পশ্চিমবঙ্গের আটকে পড়া শ্রমিকরা ঘরে ফিরতে মরিয়া

পশ্চিমবঙ্গ থেকে কাজ করতে গিয়ে লকডাউনে আটকা পড়া কিছু শ্রমিক ও তীর্থযাত্রী আজমীর থেকে ফিরছে -৪ মে ২০২০

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে লকডাউনে আটকে পড়েছেন কয়েক লক্ষ শ্রমিক। এদের মধ্যে কিছু রাজ্যে ফিরেছে বলে রাজ্য সরকার জানাচ্ছে।
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা

ভারতে করোনাভাইরাসে সংক্রমণ ও মৃত্যু যখন প্রতিদিনই বাড়ছে তখন কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে যাদের নিয়ে বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে ভিনরাজ্যে আটকে পড়া সেই শ্রমিকরা বলছেন তারা অবর্ণনীয় দুদর্শার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে লকডাউনে আটকে পড়েছেন কয়েক লক্ষ শ্রমিক।

কেন্দ্র অভিযোগ করছে এই শ্রমিকদের ফিরিয়ে নিতে যথেষ্ট সহায়তা করছে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

কিন্তু রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

যাদের নিয়ে রাজ্য-কেন্দ্র সংঘাত, সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।

শুনুন তাদেরই জবানিতে:

মেয়ের সাথে টিঙ্কু শেখ

ছবির উৎস, টিঙ্কু শেখ

ছবির ক্যাপশান, মেয়ের সাথে টিঙ্কু শেখ

টিঙ্কু শেখ, মুম্বাইতে আটকে পড়া এক রাজমিস্ত্রী

বীরভূম জেলার রামপুরহাট থেকে বাসে আমাদের গ্রামে যেতে হয়। আমাদের বিশেষ জমিজায়গা নেই, তাই বছর আটেক আগে মুম্বাইতে রাজমিস্ত্রীর কাজের খোঁজে চলে আসি। আমি একটানা থাকি না, কয়েক মাস কাজ করে ফিরে যাই, আবার আসি এখানে। দেশে বাবা মা আছে, স্ত্রী আর চার বছরের মেয়ে।

মেয়েটা বার বার বলছে আব্বু কবে বাড়ি আসবে!

কোনও মাসে ১৫, কোনও মাসে ২০ হাজার টাকা রোজগার হত। নিজের খরচ খরচা বাদে হাজার দশেক টাকা দেশে পাঠাতাম। বা কয়েক মাস কাজ করে আবার বাড়িও ফিরে যেতাম, যেমন এবারই তো আমার বাড়ি ফেরার ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল মে মাসের তিন তারিখ।

সে টিকিটে তো আর যেতে পারি নি - হঠাৎ লকডাউন করে দিল।

কেন্দ্রীয় সরকারের তো একটু ভাবার দরকার ছিল লকডাউন দেওয়ার আগে। আমাদের মতো বাইরে যে গরীব মানুষগুলো কাজ করে, তারা কী করবে, সেটা তো ভাবে নি সরকার।

এই দেড়মাস যে কী করে বেঁচে আছি, নিজেই জানি না।

আমরা যে শেঠের কাছে কাজ করি, তার একটা বাড়ি মেরামত হচ্ছিল। আমি আর আরও ছ'জন সেখানেই কাজ করছিলাম।

লকডাউন দেওয়ায় ওই বাড়িরই একটা দিকে সরু মতো একটা ঘরে আমরা থাকছি। বাইরে বেরতে পারছি না। শেঠ বলে দিয়েছে টাকা পয়সা কিছু দিতে পারবে না।

হাতে যা ছিল, তা শেষ। দেশেও কিছু পাঠাতে পারছি না। কিন্তু আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। তারও খরচ খরচা আছে।

কীভাবে যে কী হবে, জানি না।

পুরসভা থেকে ক'বার খাবার দিতে এসেছিল, কিন্তু সেই খাবার থেকে গন্ধ বেরচ্ছে। ও জিনিষ পোকামাকড়েও খাবে না বোধহয়।

একটা সংস্থা চাল-ডাল দিয়েছে মোট পাঁচবার। সেই খেয়েই আছি। শাক সব্জি কেনার তো পয়সাই নেই।

আশেপাশের অন্য রাজ্যের লোকদের তো তারা ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শুনছি।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

পশ্চিমবঙ্গের এই পরিযায়ী শ্রমিকরা বলছেন তারা অবর্ণনীয় দুদর্শার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

ছবির উৎস, টিঙ্কু শেখ

ছবির ক্যাপশান, পশ্চিমবঙ্গের এই পরিযায়ী শ্রমিকরা বলছেন তারা অবর্ণনীয় দুদর্শার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

কিন্তু আমাদের মমতা দিদি কী উদ্যোগ নিচ্ছেন বুঝতে পারছি না। উনি যদি একটু মুখ খুলতেন, তাহলে হয়তো আমরা বাড়ি ফিরে যেতে পারতাম।

এভাবে আর কতদিন চলবে জানি না।

মি. শেখের সঙ্গে কথা বলার মাঝেই তার ফোনটা চেয়ে নিয়ে কথা বলতে চাইলেন তারই এক সহকর্মী।

আব্দুল গণি, বীরভূম থেকে মুম্বাইতে আটকে পড়া আরেক রাজমিস্ত্রী

পয়সা-কড়ি সব শেষ। কতদিন শুধু ডাল ভাত খেয়ে বাঁচব জানি না। ওইটুকু রেশন কবার পেয়েছি বলে জানে বেঁচে আছি।

