কাঠগড়ায় ভারতীয় শিল্পী সুবোধ গুপ্তা : ইনস্টা-র আড়াল থেকে যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগ কি বৈধ?

শিল্পী সুবোধ গুপ্তা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শিল্পী সুবোধ গুপ্তা
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি

ভারতে একজন নামী শিল্পীর বিরুদ্ধে একটি অজ্ঞাতপরিচয় ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগ আসার পর ফেসবুক কর্তৃপক্ষ আদালতে ওই অ্যাকাউন্টধারীর পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছে।

ফেসবুক দিল্লি হাইকোর্টকে জানিয়েছে, শিল্পী সুবোধ গুপ্তার বিরুদ্ধে যে ইনস্টা অ্যাকাউন্ট থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে সেটির পরিচয় ফাঁস হলে অভিযোগকারীর 'গোপনীয়তার অধিকার' ক্ষুণ্ণ হবে।

পাশাপাশি তারা আরও বলছে, এতে যৌন নিগ্রহের যারা ভিক্টিম তাদের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

ভারতে 'মি টু' ক্যাম্পেনের সঙ্গে জড়িত অ্যাক্টিভিস্টরা ফেসবুকের এই অবস্থানকে জোরালো সমর্থন জানাচ্ছেন।

কিন্তু ভারতের আইনি বিশেষজ্ঞরা অনেকেই আবার বলছেন, এ দেশের আইনে পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানানোর কোনও সুযোগ নেই।

যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগ জানাতে ভারতে অনেক নারীই এখন ব্যবহার করছেন ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগ জানাতে ভারতে অনেক নারীই এখন ব্যবহার করছেন ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম

ভারতের অগ্রগণ্য শিল্পী ও ভাস্কর সুবোধ গুপ্তার বিরুদ্ধে লাগাতার যৌন লাঞ্ছনার অভিযোগ ওঠে গত বছরের ডিসেম্বরে, যখন মি টু আন্দোলন তুঙ্গে।

'হার্ডসিনঅ্যান্ড' নামে একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ওই অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশিত হয়, যার জেরে মি গুপ্তাকে গোয়ার একটি আর্ট ফেস্টিভ্যালের কিউরেটরের পদ থেকে সরেও দাঁড়াতে হয়।

কিন্তু পরে যখন তিনি আদালতে যান, তখন গত সেপ্টেম্বরে দিল্লি হাইকোর্ট ইনস্টাগ্রামের মালিক সংস্থা ফেসবুককে নির্দেশ দেয় একটি বন্ধ খামে করে তাদের জানাতে হবে ওই হার্ডসিনঅ্যান্ড অ্যাকাউন্টের আড়ালে কে বা কারা আছেন।

কিন্তু ফেসবুক এই নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেছে - কোর্টকে তারা জানিয়ে দিয়েছে "নিজের পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানানোটা সারা বিশ্বেই মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত"।

Skip Instagram post
Instagram কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Instagramএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Instagram কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of Instagram post

ভারতে হাফিংটন পোস্টের সাবেক সম্পাদক ও মিটু ক্যাম্পেনের অগ্রণী মুখ ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জিও বিবিসিকে বলছিলেন, ভারতে যৌন নিগ্রহের ভিক্টিমদের নিজের নাম প্রকাশ করার ক্ষেত্রে অনেক বাস্তব অসুবিধে আছে।

তার কথায়, "মি-টু কেসগুলোতেও আমরা দেখেছি এই যে ভারতে একটা বিরাট সংখ্যক ভিক্টিম নিজের নাম প্রকাশ করে অভিযোগ জানাতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না, তার কিন্তু একটা সঙ্গত কারণ আছে।

"এতে কখনও কখনও তাদের জীবন পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়ে। তারা ভিক্টিম ব্লেমিং বা ভিক্টিম শেমিং-য়ের টার্গেটে পরিণত হন।"

ফলে মিস চ্যাটার্জির মতে, "সমাজের ভাবনাচিন্তা যতদিন না-বদলাচ্ছে, ততদিন যৌন নিগ্রহের অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে এলে সমাজে সেই নারীরই একঘরে হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।"

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

মি টু ক্যাম্পেনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জি

ছবির উৎস, ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জি/টুইটার

ছবির ক্যাপশান, মি টু ক্যাম্পেনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জি

তবে সেই অভিযোগ যদি আদালতে গড়ায়, তাহলে অজ্ঞাতপরিচয় সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের আড়ালে অভিযোগকারিণীর লুকিয়ে থাকার কোনও সুযোগ নেই - বলছেন দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী বিজন ঘোষ।

বিবিসিকে মি. ঘোষ বলছিলেন, "নিজের পরিচয় গোপন রেখে আসলে কোনও অভিযোগই আনা যায় না। ভোটের সময় দেওয়াল লিখে রাজনৈতিক অভিযোগ হয়তো আনা যায়, কিন্তু বাকি কোথাও এটা সম্ভব নয়।"

"কারণ এই অভিযোগটা তো ব্যক্তিগত, তাই না? আইনের চোখে তাই পরিচয় গোপন রাখাটা গ্রাহ্য নয়।"

"এর পরিণতি যেটা হবে, তা হল - যখন ওই অভিযোগকারীর নাম-পরিচয় প্রকাশ পাবে তখন কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি সরাসরি তার বিরুদ্ধেই মামলা করতে পারবেন।"

"আইন এখানে খুব পরিষ্কার। আমি যদি আপনাকে হেনস্থা করে থাকি, তাহলে আপনাকে বলতে হবে কোথায়, কখন, কীভাবে ও কাকে আমি হেনস্থা করেছি!"

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে দিল্লিতে নারী সাংবাদিকদের প্রতিবাদ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে দিল্লিতে নারী সাংবাদিকদের প্রতিবাদ

"তা যদি না-বলা হয়, তাহলে এরকম 'উড়ো খই গোবিন্দায় নমো' করে আদালতে কিছু হয় না", বলছিলেন বিজন ঘোষ।

তবে ইদানীং ভারতে এই 'হার্ডসিনঅ্যান্ড' নামক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বহু মহিলাই বিভিন্ন প্রথিতযশা শিল্পীর কথিত যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন।

ফেসবুক যুক্তি দিচ্ছে, এখন যদি কোর্টের নির্দেশে সেই অ্যাকাউন্টধারীর মুখোশ খুলে দিতে হয় - তাহলে "ভিক্টিমরাই শুধু ভয় পেয়ে যাবেন না, এই সব অন্যায়ের প্রতিকার চাইতেও কেউ সাহস পাবে না"।

মি টু ক্যাম্পেনে বহু নারীর অভিযোগ যিনি সংকলন করেছেন, সেই ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জিও বলছিলেন, ভারতে থানায় গেলে বিচার মেলার ভরসা নেই বলেই কিন্তু ভিক্টিমরা এভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার আশ্রয় নিচ্ছেন।

ভারতে গত বছর মি টু আন্দোলনের সূচনা হয় সাবেক বলিউড অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্তর অভিযোগকে ঘিরে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতে গত বছর মি টু আন্দোলনের সূচনা হয় সাবেক বলিউড অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্তর অভিযোগকে ঘিরে

তার কথায়, "ভারতে নিজের নাম প্রকাশ করে অভিযোগ জানানোর অর্থ হল পুলিশ থানায় গিয়ে এটা বলা যে আমার সঙ্গে এ জিনিস হয়েছে।"

"কিন্তু অনেকের পক্ষেই সেটা করে ওঠা সম্ভব হয় না।

"কারণ এদেশের বাস্তবতা হল নারীদের এসব ক্ষেত্রে শুধু যৌন সহিংসতা নয় - লড়তে হচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক একটা সমাজের বিরুদ্ধেও, সমাজের মানসিকতার বিরুদ্ধেও।"

"এবং যে ধরনের একটা ইনস্টিটিউশনাল সাপোর্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন এখানে ভিক্টিমদের পাওয়ার কথা, ভারতে সেটা প্রায় নেই বললেই চলে!"

শিল্পী সুবোধ গুপ্তা। প্যারিসের একটি প্রদর্শনীতে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শিল্পী সুবোধ গুপ্তা। প্যারিসের একটি প্রদর্শনীতে

তবে ভারতের আদালতেও ধর্ষিতার পরিচয় গোপন রাখার বিধান আছে।

কিন্তু বিজন ঘোষ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই সুবোধ গুপ্তা মামলার সঙ্গে ওই ধরনের ঘটনায় একটা মৌলিক পার্থক্য আছে।

তিনি বলছিলেন, "শুধু ধর্ষণের মামলায় আদালত বলে দিয়েছে, যখন মামলা চলবে তখন ভিক্টিমের পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না।"

"কিন্তু সেটা কোথায়? শুনানির সময় সেই নাম আসবে না। কিন্তু এফআইআরে তো নাম থাকতেই হবে, তা না-হলে তো সেই মামলা দাঁড়াবেই না।"

মি টু-তে অভিযুক্ত হয়েছিলেন ভারতের আরেক বিখ্যাত শিল্পী যতীন দাশ

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মি টু-তে অভিযুক্ত হয়েছিলেন ভারতের আরেক বিখ্যাত শিল্পী যতীন দাশ

"অর্থাৎ কিনা, এখানেও ভিক্টিমের নাম 'রেকর্ড' করতেই হবে, কিন্তু সেটা জনসমক্ষে আসবে না বা মিডিয়া 'রিপোর্ট' করতে পারবে না", বলছিলেন সুপ্রিম কোর্টের ওই প্রবীণ আইনজীবী।

অন্যভাবে বললে, অভিযোগকারী কে, সেটা স্পষ্টভাবে জানা না গেলে ভারতের আদালত কোনও অভিযোগ গ্রহণই করতে পারে না বলে তিনি জানাচ্ছেন।

তবে ভারতের আইন যা-ই বলুক, শিল্পী সুবোধ গুপ্তার মামলায় ফেসবুক কর্তৃপক্ষ যে একটা 'স্ট্যান্ড' নিয়েছে তা বোঝাই যাচ্ছে।

এদেশের অ্যাক্টিভিস্টদের এখন আশা, যাবতীয় চাপের মুখেও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম সেই অবস্থানে অনড় থাকবে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন: