করোনাভাইরাস : স্থলবন্দর খুলতে না পেরে রেলপথে বাংলাদেশে মালামাল পাঠাচ্ছে ভারত

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তিতে আন্তর্জাতিক স্থল-বন্দর খুলতে নাপেরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশে পণ্য পরিবহনের জন্যে এখন রেলপথকেই বেছে নিয়েছে।
নাসিক থেকে ইতিমধ্যেই ২০০০ টন পেঁয়াজের চালান নিয়ে একটি মালগাড়ি বাংলাদেশের পথে রওনা দিযেছে, যে চালান রোজার মাসে দেশটিতে পেঁয়াজের দাম কমাতে সাহায্য করবে বলেও ভারত আশা করছে।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি আছে, এই যুক্তি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ এখনও পেট্রাপোল বা হিলি-র মতো স্থলবন্দরগুলো চালু করেনি। ফলে বাধ্য হয়ে কেন্দ্রকে আপাতত রেলের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
গত মাসের শেষ দিনে সীমিত আকারে চালু হওয়ার তিনদিন পরেই পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থল বন্দরে মালপত্র ওঠানামা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল স্থানীয়দের বাধায়।
আর তাতে প্রচ্ছন্ন সায় ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার আর রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসেরও।
বাংলাদেশে মালপত্র পাঠানোর ক্ষেত্রে "ভারতের একটা আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা আছে", এই মর্মে কড়া চিঠি দিয়েও রাজ্য সরকারকে টলাতে পারেনি দিল্লি।
আরো পড়ুন:
পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় গত সপ্তাহেই বুঝিয়ে দেন, তারা এখনই ওই স্থলবন্দর খুলে দিতে রাজি নন।
তিনি বলেন, "পেট্রাপোলের ক্ষেত্রে কিছু 'পাবলিক ইস্যু' আছে। ওখানে সীমান্তের মানুষ কিছুটা 'ইমোটিভ কমোশনে' বা আবেগতাড়িত অস্থিরতার মধ্যে আছেন।"
"ফলে আমাদের সেটা মাথায় রেখেই পুরো বিষয়টা পরিচালনা করতে হচ্ছে।"
"আসলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেকগুলো ইস্যুই জড়িত। সেগুলো বিবেচনার পরই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে", জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রসচিব।

ছবির উৎস, Getty Images
সড়ক বন্ধ, অগত্যা রেলই ভরসা
এরপরই সড়কপথের বিকল্প হিসেবে দিল্লি রেলপথের কথা ভাবতে শুরু করে – যে পরিষেবা পুরোটাই কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন।
সেই অনুযায়ী নাসিকের কাছে লাসলগাঁও স্টেশন থেকে সোমবার পেঁয়াজ-বোঝাই একটি মালগাড়ি রওনা দেয় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে।
৫৬ ঘণ্টার যাত্রা শেষে সেটি আজ বুধবারই সীমান্তের গেদে-দর্শনা চেকপোস্টে পৌঁছবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দিল্লির থিঙ্কট্যাঙ্ক বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা দত্ত বলছিলেন, রোজার মাসে বাংলাদেশে পেঁয়াজ পৌঁছে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টাতেই ভারত এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, "এই মুহুর্তে বাংলাদেশের বেশ কিছু জিনিস দরকার, এবং অনেকগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের জন্যই ওরা ভারতের ওপর নির্ভর করেন – যার একটা হল পেঁয়াজ!"
"কিন্তু আমাদের মূল কার্গো মুভমেন্টটা যে রাস্তা দিয়ে হয়, সেটা এখন বন্ধ আছে। তার পেছনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হয়তো বৈধ যুক্তিও আছে – তারা সংক্রমণের ঝুঁকির কথা বলছেন।"
"এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই রেল কার্গোর কথা ভাবতে হয়েছে। রেলটা পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে – তারা জানেন এই সার্ভিসটা কীভাবে চালু রাখা যায়।"
"আর বাংলাদেশে এখন যে জিনিসটার চাহিদা তুঙ্গে, সেটা যদি ভারত জলদি সেখানে পৌঁছে দিতে না-পারে তাহলে পরে তো সেটার আর সেই মূল্য থাকে না, তাই না?" বলছেন ড: দত্ত।

ছবির উৎস, BBC Bangla
রেল কি পারবে রাস্তার বিকল্প হতে?
তবে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের বেশির ভাগটাই এখন হয় স্থলপথে, আর কিছুটা সমুদ্র বা নদীপথে।
রেলপথে দুদেশের মধ্যে যাত্রী চলাচল থাকলেও মালপত্র পরিবহনের ক্ষেত্রে রেল এখনই স্থলবন্দরের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে, সেই সম্ভাবনা অবশ্য ক্ষীণ।
আঞ্চলিক কানেক্টিভিটির বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ প্রবীর দে-র কথায়, "মনে হয় না রেলপথ এখনই সড়কপথের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে। কারণ এখানে আমাদের দুদেশের মধ্যে অনেকগুলো কনস্ট্রেইন্ট বা বাধা রয়েছে।"
"এই বাণিজ্যে লোডিং পয়েন্টগুলো ভারতে – যেমন চেন্নাই, কলকাতা, মুম্বাই, পাঞ্জাব ইত্যাদি - আর কনসাম্পশন পয়েন্ট হল বাংলাদেশ। এই লোডিং পয়েন্টে সব মাল নিয়ে এসে রেলে তোলা একটা বড় অসুবিধা।"
"আর আমাদের সড়কপথে যে কার্গো যায়, তার বেশিটাই হাফ পার্সেল লোড। কেউ হয়তো কিছু জামাকাপড়, কেউ কিছু বই, কেউ কিছু খেলনা বা খাবার পাঠাচ্ছে, সেগুলো সব একটা ট্রাকে ভরে ফুল পার্সেল লোড করা হল।"
"এরপর যারা অপারেটর বা ট্রেড ফরোয়ার্ডার আছেন তারা সেই ট্রাক তখন বাংলাদেশে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু একটা ট্রেনের ক্ষেত্রে এটা করা খুব কঠিন।"
তবে একলপ্তে কোনও বড় চালান বা কৃষিপণ্য থাকলে, ভারত থেকে সেটা বাংলাদেশে রেলপথে নিয়ে যাওয়া খুবই সম্ভব।
প্রবীর দে-র কথায়, "যদি পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট কার্গো থাকে, ধরা যাক পেঁয়াজ বা গম, তাহলে সেটা কিন্তু দশ-বারোটা ওয়াগনে ভরে খুব সহজেই দর্শনা বা সীমান্তের রেল স্টেশনে অনায়াসেই পাঠানো যেতে পারে।"
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, আজ যদি বিবিআইএন (বাংলাদেশ-ভূটান-ইন্ডিয়া-নেপাল) মোটর ভেহিক্যালস চুক্তির সব ফর্ম্যালিটি সেরে রাখা যেত তাহলেও কিন্তু দিল্লিকে পেট্রাপোলে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের হাতে জিম্মি হয়ে থাকতে হত না।
সে ক্ষেত্রে ভারতের মালবাহী ট্রাক সরাসরি ঢুকে পড়তে পারত বাংলাদেশে।
একইভাবে বাংলাদেশে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হলে ভারতের ভারী মালগাড়িও অনায়াসে সে দেশের ভেতরে ঢুকে মাল খালাস করে আসতে পারবে।










