আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সড়ক পরিবহন আইন: যেসব ধারা নিয়ে মালিক-শ্রমিকদের আপত্তি
- Author, সায়েদুল ইসলাম
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ফরিদপুরের বাসিন্দা বিউটি আক্তার একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরতে গিয়ে আটকে পড়েন পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ধর্মঘটে।
''অফিস থেকে রাগ করেছে, কিন্তু আমি কি করবো বলেন। তারপরেও এই কষ্ট মেনে নিতে রাজি আছি, যদি আইনটা শক্ত হয়। আমাদের এই কষ্টের বিনিময়ে যদি সড়কে মানুষের মৃত্যু বন্ধ হয়, সেটাও ভালো।''
তিনি চান, আইনটির বাস্তবায়নে যেন কোন ছাড় দেয়া না হয়।
কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের চাপের মুখে আপাতত জুন মাস পর্যন্ত আইনের কয়েকটি ধারার প্রয়োগ করা হবে না বলে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মালিক-শ্রমিকদের আপত্তি মূলত ওই আইনটির নয়টি ধারা নিয়ে। এসব ধারা পরিবর্তনের দাবির মুখে বিবেচনা করার আশ্বাস দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
কিন্তু আইনটির এই ধারাগুলোয় কি রয়েছে?
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮, যেটি পহেলা নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে, তার নয়টি ধারা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন মালিক ও শ্রমিকরা। তারা এসব ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।
এই ধারাগুলো হলো ৭৪, ৭৫, ৭৬, ৭৭, ৮৪, ৮৬, ৯০, ৯৮ ও ১০৫।
এসব ধারার বিস্তারিত জানা যাক:
৭৪ নম্বর ধারা: মালিকানা পরিবর্তনের বৈধতা
মোটরযানের মালিকানা পরিবর্তনের ৩০দিনের মধ্যে হস্তান্তরকারী নির্ধারিত ফরমে ও পদ্ধতিতে কর্তৃপক্ষকে জানাবেন এবং তার অনুলিপি নতুন মালিককে দেবেন। আইনের ২১ ধারায় বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু নতুন মালিক যদি এসব বিধান ভঙ্গ করা হলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং সেজন্য অনধিক এক মাস কারাদণ্ড, অনধিক পাঁচ হাজার টাকা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আরো পড়ুন:
৭৫ নম্বর ধারা: ফিটনেস সংক্রান্ত
এই ধারায় বলা হয়েছে যে, ফিটনেস সনদ ছাড়া, মেয়াদ উত্তীর্ণ ফিটনেস সনদ ব্যবহার, ফিটনেসের অনুপযোগী, ঝুঁকিপূর্ণ বা ক্ষতিগ্রস্ত, রংচটা, বিবর্ণ বা পরিবেশ দূষণকারী ইত্যাদি মোটরযান ব্যবহার করা হলে তা ধারা ২৫ লঙ্ঘন করা হবে। সেক্ষেত্রে শাস্তি হিসাবে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড, অনধিক ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
৭৬ নম্বর ধারা: ট্যাক্স টোকেন
এই ধারায় বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি যদি ট্যাক্স টোকেন (গাড়ির ট্যাক্স প্রদাণের স্টিকার) ব্যতীত বা মেয়াদ উত্তীর্ণ ট্যাক্স টোকেন ব্যবহার করে মোটরযান চালনা করে (মোটর ভেহিকেল আইন অনুযায়ী অব্যাহতিপ্রপ্ত মোটরযান ব্যতীত) ধারা ২৬ ভঙ্গ করেন, তাহলে অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
৭৭ নম্বর ধারা: রুট পারমিট ছাড়া পাবলিক প্লেসে পরিবহন যান ব্যবহার
কোন ব্যক্তি যদি ধারা ২৮ এর উপধারা-১ ভঙ্গ করেন, যেখানে বলা হয়েছে যে, সরকারের দেয়া এবং প্রতি-স্বাক্ষরিত রুট পারমিট ছাড়া কোন পরিবহন যানের মালিক পাবলিক প্লেসে পরিবহনযান ব্যবহার করতে বা ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবেন না।
এছাড়া রুট পারমিটে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলে স্টেইট ক্যারিট কন্ট্রাক্ট ক্যারিজ. স্টেইট ক্যারিজে পণ্য পরিবহন, মালিক ব্যবসায়িক বা বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ব্যক্তি বা পণ্য পরিবহন করতে পারবেন না।
এরকম কোন অপরাধ করা হলে অনধিক তিন মাসের কারাদণ্ড, অনধিক বিশ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
ধারা নম্বর ৮৪: কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত কারিগরি নির্দেশনা অমান্য করা
মোটরযানের নির্মাণ, সরঞ্জামাদির বিন্যাস, রক্ষণাবেক্ষণ এমনভাবে করতে হবে যাতে চালক কার্যকরভাবে সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন। বাংলাদেশে ডান দিকে স্টিয়ারিং থাকবে।
কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত কারিগরি নির্দেশনার বাইরে মোটরযানের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, আসন বিন্যাস, হুইল বেইজ, রিয়ার ওভার হ্যাংগ, ফ্রন্ট ওভার হ্যাংগ, সাইড ওভার হ্যাংগ, চাকার আকৃতি, প্রকৃতি ও অবস্থা, ব্রেক ও স্টিয়ারিং, গিয়ার, হর্ন, সেফটি গ্লাস, শব্দ নিয়ন্ত্রণের মাত্রা ইত্যাদি বা সমজাতীয় অন্য কিছুর পরিবর্তন করা যাবে না। রেজিস্ট্রেশন করা মোটরযানের কারিগরি ও অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।
