেন।
বুধবার সকাল থেকে বেশ কয়েক বার কথা হয় তার সাথে। তিনি জানান, চার কক্ষের দোতলা একটি ভবন নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রটি তৈরি। সেখানে বুধবার সকাল পর্যন্ত তেমন মানুষ ছিল না।

ছবির উৎস, AHSANUR RAHMAN RAJIB
তবে বিকেলে সর্বশেষ কথা হওয়ার সময় তিনি জানান, দুর্যোগ থেকে বাঁচতে চার কক্ষেই আশ্রয় নিয়েছে সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। সামাজিক দূরত্ব তো দূরের কথা বসার জায়গা না থাকলেও তখনও আসছিল অনেকে।
"এই যে এই মাত্র ৫-৭ জন মানুষ আসলো। এর মধ্যে যারা বিছানা পেতেছিলো তারা সেগুলো উঠিয়ে মানুষকে বসতে দিচ্ছে। উপায় তো নাই।"
তিনি বলেন, "না দেখলে বিশ্বাস করবেন না, কোন লোক বসে ছাড়া শুতে পারবে না। লঞ্চে যেমন বসে যাতায়াত করে সেই অবস্থা।"
মি. আজম জানান, জায়গার অভাবে কক্ষ থেকে বেরিয়ে নিজেদের উদ্যোগেই তারা বারান্দা ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। বৃষ্টির পানি আসা ঠেকাতে বসার বেঞ্চ জড়ো করছেন তারা। তবে এতেও কাজ হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি আজিজুল ইসলাম জানান, দুপুরের পর থেকে ঘূর্ণিঝড়ের বেগ বাড়ার কারণে আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে শুরু করেছে মানুষ। রাত নাগাদ এই সংখ্যা আরো বাড়বে।
তিনি বলেন, আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে সামাজিক দূরত্বসহ কোন ধরণের স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হচ্ছে না।
"সামাজিক দূরত্ব তো কোনভাবেই মানা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ মানুষ বেশি।"
তিনি বলেন, "লোককেতো সব জায়গা দিতে হবে, বসাতে হবে। বসাতে গেলে তো সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকবে না।"
মাস্ক কাউকে দেয়া হয়নি বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে সরকারি কোন নির্দেশনা আসেনি বলেও জানান মি. ইসলাম।
একই এলাকায় নারী ও বয়স্কদের আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা বেশ কয়েক জনের সাথে কথা হয়। এদের মধ্যে একজন স্বেচ্ছাসেবী সাবিনা পারভীন। তিনি বলেন, আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে এমনিতে নানা সংকট তো রয়েছেই, সে কারণে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না।
এছাড়া যারা আশ্রয় নিয়েছে তাদের কাউকেই কোন ধরণের মাস্ক দেয়া হয়নি।

ছবির উৎস, Getty Images
"আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ল্যাট্রিনের সমস্যা। সেখানে স্বাস্থ্য বিধি মানাটা কঠিন। আর মাস্ক যারা বাড়ি থেকে পরে এসেছে তাদেরই আছে। কাউকে দেয়া হয়নি।"
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আজিজুল ইসলাম জানান, তার ইউনিয়নে মোট বাসিন্দার সংখ্যা ৩৭ হাজারের বেশি। আর নিয়মিত ১০টি সাইক্লোন শেল্টারের পাশাপাশি আরো চারটি শেল্টার অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করে মোট ১৪টি আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা যায়।
তবে মি. ইসলাম বলছেন যে, এতো কম সংখ্যক আশ্রয় কেন্দ্র দিয়ে এতো মানুষকে স্বাস্থ্য বিধি মেনে আশ্রয় দেয়াটা সম্ভব নয়।
"যেখানে দেড়-দুশো মানুষ আসলেই সাইক্লোন শেল্টার বুকড হয়ে যায়, সেখানে এতো মানুষকে আশ্রয় দেয়া সম্ভব নয়," বলেন মি. ইসলাম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় কেন্দ্রগুলো যেভাবে তৈরি করা হয়েছে তাতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মাহমুদ হোসেন বলেন, "ভালনারেবল মানুষদের সাইক্লোন শেল্টারে নেয়া হয়। তবে সাইক্লোন শেল্টারগুলোর যে ডিজাইন তাতে সেখানে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা সম্ভব নয়।"
তিনি আশঙ্কা করছেন, আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে যেহেতু এক সাথে অনেক মানুষ থাকে তাই সেখান থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়বে।