যদি দেশে ফিরতে পারতাম, তাহলে যা হোক কিছু করে রোজগার হত - কারও জমিতে খেটে বা এটা ওটা ঠিকই জুটে যেত।

অথচ অন্যান্য রাজ্য থেকে যারা এসেছে, তারা তো অনেকেই চলে যাচ্ছে। শনিবারও তো শুনলাম ভি টি স্টেশন (মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাল) থেকে ট্রেন যাচ্ছে।

আমাদের মুখ্যমন্ত্রীকে একটু বলুন না আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে। আর তা যদি না করা যায়, তাহলে বরং গুলি করার অর্ডার দিয়ে দিন। একেবারে ঝামেলা মিটে যাবে তাহলে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন!

মনোরঞ্জন মন্ডল, কেরালা থেকে মুর্শিদাবাদের বাড়িতে ফেরা এক পরিযায়ী শ্রমিক

আমি কেরালায় কাজ করছিলাম। এর্ণাকুলামের পেরুমবাভুরে মিস্ত্রীর কাজ করি।

আমার একার রোজগারেই দেশের বাড়িতে সংসার চলছিল।

মার্চ মাসের ২২ তারিখ যেদিন কারফিউ দিল, তার পরের দিন মালিককে যখন ফোন করে কাজের কথা জানতে চাইলাম, সে বলে দিল এখন আর আসতে হবে না!

ব্যস, সেই শেষ। আর কাজ নেই তারপর থেকে।

চেন্নাই পুরসভার কাছ থেকে নাস্তা আসার অপেক্ষায় রাস্তায় লাইন দিয়েছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, চেন্নাই পুরসভার কাছ থেকে নাস্তা আসার অপেক্ষায় রাস্তায় লাইন দিয়েছেন লকডাউনে আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকরা।

ঘর ভাড়া দিতে পারিনি আমরা অনেকে। ঘরের মালিক মারধরও করেছে অনেককে। আবার ঘর ভাড়া দিতে পারিনি বলে পাখাও চালাতে দিত না।

কেরালা সরকার অবশ্য দুবার করে খাবার দিত। সেই খেয়েই খুব কষ্ট করে থাকতে হয়েছে।

কিন্তু আমাদের সরকারের দরকার ছিল দায়িত্ব নিয়ে আমাদের মতো লোকদের ফিরিয়ে আনা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেই দায়িত্ব নিল কই! তবে ভোটের সময়ে সব দল এসে ভোট চাইবে!

শেষমেশ অবশ্য শুনলাম ট্রেন ছাড়বে।

৯৪০ টাকা করে টিকিট কাটতে হয়েছে। আমার কাছে পয়সাকড়ি কিছুই ছিল না। মালিকের কাছ থেকে ধার করে টিকিট কেটেছি। নাহলে ট্রেনে চড়তেই দিত না।

ট্রেনে ওঠার আগে একটা করে পাউরুটি আর একটা জলের বোতল দিয়েছিল।

চারদিন ট্রেনে ছিলাম। দিনে দুবার করে খাবার দিত ট্রেনে।

রাত দেড়টার সময়ে কদিন আগে বাড়ি পৌঁছই।

আমাকে কোয়ারেন্টিনে যেতে হয়নি, কারণ আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানে করোনা ছড়ায়নি। তাই বাড়িতেই থাকতে দিয়েছে আমাকে।

কি নিয়ে বাক যুদ্ধ?

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহর একটি চিঠি শনিবার সকালে গণমাধ্যমে এসেছে, যাতে তিনি অভিযোগ করেছেন যে অন্য রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট সহায়তা করছে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

দিল্লি থেকে পায়ে হেঁটে ঘরমুখো শ্রমিকের দল - ৯ই মে ২০২০

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অনেক রাজ্যে শ্রমিকরা পায়ে হেঁটে বাড়িমুখো রওনা দিয়েছেন। কিন্তু অনেকের জন্য বাড়ি অনেক দূরের পথ।

রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ওই চিঠির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে মমতা ব্যানার্জীই প্রথম মুখ্যমন্ত্রী যিনি অনেক আগে থেকেই পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বাস আর ট্রেনে করে কয়েক হাজার শ্রমিক-ছাত্র-তীর্থযাত্রী ফিরেওছেন পশ্চিমবঙ্গে।

মি. শাহর চিঠি সামনে আসার পরে তৃণমূল কংগ্রেস এটাও জানিয়েছে যে আরও আটটি বিশেষ ট্রেনে পরিযায়ী শ্রমিককে ফিরিয়ে আনা শুরু হচ্ছে শনিবার থেকেই।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর চিঠির জবাব দিতে গিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস বলছে আজ শনিবার থেকেই বিভিন্ন রাজ্যে আটকে পড়া শ্রমিকদের নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের উদ্দেশ্যে ট্রেন আসবে। প্রথম ট্রেনটি হায়দ্রাবাদ থেকে আজই ছাড়বে।

এছাড়াও কর্ণাটক, তামিলনাডু, পাঞ্জাব থেকে মোট ৩১ হাজারেরও বেশি শ্রমিককে আটটি বিশেষ ট্রেনে চাপিয়ে রাজ্যে ফিরিয়ে আনার বন্দোবস্ত ইতিমধ্যেই করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তৃণমূল কর্মকর্তারা।

করোনা

ছবির উৎস, BBC

করোনা

ছবির উৎস, BBC