করোনাভাইরাস: চীন ও চীনের বাইরে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, অ্যান্ড্রু ওয়াকার
- Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস অর্থনৈতিক সংবাদদাতা
চীন ও চীনের বাইরে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে মানুষের মৃত্যু এবং আক্রান্ত হবার হারই যে শুধু বাড়ছে তাই নয়, এর অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রাও বাড়ছে, প্রধানত চীনের ভেতরে, এমনকী বাইরেও।
এই ক্ষতি শুধু ভাইরাস সংক্রমণের কারণে নয়, বরং এর বিস্তার ঠেকানোর জন্য চীনকে বড় ধরনের আর্থিক মাশুল দিতে হচ্ছে।
উহান শহর, যেখান থেকে এই সংক্রমণের সূচনা, সেখান থেকে বাইরে যাবার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। উহানের জনসংখ্যা এক কোটি দশ লাখ।
অবরুদ্ধ শহর এখন শুধু উহান নয়, একই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে হুবেই প্রদেশের অন্যান্য এলাকাতেও। এর ফলে ব্যবসা সংক্রান্ত সবরকম ভ্রমণ বন্ধ রয়েছে। পণ্য ও কর্মীদের যাতায়াতও বন্ধ হয়ে গেছে।
ভাইরাস ছড়ানোর আশংকার কারণে বহু মানুষ এমন ধরনের কাজকর্ম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যার থেকে তাদের জন্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কাজেই রেস্তোঁরা, সিনেমা, পরিবহন কোম্পানি, হোটেল এবং দোকানবাজার সব কিছুর ওপরই দ্রুত এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
এর ওপর চীনা চান্দ্র নববর্ষের ছুটির সময় এই স্বাস্থ্য সংকট দেখা দেওয়ায় এই শিল্পগুলো বিশেষ করে বড়ধরনের বাণিজ্যিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
চীনের জাতীয় কর্তৃপক্ষ নববর্ষের ছুটি আরও কয়েকদিন বাড়িয়ে দিয়েছে এবং কোন কোন প্রদেশে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই ছুটির মেয়াদ আরও লম্বা করেছে। কোন কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মচারীদের আরও দেরি করে কাজে ফেরত আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উৎপাদনের কাজ এবং পণ্য বিক্রি বেশিদিন বন্ধ রাখলে বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত ছোটখাট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য।
বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানকেই নানাধরনের বিলের পাওনা পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি কর্মচারীদের বেতনও দিতে হবে।
যেসব পণ্য নির্মাতা বিদেশে তাদের পণ্য বিক্রি করে তাদের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে, যেটা হল তারা চীনের কাছ থেকে পণ্য কেনায় অনাগ্রহ দেখাতে পারে।
গুয়াংডং প্রদেশে উইং সাং ইলেকট্রিকাল নামে একটি কোম্পানি যারা কোঁকড়া চুল সোজা করান জন্য হেয়ার স্ট্রেটনার এবং চুল শুকানোর জন্য ব্লো-ড্রায়ার তৈরি করে তার মালিক হার্বাট উন বিবিসি নিউজকে বলেছেন, আমেরিকা-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের একটা ধাক্কার পর তাদের মত প্রতিষ্ঠানের জন্য এটা গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে উঠতে পারে।
''এই মহামারির কারণে চীন থেকে এই পণ্য না নিয়ে অন্য দেশ থেকে তা আমদানি করার জন্য চাপ বাড়বে।''

ছবির উৎস, Getty Images
অর্থনৈতিক ক্ষতি শুধু চীনের ভেতরেই সীমিত নয়।
আন্তর্জাতিক পরিসরে যারা খুচরা ব্যবসা করে তারা চীনে তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। যেমন আসবাব বিক্রির প্রতিষ্ঠান এবং কফির প্রতিষ্ঠান স্টারবাকস্।
বেশ কিছু বিমান সংস্থা চীনে তাদের ফ্লাইট বন্ধ রেখেছে এবং আন্তর্জাতিক হোটেল সংস্থা যারা পৃথিবী জুড়ে হোটেল ব্যবসা চালায়, তারা খদ্দেরদের তাদের হোটেল বুকিংয়ের অর্থ ফেরত দিতে চেয়েছে।
