আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
'আমার সৎ বাবা দুটি মেয়েকে হত্যা করেছে-এখন আমি অন্য খুনের ঘটনা খুঁজে বেড়াই'
শেরেলে মুডির কাছে সহিংসতা নতুন কিছু নয়। অবসর সময় অস্ট্রেলিয়ায় নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করা নারী আর শিশুদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা ছাড়াও এ বিষয়ে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
খুব কম বয়স থেকেই, নিজের মায়ের কাছে বছরের পর বছর ধরে সহিংস নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। যতবারই তার মা তাকে আঘাত করতো, ততবারই পালিয়ে যেতে চাইতো সে- অন্তত সমাজকল্যাণ বিষয়ক কর্তৃপক্ষ তাকে ফিরিয়ে আনার আগ পর্যন্ত এমনটাই হয়েছে।
কিন্তু যে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা তার জীবন পাল্টে দিয়ে নতুন মোড় নিতে সহায়তা করেছিল সেটি তার সাথে নয় বরং একটি ছোট মেয়ের সাথে ঘটেছিল। যার সাথে কখনোই দেখা হয়নি তার।
১৯৯০ সালে মিস মুডির সৎ বাবা নয় বছর বয়সী স্টেসি অ্যান ট্রেসি নামে এক মেয়েকে অপহরণ এবং ধর্ষণের পর হত্যা করে। তারপর তার মরদেহ আবর্জনার ব্যাগে ভরে একটি নালায় ফেলে দেয়।
'পেটের ভেতর অদ্ভুত অনুভূতি'
কুইন্সল্যান্ডে ব্যারি হ্যাডলো যখন স্টেসি-অ্যানকে হত্যা করে তখন মিস মুডির বয়স ছিলো ১৮ বছর। আর তাই ওই হত্যাকাণ্ডের পর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বেশ ভালো ভাবেই মনে করতে পারেন তিনি।
সেসময় কিশোরী মুডি সবে মাত্র তার মায়ের বাড়িয়ে ফিরেছিল। কারণ তার ছোট বোন ক্যারেন খুব খারাপ সময় পার করছিল। "আমি আমার চাকরী ছেড়ে সোজা বাড়িতে চলে আসি যাতে করে সে ভাল থাকে," তিনি বলেন।
আরো পড়তে পারেন:
তার সৎ বাবা তাকে আনতে যায়। গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সে বর্ণনা করতে থাকে যে কিভাবে তাদের এলাকার একটি ছোট মেয়ে নিখোঁজ হয়েছে।
"পরের দিন তল্লাসি অভিযানে যোগ দিতে পেরে তাকে বেশ উচ্ছ্বসিতই মনে হচ্ছিলো," তিনি বলেন।
"আমার মনে পরে যে, রাজ্যের জরুরী সেবা বিভাগের স্বেচ্ছাসেবী কর্মীর পোশাক পড়ে তল্লাসি অভিযানে বেরিয়ে পরে সে।"
এর পরে তিনি যা মনে করতে পারেন তা হল, দরজায় বেশ কয়েক বার জোরে জোরে আঘাত আর তাদের বাড়িতে তল্লাসি চালাতে আসা পুলিশ বাহিনী। যা তাকে "হতবিহবল" করেছিল।
নিজের সৎ বাবার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পক্ষের হয়ে সাক্ষ্য দেন তিনি। তার মা, লিওনি, হ্যাডলো'র পক্ষে সমর্থন দেন- যাকে তিনি মিস মুডির ১৫ বছর বয়সের সময় বিয়ে করেছিলেন।
"আদালতে তার সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল মা। যা দেখতে মোটেই ভাল লাগেনি আমার," মিস মুডি বলেন।
মিস মুডি স্টেসি-অ্যানের শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছিলেন। "আমি এখনো সেই ভয়ংকর অনুভূতির কথা মনে করতে পারি। আমার পেটের ভেতর অদ্ভুত ধরণের অনুভূতি হচ্ছিলো এটা জেনে যে আমার সৎ বাবা এই ঘটনা ঘটিয়েছে এবং আমার মা তাকে সমর্থন দিচ্ছে," তিনি বলেন।
আরেকটি আঘাত আসা তখনও বাকি ছিল: আর তা হল, তার সৎ বাবার এটিই প্রথম খুন ছিল না।
পুলিশ মিস মুডিকে জানায় যে, ২৭ বছর আগে, সে ৫ বছর বয়সে স্যান্ড্রা বেকন নামে আরেকটি শিশুকে অপহরণ ও হত্যা করেছিল। তার মরদেহ ভুট্টার বস্তায় জড়িয়ে একটি গাড়ির বুটের ভেতর রাখা হয়েছিল।
