কলা, বালি, কক্ষপথের জায়গা এবং আরো তিনটি জিনিস বিশ্ব থেকে যে কারণে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images
ঘাটতি তৈরি হওয়া বা অভাব বোধ করা এমন একটি অনুভূতি, আমাদের যার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
আপনি হয়তো শুনেছেন যে, পানি, তেল বা মৌমাছির মতো নানা জিনিসের ঘাটতি ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীর আরো অনেক সম্পদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে অথবা ঠিকমতো ব্যবহার না হওয়ায় বিলুপ্ত হতে বসেছে। কিন্তু এগুলো আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে।
এখানে সেরকম ছয়টি বিষয়ের বর্ণনা করা হলো।
১. কক্ষপথে জায়গা কমে যাচ্ছে

২০১৯ সাল পর্যন্ত কক্ষপথে প্রায় পাঁচ লাখ বস্তু পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে।
এর মধ্যে মাত্র ২০০০ আসলে কার্যক্ষম-স্যাটেলাইট, যা আমরা যোগাযোগ, জিপিএস বা আমাদের প্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোর দেখার কাজে ব্যবহৃত হয়।
বাকি জিনিসগুলো রকেট নিক্ষেপণ এবং কক্ষপথে আগের নানা সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া আবর্জনা।
কিন্তু তাতে সমস্যা কোথায়?
আরো পড়ুন:
এই পাঁচ লাখ বস্তু এখন পর্যন্ত সনাক্ত করা হয়েছে-সেই সঙ্গে প্রতিদিনই কক্ষপথে নতুন নতুন জিনিস নিক্ষেপ করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, কক্ষপথে কোন কিছু পাঠানো ততই সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু কক্ষপথে কোন ট্রাফিক কন্ট্রোলের ব্যবস্থা নেই এবং কক্ষপথে থাকা এসব অপ্রয়োজনীয় এবং উচ্ছিষ্ট জিনিসপত্র পরিষ্কার করারও এখন পর্যন্ত কোন প্রযুক্তি নেই। ফলে এ ধরণের জিনিসে পৃথিবীর চারদিকের কক্ষপথ ক্রমেই ভরে যাচ্ছে।
এগুলোর সংখ্যা যত বাড়বে, কক্ষপথে ব্যস্ততা যত বেশি হবে, তখন এসব বস্তুর সঙ্গে আমাদের দরকারি উপগ্রহগুলোর, যা আমাদের কাজে, নকশায়, মোবাইল ফোনের যোগাযোগ, আবহাওয়া নজরদারি কাজ করে-সেগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়ে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়বে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত এই সমস্যার কোন সমাধান কারো কাছে নেই।
২. বালি

ছবির উৎস, Getty Images
আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, বালির ঘাটতি তৈরি হওয়া কিভাবে সম্ভব যেখানে আমাদের সৈকত আছে, মরুভূমি ভর্তি বালু আছে?
কিন্তু সত্যিটা হলো, বালি হচ্ছে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে বেশি তুলে নেয়া কঠিন পদার্থ- যার সঙ্গে নুড়িও থাকে। জাতিসংঘ বলছে, প্রাকৃতিকভাবে যে হারে বালু তৈরি হয়, আমরা তার চেয়ে অনেক বেশি হারে এর ব্যবহার করছি।
প্রাত্যহিক নির্মাণ, ভূমি পুনরুদ্ধার, পানি বিশুদ্ধিকরণ, এমনকি কাঁচ ও মোবাইল ফোন তৈরিতে বালি ব্যবহার করা হচ্ছে।
যেহেতু বালি কমে যাওয়ার ফলে ভঙ্গুর ইকো-সিস্টেমকে হুমকিতে ফেলছে, এ কারণে বিশ্বব্যাপী দাবি উঠেছে যে, এই নাজুক পদার্থটির অত্যধিক ব্যবহারের ব্যাপারে নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৩. হিলিয়াম