এর ওপর রয়েছে আন্তর্জাতিক স্তরে যেসব পণ্য সরবরাহের সম্বন্বিত কার্যক্রমের অংশ হিসাবে চীনের ভূমিকা রয়েছে, সেগুলো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সতেরো বছর আগে যখন সার্স নামে শ্বাসযন্ত্রের গুরুতর সংক্রমণের কারণে চীনে বড়ধরনের স্বাস্থ্য সংকটের ঘটনা ঘটেছিল, তার পর থেকে এখন এধরনের পণ্য সরবরাহের নেটওয়ার্কে চীন অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি হাইউনডাই তাদের গাড়ি তৈরির কাজ স্থগিত করে দিয়েছে চীন থেকে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহের অভাবের কারণে। এর সম্ভাব্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব যে ভবিষ্যতে গাড়ির বাজারে পড়তে যাচ্ছে এটা থেকে স্পষ্ট তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী গাড়ি নির্মাণ শিল্পে এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পে যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী দেশ হিসাবে চীনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
চীন থেকে যন্ত্রাংশ সরবরাহে ঘাটতির কারণে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের কারখানায় হাইউন্ডাই গাড়ি তৈরি বন্ধ করে দিয়েছে। ফক্সওয়াগান ও বিএমডাব্লিউ চীনে গাড়ি নির্মাণের কাজ বন্ধ রেখেছে।
৩৭%হাইউন্ডাই গাড়ি তৈরি হয় দক্ষিণ কোরিয়ায়।
$৬৬০ মিলিয়ন চীনে জার্মান গাড়ি প্রস্তুতকারকদের প্রতি কর্মদিবসের উপার্জন
৪০চীনে জার্মান গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানার সংখ্যা
১০০,০০০চীনে ফক্সওয়াগান কারখানায় কর্মীর সংখ্যা
বহু মোবাইল ফোন এবং কম্পিউটার চীনে তৈরি হয়। অনেক ফোন এবং কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ তৈরি হয় চীনে।
এই স্বাস্থ্য সংকটের প্রভাব অনুভূত হচ্ছে শেয়ার ও অর্থবাজারেও।
বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজারে দু সপ্তাহ আগের তুলনায় দরপতন হয়েছে। চীনা নববর্ষের ছুটির পর বাজার খোলার প্রথম দিনে চীনের বাজারে মূল্যপতনের হার আট শতাংশ।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
এক বছরের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম সবচেয়ে নিচে নেমে গেছে।
গত দুসপ্তাহে তেলের দাম পড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। যা চীনে তেলের চাহিদা কমে যাবার প্রতিফলন। চীনের তেল শোধনাগার সাইনোপেক অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমিয়ে দিয়েছে বলে খবরে জানা গেছে।
তামার দামও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ১৩ শতাংশ কমে গেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
নির্মাণ শিল্পে তামা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ধারণা করা হচ্ছে তামার এই মূল্যহ্রাসও চীনের ব্যবসাবাণিজ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে।
এইসব পণ্য সরবরাহের জন্য অন্য দেশ এগিয়ে আসছে যেটা চীনের অর্থনীতির জন্য দু;সংবাদ হতে পারে। তবে এই ক্ষতির চেহারা কী দাঁড়াবে তা এখনই বলা কঠিন।
চীনা কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এবং কীভাবে এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাবে তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে।
তবে কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ এই ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে কিছু পূর্বাভাস দেবার চেষ্টা করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছে বছরের প্রথম চার মাসে এই প্রাদুর্ভাবের প্রভাব পড়বে স্মার্টফোন শিল্পের ওপর।
৪ মিলিয়নকমবে আইফোনের চালানের পরিমাণ ২০২০-এর প্রথম কোয়ার্টারে
৩২%আনুমানিক কমবে চীনা স্মার্টফোনের চালান ২০২০র প্রথম কোয়ার্টারে
৫%আনুমানিক হ্রাস চীনা স্মার্টফোনের চালান পুরো ২০২০ সালে
অক্সফোর্ড ইকনমিক্স নামে একটি সংস্থা অনুমান করছে ২০২০সালের প্রথম চার মাসে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার এক বছর আগের তুলনায় শতকরা ৪ ভাগ কম হবে।
এই ভাইরাস সংক্রমণের আগে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস যা ছিল গোট বছরে তার পরিমাণ ০.৪ শতাংশ কম হবে বলে তাদের পূর্বাভাস।
তারা আরও বলছে এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ০.২ শতাংশ কমবে।
তবে এই পূর্বাভাস তারা বলছেন সঠিক হতে পারে একমাত্র চীন এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সফল হলে। নাহলে অর্থনীতিতে এর সূদুরপ্রসারী প্রভাব হবে আরও মারাত্মক।