প্রতিবারই হ্যাডলো তার হাতে নিহতদের বাড়ির আশপাশেই বাস করতো। আর স্টেসি-অ্যানকে হত্যার সময় প্যারোলে মুক্ত ছিল সে।
"সমাজব্যবস্থা তাকে এই ঘটনা ঘটানোর সুযোগ করে দিয়েছিল যা উচিত হয়নি," মিস মুডি বলেন।
মিস মুডির মা কখনোই হ্যাডলোর প্রতি তার সমর্থন প্রত্যাখ্যান করেননি। কার এই বিষয়টিই মা-মেয়ের সম্পর্ক ভেঙ্গে দিয়েছিল: "আমার মনে হতো যে সে আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। সে বাড়িতে একজন খুনিকে জায়গা দিয়েছে যে এমন একজন মেয়েকে অপহরণ করেছে যে আমার যমজ দুই বোনের বয়সী।"
মিস মুডির বয়স এখন ৪৮ বছর। কিন্তু ২১ বছর বয়স থেকে নিজের মায়ের সাথে আর দেখা করেননি তিনি। ২০০৭ সালে কারাগারে মারা যায় হ্যাডলো।
অপরাধ বোধ থেকে ক্রোধ
মিস মুডি জানান, হ্যাডলোর গ্রেফতারের পর থেকে 'জীবনের খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি" এবং কখনোই 'ভালো জীবন যাপন করতে পারেননি তিনি।' কিন্তু পড়াশুনা শেষ করে সাংবাদিক হওয়ার পর আবারো বাঁচার আশা খুঁজে পান তিনি।
"প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর আমার পুরো জীবন, আমার বাবার হাতে স্টেসি-অ্যানের হত্যার অপরাধ-বোধে ভুগেছি আমি," তিনি বলেন।
"এমন কোন দিন পার করিনি যেদিন আমি তাকে নিয়ে ভাবিনি।"
সম্প্রতি বছরগুলোতে তার অপরাধ বোধ ক্রোধে পরিণত হয়েছে। তিনি জানেন যে এ অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে, অবসর সময়ে কিছু একটা করতে হবে তাকে।
আর এ চিন্তা থেকেই উৎপত্তি হয় অস্ট্রেলিয়ায় লিঙ্গের কারণে হত্যার শিকার নারী বা ফেমিসাইড এবং শিশু মৃত্যুর মানচিত্র।
গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে, মিস মুডি ১৮০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় সহিংসতায় মৃত্যু হওয়া নারী ও শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করে চিত্রায়িত করছেন।
এসব নারী আর শিশুদের স্মরণীয় করতে সাংবাদিক হিসেবে নিজের দক্ষতা ব্যবহার করেছেন তিনি। যার কারণে এই তথ্যগুলো শুধুমাত্র পরিসংখ্যান হয়ে থাকেনি।
"আমার ভাবতে খারাপ লাগে যে, স্টেসি-অ্যানের পরিবারের সদস্যরা এবং আমি তাকে ভুলে যাওয়ার পর তার মৃত্যুর ঘটনা আর কেউ মনে রাখবে না," তিনি বলেন।
"প্রতিটি দেশ তাদের সেনাদের মৃত্যুকে স্মরণীয় করে রাখে। কিন্তু সহিংসতায় যারা মারা যায় তাদের কথা মনেও রাখে না। আমাদের সম্প্রদায়ে সহিংসতার প্রকৃত বিস্তার, প্রভাব এবং লৈঙ্গিক প্রকৃতি সম্পর্কে দলিল বা নথিভুক্ত করতে চাই আমি।"
বাস্তবতা হচ্ছে, আপনি পুরুষ, নারী কিংবা শিশু-যাই হোন না কেন, একজন পুরুষের হাতে খুন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে আপনার।
"পরিবর্তন আনতে আমরা তাদের গল্পগুলো ব্যবহার করতে পারি, বিশেষ করে পুরুষ সহিংসতার গল্প- নারীদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে পারি যা তাদেরকে এ ধরণের অপরাধ করতে চালিত করে।"
অস্ট্রেলিয়ার ইন্সটিটিউট অব ক্রিমিনোলজির হালনাগাদ পরিসংখ্যান মতে, গড়ে প্রতি সপ্তাহে দেশটিতে একজন নারী তার বর্তমান কিংবা সাবেক সঙ্গীর হাতে প্রাণ হারায়।
ম্যাপে প্রতিটি হৃদয় চিহ্নে ক্লিক করলে সহিংসতায় হত্যার একেকটি কাহিনী পাওয়া যাবে।
সত্য এসব ঘটনা মিস মুডি পুরনো সংবাদপত্র, ময়না তদন্তের প্রতিবেদন এবং আপিলের রায় নিয়ে গবেষণা করে বের করেছেন।
এসব কাহিনীতে অবহেলা, পারিবারিক সহিংসতা এবং অচেনা মানুষের দ্বারা সহিংসতার তথ্য পাওয়া যায়।