এসব বিধান লঙ্ঘন করা হলে অন্তত এক বছরের কারাদণ্ড ও অনধিক তিন বছরের কারাদণ্ড, অনধিক তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
ধারা নম্বর ৮৬: অতিরিক্ত ওজন নিয়ে মোটরযান চালানো
ধারা ৪৩ অনুযায়ী, কোন মোটরযান চালক বা কোনো ব্যক্তি সড়ক বা মহাসড়কে অনুমোদিত লেডেন ওজন, ট্রেইন ওজন বা এক্সেল ওজন এর অতিরিক্ত ওজন নিয়ে মোটরযান চালাতে পারবেন না। রেজিস্টেশন সনদে উল্লেখিত ওজন বৃদ্ধিও করতে পারবেন না।
ওই ধারা লঙ্ঘন করা হলে অপরাধ হবে, সেজন্য অনধিক এক বছরের কারাদণ্ড, অনধিক এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। চালকের ক্ষেত্রে দোষসূচক দুই পয়েন্ট কাটা যাবে।
ধারা নম্বর ৯০: মোটরযান পার্কিং, যাত্রী বা পণ্য ওঠানামার নির্ধারিত স্থান ব্যবহার
এ সংক্রান্ত ধারা ৪৭-এ বলা হয়েছে, সরকার বা স্থানীয় সরকার, ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান পুলিশের সাথে পরামর্শ করে মোটরযান পার্কিং এলাকা, থামানোর স্থান, যাত্রী ও পণ্য ওঠানামার স্থান ও সময় নির্ধারণ করে দিতে পারবে। নির্ধারিত সেসব স্থান ছাড়া পার্কিং করা বা যাত্রী ও পণ্য ওঠানামা করানো যাবে না বা মোটরযান থামানো যাবে না। কোন যাত্রীও এরকম অনুরোধ করতে পারবেন না।
কোন ব্যক্তি যদি এই বিধান অমান্য করেন, তাহলে অনধিক পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা হবে এবং চালকের অতিরিক্ত দোষসূচক হিসাবে এক পয়েন্ট কাটা যাবে।
ধারা নম্বর ৯৮: ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীন মোটরযান চালানোর ফলে দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি
যদি নির্ধারিত গতিসীমার অতিরিক্ত গতিতে বা বেপরোয়াভাবে, ওভারটেকিং বা ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীন মোটরযান চালানোর ফলে কোন দুর্ঘটনায় জীবন বা সম্পত্তির ক্ষতি হয়, তা হলে মোটরযানের চালক বা কন্টাক্টর বা সহায়তাকারী ব্যক্তির অনধিক তিন বছর কারাদণ্ড, অনধিক তিন লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। আদালত অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দিতে পারবেন।
ধারা নম্বর ১০৫: দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অপরাধ
এই আইনে যাই বলা হোক না কেন, মোটরযান চালানোর ফলে কোন দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোন ব্যক্তি আহত হলে বা তার প্রাণহানি ঘটলে, এরকম অপরাধ পেনাল কোড ১৮৬০ এর অধীনে অপরাধ বলে গণ্য হবে। এছাড়া কোন ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালানোর কারণে কেউ গুরুতর আহত বা মৃত্যু হলে, উক্ত ব্যক্তির অনধিক পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
কেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আপত্তি
আইনের এই ধারাগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক রুস্তম আলী খান বিবিসিকে বলেছেন, "আইন তো মেনে চলতেই হবে। কিন্তু আমাদের ওপর যে আইন দেয়া হইছে, কিছু কিছু ধারায় এমন জরিমানা ধার্য করছে যে সেটা গাড়ি চালাইয়া দেয়া সম্ভব না, জায়গা (জমি) বেইচা দেয়া লাগে এমন অবস্থা।"
তিনি বলছেন, এসব গাড়ি অনেকদিন ধরে চলছে। নতুন আইন অনুযায়ী ঠিকঠাক করতে সময় লাগবে। এছাড়া অনেক ড্রাইভারের এখনো যথাযথ লাইসেন্স করা হয়নি, যার পেছনে কর্তৃপক্ষের দীর্ঘসূত্রিতাকেও তিনি দায়ী করছেন।
তাই তারা আইনের এসব ধারা পরিবর্তনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান বলেছেন, পরিবহন নেতা ও শ্রমিকরা নতুন আইনের বিরোধিতা করছেন না, তবে নতুন আইনে কিছু বিষয়ে অসংগতি রয়েছে। সেগুলো সংশোধনের জন্য শ্রমিকরা আন্দোলনে গিয়েছিলেন। সেগুলোই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আইনে উল্লেখ করা কারাদণ্ডের ব্যাপারে আমাদের আপত্তি নেই, তবে যে পরিমাণ জরিমানা ধরা হয়েছে, তা চালকরা কখনো দিতে পারবে না। তাই আমরা আগের আইনের অনুযায়ী জরিমানা বর্তমান টাকার অনুপাতে যা দাড়ায়, সেটা নির্ধারণ করার দাবি জানিয়েছি।
এই নেতারা জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের তারা ৩০শে জুন ২০২০ সাল পর্যন্ত সময় দিয়েছেন, সে পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। তখনো যদি তাদের দাবি মানা না হয়, তাহলে তারা আন্দোলনে যাবেন।
যা বলছেন নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকারীরা
নিরাপদ সড়ক নিয়ে কয়েক দশক ধরে আন্দোলন করে আসছেন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন।
শ্রমিকদের এসব দাবি দাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, আইনের কোন বিষয় নিয়ে ছাড় দেয়া ঠিক হবেনা।
"এবার যদি আমরা হেরে যাই, তাহলে হেরে যাবে পুরো বাংলাদেশ," বিবিসির সাথে এক সাক্ষাতকারে বলছিলেন মি: কাঞ্চন।