ছবির উৎস, Getty Images
উৎসব করার সময় যখন বাতাস ভর্তি বেলুন আকাশে ছেড়ে দেন, সেটা নিয়ে খানিকটা অনুশোচনা করার সময় সম্ভবত এসে গেছে।
হিলিয়াম গ্যাস সীমিত একটি সম্পদ, যা মাটির অনেক নীচ থেকে বের করে আনা হয়। আমাদের হাতে আর মাত্র কয়েক দশক সময় রয়েছে, যার মধ্যে এই গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে যাবে।
কোন কোন বিশেষজ্ঞ ধারণা করেন, এই গ্যাসের আর মাত্র ৩০ থেকে ৫০ বছরের মজুদ রয়েছে।
হয়তো মনে হতে পারে, এতে না হয় বাচ্চাদের অনুষ্ঠানের মজা খানিকটা কমে যাবে। কিন্তু এর ক্ষতি আরো বড়।
হিলিয়াম গ্যাস চিকিৎসায় খুব জরুরি একটি অনুসঙ্গ : এমআরআই করতে ব্যবহৃত চুম্বককে এই গ্যাস ঠাণ্ডা রাখে।
এমআরআই হচ্ছে এমন একটি যুগান্তকারী রোগ নির্ণয়কারী ব্যবস্থা, যা ক্যান্সার, মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের আঘাত নির্ণয় করতে পারে।
৪. কলা

ছবির উৎস, Getty Images
বাণিজ্যিক উদ্দেশে যে কলার চাষ করা হয়, তার বেশিরভাগই এখন 'পানামা ডিজিজ' নামের একটি ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হচ্ছে।
আমরা যে কলা খাই, তার বেশিরভাগ ক্যাভেন্ডিস জাতের, যা সরাসরি এসেছে একটি মাত্র গাছ থেকে-বাকিগুলো সব ক্লোন হয়ে এসেছে। ফলে কলা গাছের ভেতর পানামা রোগটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অতীতেও এরকমটা ঘটেছে। ১৯৫০ সালে ঠিক একই রকমের একটি রোগে বিশ্বের কলা চাষ বন্ধ হয়ে যায়। তখন চাষিরা গ্রস মাইকেল জাত থেকে সরে এসে ক্যাভেন্ডিস জাতের কলা চাষ করতে শুরু করেন।
বিজ্ঞানীরা এখন কলার নতুন জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন, যা এই ফাঙ্গাস প্রতিরোধ করতে পারবে, সেই সঙ্গে কলার স্বাদও বজায় থাকবে।
৫. মাটি

ছবির উৎস, Getty Images
যদিও আমাদের পৃথিবীর মাটি হঠাৎ করে পৃথিবী থেকে কোথাও পড়ে যাবে না, তবে অব্যবস্থাপনার কারণে এটি নিয়েও উদ্বেগের কারণ আছে।
মাটির সবচেয়ে উপরের অংশ থেকে গাছপালা বা উদ্ভিদ তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ সংগ্রহ করে।
ডব্লিউডব্লিউএফ নামের একটি এনজিও- যারা বিশ্বের প্রকৃতি রক্ষায় কাজ করে- ধারণা করছে যে, গত ১৫০ বছরে বিশ্বের মোট ভূমির অর্ধেকের মতো উপরের মাটি হারিয়ে গেছে। কিন্তু এক ইঞ্চি জমি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হতে পাঁচশো বছর লাগে।
নদী বা সাগরের ভাঙ্গন, ব্যাপক মাত্রায় কৃষিকাজ, বনভূমি উজাড় করা এবং বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলেই ওপরের মাটি হারিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়, যার ওপর বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের বড় অংশটি নির্ভর করে।
৬. ফসফরাস

ছবির উৎস, Getty Images
প্রথমে শোনার পর মনে হতে পারে যে, ফসফরাস কীভাবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে জরুরি হতে পারে?
কিন্তু মানব ডিএনএ গঠনের জন্য এটা শুধুমাত্র জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতেই যে গুরুত্বপূর্ণ তা নয়, বরং এটি কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত দরকারি একটি সার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যার কোন বিকল্প এখনো জানা নেই।
মাটি থেকে এসে উদ্ভিদ এবং পশু বর্জ্যের মাধ্যমে এটি আবার এটি মাটিতে ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখন ফসলের সঙ্গে সঙ্গে ফসফরাস শহর এলাকায় চলে আসছে এবং শেষপর্যন্ত সেটি আমাদের পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সাগরে গিয়ে মিশছে।
যেভাবে এখন চলছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে যে, আমাদের বর্তমান ফসফরাসের খনিগুলো আর ৩৫ থেকে ৪০০ বছর পর্যন্ত যোগান দিতে পারবে। তারপরে হয়তো আমাদের বেশি ক্ষুধার্ত বোধ করতে হবে।
বিবিসি রেডিও ফোর থেকে সংগৃহীত