এসব ঘটনার সাথে জড়িতদের কি হয়েছে সেসব তথ্যও এতে উল্লেখ করেছেন মিস মুডি। যেখানে দরকার সেখানে স্বজন হারা পরিবারের সদস্যদের পক্ষে আওয়াজও তুলেছেন তিনি।
এই নথিতে প্রথম যে মৃত্যুর ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি তার সৎ বাবার হাতে নিহত স্টেসি-অ্যানের খুনের ঘটনা।
এর পর থেকে ১৮৮০টি সহিংস মৃত্যুর ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি। প্রতিটি ঘটনায় গড়ে এক ঘণ্টা করে সময় দিয়েছেন তিনি। যা একান্তই তার ব্যক্তিগত সময়।
সহিংস ঘটনায় জড়িত অনেকের নাম মাত্র সাজা হয়েছে।
মিস মুডি বলেন: "বেশিরভাগ সাজাই নাম মাত্র। আমি মাত্রই এক নারীর হত্যার বিষয় নথিভুক্ত করেছি যাকে এক জন পুরুষ ৪০ বার ছুরি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেছে। কিন্তু ওই হত্যাকারী ছয় মাসের মাথায়ই ছাড়া পেয়েছে। সে তার নিজের জীবন উপভোগ করছে। আর ওই নারীটি একটি হৃদয় চিহ্ন হয়ে আমার ফেমিসাইড ম্যাপে জায়গা করে নিয়েছে মাত্র।"
একটি নতুন সূচনা
প্রাপ্ত বয়স্ক একজন মানুষ হিসেবে মিস মুডি তার ফাইল সমাজকল্যাণ কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করেছে। যা ছিলো নির্যাতন, অবহেলা আর সহিংসতার গল্পে ভর্তি। তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা প্রতিটি ঘটনার সাথে তাকে গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলে: "আমি এই নারীদের প্রত্যেককেই আমার হৃদয়ে ধারণ করেছি।"
২০১৫ সালে মিস মুডির শুরু করা রেড হার্ট ক্যাম্পেইনের অংশ হচ্ছে ফেমিসাইড ম্যাপ। সেসময় ক্রমেই বেড়ে চলা পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদন করছিলেন তিনি।
ক্যাম্পেইনটি শুরু হয়েছিল গল্প-বলার একটি ভিত্তি বা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। তবে পরে এটি নারী ও শিশুদের উপর সহিংস ঘটনার রেকর্ডিং প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
এটি ১২ মাসেরও কম সময়ে ৫ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়েছে।
তবে সবাই ভাল প্রতিক্রিয়া দেখায়নি; মিস মুডি নিয়মিতভাবেই খুন এবং ধর্ষণের হুমকি পান। এটা শুধু অনলাইনে ট্রলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেপ্টেম্বরে, তার ঘোড়াটিকে মেরে ফেলা হয়। ঘোড়াটির ঘাড় ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল। এর আগে তার কুকুরকে ভয়ংকর ভাবে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়।
দুটি ঘটনাই তদন্ত করছে পুলিশ। এগুলোর সাথে প্রতিবেশী চার পুরুষ বাসিন্দার দেয়া হুমকির কোন যোগসূত্র আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
"এই পুরুষরা ম্যাপটি সরিয়ে ফেলতে চায়। কারণ এটি লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতার মাত্রা কতটা ভয়াবহ তা দেখায়," তিনি বলেন।
ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসে জুন মাসে যখন মিস মুডি অস্ট্রেলিয়ায় সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ পুরষ্কার দ্য ওয়াকলেস'র জন্য তালিকাভুক্ত হন। গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে এই অসাধারণ কাজের জন্য তাকে নির্বাচিত করা হয়।
"এটা আসলে ধন্যবাদহীন একটা কাজ। তাই যখন স্বীকৃতি মেলে তখন এটা আসলেই অসাধারণ মনে হয়," তিনি বলেন।
পরিচয় গোপন রাখতে এই প্রতিবেদনের কিছু নাম পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে।