রাখী সাওয়ান্তকে তনুশ্রীর 'ধর্ষণ', কোন পথে ভারতের 'মি টু' আন্দোলন?

ছবির উৎস, SUJIT JAISWAL
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
ভারতে সম্প্রতি 'মি টু' আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে বলিউডের যে সাবেক অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্তর তোলা অভিযোগকে কেন্দ্র করে - তাকে এখন সোজাসুজি 'সমকামী' ও 'ধর্ষণকারী' বলে আক্রমণ করা হচ্ছে।
বলিউডের আর এক অভিনেত্রী রাখী সাওয়ান্ত দিনকয়েক আগে মুম্বাইতে রীতিমতো সাংবাদিক বৈঠক ডেকে ঘোষণা করেছেন, 'লেসবিয়ান' তনুশ্রী দত্ত না কি বছর বারো আগে তাকে বেশ কয়েকবার ধর্ষণ করেছিলেন।
তনুশ্রী দত্তকে শুধু সমকামীই নয়, মাদকাসক্ত বলেও বর্ণনা করেছেন রাখী। দাবি করেছেন, সে সময়কার 'ঘনিষ্ঠ বন্ধু' তনুশ্রী না কি তাকে বিভিন্ন রেভ পার্টিতে নিয়ে যেতেন ও জোর করে ড্রাগ নিতে বাধ্য করতেন।
এই সব অভিযোগের জবাবে তনুশ্রীও এখন পাল্টা মুখ খুলে বলছেন, 'রাখী সাওয়ান্ত এমন একজন বুদ্ধু যে যৌনতা আর পয়সা ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না!' রাখীর সঙ্গে কোনও দিন তার বন্ধুত্ব ছিল না বলেও জানিয়েছেন তনুশ্রী।
এই অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের মধ্যে দিয়ে ভারতের 'মি টু' আন্দোলনের জোয়ারকে প্রশমিত করার, বা এই আন্দোলনকে খেলো করে দেখানোর একটা চেষ্টা আছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

ছবির উৎস, SOPA Images
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং-ও এ সপ্তাহে একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা দিতে গিয়ে যেভাবে 'মি টু' আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনেছেন, সেটাকেও দেশের নারী অ্যাক্টিভিস্টরা ভাল চোখে দেখেননি।
দেশের শীর্ষ আইনজীবীরাও অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, 'মি টু' আন্দোলনের রেশ ধরে সোশ্যাল মিডিয়াতে একের পর এক যে সব অভিযোগ আসছে তার বেশির ভাগই আদালতে প্রমাণ করা খুব কঠিন, হয়তো অসম্ভব।
এই বিতর্কের মধ্যে রাখী সাওয়ান্তের অভিযোগ নিয়েই বোধহয় এখন সব চেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে - কারণ তিনি আঙুল তুলেছেন এমন একজনের বিরুদ্ধে, যার হাত ধরে ভারতে 'মি টু' কয়েক সপ্তাহ আগে কার্যত পুনর্জন্ম পেয়েছে।
বলিউডের 'ব্যাড গার্ল' বলে পরিচিত রাখী দাবি করেছেন, তনুশ্রী দত্ত নিজে এখন যৌন লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করলেও তার নিজের রেকর্ডও মোটেও সুবিধের নয়।
"ভেতরে ভেতরে তনুশ্রী দত্ত একজন পুরুষ - আর তার হাতে আমাকে বহুবার ধর্ষিতা হতে হয়েছিল" সাংবাদিক সম্মেলনে সরাসরি এই অভিযোগই করেছেন রাখী।

ছবির উৎস, ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জি / টুইটার
তবে রাখী যেভাবে ও যে ভঙ্গীতে এই অভিযোগ তুলেছেন, তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই।
ভারতে 'দ্য হাফিংটন পোস্টে'র সাবেক সহ-সম্পাদক ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জি 'মি টু' আন্দোলনে মুখ খোলা বহু নারীর অভিযোগ সংকলন করছেন, তাদের বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়াতে তুলে ধরার কাজ করছেন।
মিস চ্যাটার্জি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "রাখী সাওয়ান্তও একজন নারী - তার তোলা অভিযোগ নিয়েও আমাদের একই ধরনের সহানুভূতি ও সংবেদনশীলতা দেখানো উচিত।"
"কিন্তু যেভাবে সাংবাদিক সম্মেলনে ভঙ্গীতে হাসতে হাসতে, যেন কোনও মজার কথা বলছেন এভাবে তিনি অভিযোগগুলো পেশ করেছেন তাতে আমি অন্তত বেশ অবাক হয়েছি।"
"আর মনে রাখতে হবে, তিনি কিন্তু তনুশ্রী দত্তর বিরুদ্ধে খুব মারাত্মক অভিযোগ করেছেন - সেটা বার বার ধর্ষণ করার। এই অভিযোগ নিয়ে তখন না-হোক, এখন তার অবশ্যই পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া উচিত ছিল!"

ছবির উৎস, Hindustan Times
এদিকে রাখী সাওয়ান্তের অভিযোগের জবাব দিতে তনুশ্রী দত্ত এখন নিজেই এগিয়ে এসেছেন। দাবি করেছেন, ২০০৯ সালে একটি এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে দেখা হওয়া ছাড়া রাখী সাওয়ান্তের সঙ্গে তার কোনওদিন কোনও মোলাকাতই হয়নি।
"আমার বাবা-মা আমাকে সব সময় খুব সাবধানে বন্ধু বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিতেন, তাদের সেই কথা আমি আজও মেনে চলি।"
"ফলে যখন রাখী সাওয়ান্তের মতো আনকুথ, আনএডুকেটেড, ডার্টি, ডাউনমার্কেট, ক্লাসলেস, ক্যারেক্টারলেস, পার্ভার্টেড, ডিগ্রেডেড অ্যাবোমিনেশনস আমার বন্ধু হওয়ার দাবি করে, সেটা অত্যন্ত বিরক্তিকর।"
তনুশ্রী আরও দাবি করেছেন তিনি নিজের মাথা কামিয়েছিলেন বলেই তাকে 'সমকামী' বলার চেষ্টা করা হয়েছে।
"অথচ হিন্দু ও বৌদ্ধ দুই ধর্মেই দীক্ষা নেওয়ার সময় মাথা কামানোর রীতি আছে, সুতরাং রাখী আমাকে সমকামী বলে ধর্মকেও অপমান করেছেন!"

ছবির উৎস, Hindustan Times
তনুশ্রী দত্তকে এই বিবৃতি দিয়ে যেভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনে এগিয়ে আসতে হয়েছে, সেটাকেই অনেকে 'মি টু' আন্দোলনের জন্য একটা ভুল বার্তা হিসেবে দেখছেন।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং দিনদুয়েক আগে একটি জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছেন, "বিরোধী দলগুলো যদি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে তাহলে তাদের সঙ্গেও নির্ঘাত বেইমানি করা হবে - তখন তাদেরও কিন্তু 'মি টু' আন্দোলনের মতো নালিশ করে বলতে হবে আমাদের সঙ্গে কংগ্রেস অন্যায় করেছে।"
'মি টু' আন্দোলনকে নিয়ে স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই রাজনৈতিক মশকরা অনেকেই ভালভাবে নেননি।
অথচ দেশে কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন শোষণের প্রতিকার কোন পথে হতে পারে, তা নির্ধারণের জন্য যে মন্ত্রিগোষ্ঠী কাজ করছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং নিজেই তার প্রধান।
সাংবাদিক সুতপা পাল, যিনি সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো নারী সাংবাদিকদের অন্যতম, তিনি রাজনাথ সিংয়ের ওই মন্তব্যকে 'চরম হতাশাজনক' বলে বর্ণনা করেছেন।

ছবির উৎস, Hindustan Times
ভারতে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী বিজন ঘোষও বিবিসিকে বলছেন, 'মি টু'-র রেশ ধরে ভারতে যে সব অভিযোগ আসছে আইনের চোখে তার প্রায় সবগুলোই 'তামাদি' বলে তিনি মনে করেন।
"আমি মনে করি ভারতে 'মি টু' একটা নেতিবাচক আন্দোলনের চেহারা নিয়েছে। আর বেশির ভাগই এত পুরনো ঘটনার কথা বলা হচ্ছে যেগুলো আদালতে কিছুই দাঁড় করানো যাবে না", বলছেন তিনি।
এই পটভূমিতেও কিন্তু ভারতে 'মি টু' আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাশ হতে রাজি নন ঋতুপর্ণা চ্যাটার্জির মতো অ্যাক্টিভিস্টরা।
"একজন রাখী সাওয়ান্ত বা একজন রাজনাথ সিং কী বলছেন তাতে 'মি টু' আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।"
"বরং আমি এটা দেখেই আশাবাদী হতে চাই যে গত কালও 'মি টু'-তে অভিযুক্ত প্রভাবশালী অ্যাড গুরু সুহেইল শেঠের সঙ্গে টাটা সনস তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, চুক্তি বাতিল করেছে কোকা কোলাও", বিবিসিকে বলছিলেন মিস চ্যাটার্জি।

ছবির উৎস, Hindustan Times
ভারতে 'মি টু' নিয়ে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই আগামিকাল বুধবার ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও এক কালের ডাকসাইটে সম্পাদক এম জে আকবর তার 'মি টু' মানহানির মামলায় সুপ্রিম কোর্টে নিজের বক্তব্য পেশ করবেন।
একের পর এক নারী সাংবাদিক তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনার পর মি আকবর দিনকয়েক আগে মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।
তবে তার আগে তিনি প্রথম অভিযোগকারিণী, সাংবাদিক প্রিয়া রামানির বিরুদ্ধে মানহানির মামলাও ঠুকে দেন - যে মামলায় শতাধিক আইনজীবী মি আকবরের হয়ে লড়ছেন।
ভারতে 'মি টু' আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে গড়ায়, তা অনেকটাই এই মামলার ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।








