পরিবেশ-বান্ধব থেকেও আপনি হতে পারবেন স্টাইল আইকন: জেনে নিন ১০টি ফ্যাশন আইডিয়া।

ফ্যাশনেবল নারী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পরিবেশবান্ধব থেকেও ফ্যাশনেবল থাকা সম্ভব।

আপনি নতুন নতুন ফ্যাশনেবল জামাকাপড় কিনতে এবং পরতে পছন্দ করেন কিন্তু আপনি আবার পরিবেশ রক্ষার বিষয়েও সচেতন। এই দুটোর ভারসাম্য রাখতে গিয়ে কি একটু ঝামেলার মধ্যে পড়েছেন?

তবে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আপনি চাইলে পৃথিবীকে রক্ষায় কাজ করার পাশাপাশি নিজের পোশাকি রুচির সঙ্গে আপোষ ছাড়াই ফ্যাশনেবল থাকতে পারবেন। সাহায্য করতে পারবেন ফ্যাশন শিল্পের পরিবর্তনে ।

পৃথিবীর সবুজ রক্ষায় ফ্যাশন সচেতন ভোক্তাদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ লুসি সিগল।

এরপর থেকে কেনাকাটা করার আগে নীচে উল্লেখিত ১০টি উদ্ভাবন, প্রবণতা এবং টিপস বিবেচনায় রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি। যা আপনাকে সবসময় স্টাইলিশ থাকতে সাহায্য করবে।

আরও পড়তে পারেন:

গিসেলে বান্ডশেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গ্রিন কার্পেট ফ্যাশন পুরস্কার পেয়েছেন মডেল গিসেলে বান্ডশেন।

১. বারবার না কিনে, অদলবদল করুন

আপনি হয়তো মনে করতে পারেন যে আলমারির চকমকে এই পোশাকটি আপনি ইতোমধ্যে অনেকগুলো অনুষ্ঠানে পরে ফেলেছেন।

কিন্তু পোশাকটি এখনও নতুনের মতো আছে এবং আপনার বন্ধু বান্ধবের অনেকেই সুযোগে আছেন পোশাকটি আপনি কবে বাতিল করবেন।

সেক্ষেত্রে আপনি আপনার পোশাকটি এমনই কারও সঙ্গে অদল বদল করে নিতে পারেন, যার ওয়ারড্রবেও হয়তো এমন কোন পোশাক আছে যেটা কিনা তার কাছে পুরনো হলেও আপনার জন্য নতুন।

এভাবে অদল বদল অথবা গরিব মানুষদের দান করার মাধ্যমে একটি পোশাকের আয়ু বাড়িয়ে দেয়া সম্ভব।

ওয়েস্ট অ্যান্ড রিসোর্স অ্যাকশন প্রোগ্রাম-র‍্যাপ নামে একটি দাতব্য সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, পুরনো পোশাক অদল বদল বা বিতরণের কারণে যুক্তরাজ্যে পোশাক বর্জ্যের পরিমাণ ২০১২ সালের তুলনায় ৫০ হাজার টন কমে গিয়েছে।

ওয়াশিং মেশিন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ওয়াশিং মেশিনে পানির তাপমাত্রা কমিয়ে দিন।

২. তাপমাত্রা কমিয়ে নিন

পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হওয়া মানে এই নয় যে দাগযুক্ত ময়লা কাপড় পরতে হবে। কিন্তু যখনই আপনি কাপড় ধুতে যাবেন তখন পানির তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের পরিবর্তে ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নামিয়ে নিন।

এছাড়া ওয়াশিং মেশিনে টাম্বল ড্রায়ারে কাপড় শুকানোর পরিবর্তে বাইরের বাতাসে কাপড় শুকিয়ে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সেইসঙ্গে যতোটা সম্ভব আয়রনের ব্যবহার কমিয়ে হালকা কোঁচকানো পোশাকে অভ্যস্ত হওয়ার কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়।

র‍্যাপের মতে, শুধুমাত্র বাড়িতে ওয়াশিং মেশিনে পানির তাপমাত্রা কমিয়ে সেইসঙ্গে টাম্বল ড্রাইং ও আয়রনের ব্যবহার কমিয়ে কার্বন নি:সরণের হার ৭০ লাখ টন কমানো সম্ভব হয়েছে।

দুজন পুরুষ মার্কেটে দাঁড়িয়ে আছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পোশাকে নতুনত্ব আনতে পারাটাই আসল কথা।

৩. লেস ইজ মোর

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পোশাকের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে দেখা যায়।

২০১৬ সালে শুধু যুক্তরাজ্যেই ১১ লাখ ৩০ হাজার টন পোশাক বিক্রি হয়েছে।

তবে এখনকার ভোক্তাদের মধ্যে যে প্রবণতাটি লক্ষ্য করা যায়, সেটি হল টাকা জমিয়ে দামি ও ভালো মানের টেকসই পোশাক কেনা।

একটি কাপড় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার, নতুন পোশাকের উৎপাদন কমাতে বড় ধরণের ভূমিকা রাখে।

মনে রাখতে হবে: "সস্তা কিনুন, দু'বার কিনুন!"

এম সি হ্যামার তার লাকি প্যান্টস পরে পারফর্ম করছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এম সি হ্যামার তার লাকি প্যান্টস পরে পারফর্ম করছেন।

৪. ভাগ্যবান জামা তত্ত্ব:

মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষ এমন একটি পোশাক ধরে রাখতে চান যেটার কোন প্রতীকী অর্থ রয়েছে।

যদি তিনি বিশ্বাস করেন যে, কোন সফল সাক্ষাতকারের জন্য সেদিনের পরে থাকা জামাটি ভাগ্য-কবজের মতো কাজ করেছে। তাহলে পরের সাক্ষাতকারেরও তিনি এই পোশাকটি পরিধান করতে চাইবেন।

একই বিষয় কাজ করে জন্মদিন বা বিয়ের পোশাকের ক্ষেত্রে।

এভাবেই আমাদের সবার উচিত নিজেদের প্রতিটি পোশাককে ঘিরে একটি ব্যাখ্যা তৈরি করা।

এতে পুরনো পোশাককে ঘিরেও আমাদের ভালোলাগা তৈরি হবে এবং আমরা একে হারাতে চাইব না।

অনলাইনে পোশাক অদল বদল করা যায়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অনলাইনে পোশাক অদল বদল করা যায়।

৫. বিনিময় হতে পারে অনলাইনে

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা বিভিন্ন অনলাইন শপ থেকে দর কষাকষি করে স্বল্প মূ্ল্যের ব্যবহৃত পোশাক কেনেন।

পুরানো কাপড় ফেলে না দিয়ে এমনই কোন অনলাইন শপে নিজের পোশাকটি বিক্রি করা যেতে পারে।

এছাড়া অনেক চেইন শপ বা ফ্যাশন হাউজ ব্যবহৃত কাপড় রি-কন্ডিশন স্টকে বিক্রি করে থাকে।

এতে পোশাক বিনিময় শিল্পটি যেমন বিস্তার লাভ করবে তেমনি পুরনো পোশাকও পায় নতুনত্বের ছোঁয়া।

ইদানিং বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে থ্রিডি মুদ্রিত পোশাক।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইদানিং বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে থ্রিডি মুদ্রিত পোশাক।

৬. থ্রি-ডি মুদ্রণ

তেল আবিব-ভিত্তিক ফ্যাশন ডিজাইনার দেনিত পেলেগ "ফিলাফ্লেক্স" নামের শক্তিশালী ও নমনীয় ফিলামেন্ট ব্যবহার করে থ্রি-ডি মুদ্রিত পোশাক ডিজাইন করেছেন। যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

চাইলে যে কেউ তার পুরনো পোশাকে থ্রিডি প্রিন্ট করে নতুন রূপ দিতে পারেন।

এ ধরণের একটি প্রিন্টার থাকলে বাড়িতে বসে যে কেউই নিজের কাপড় নিজে ডিজাইন করতে পারবেন।

সেলাইয়ের দক্ষতা আপনার পোশাককে নতুন রূপ দিতে পারে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সেলাইয়ের দক্ষতা আপনার পোশাককে নতুন রূপ দিতে পারে।

৭. নতুন কিছু তৈরি করুন

আগেকার মানুষের সেলাইয়ের দক্ষতা থাকার কারণে নিজেদের পোশাকটিকে নিজেরাই মাপ মতো বানাতে পারতেন বা কাটছাঁট করে নতুন রূপ দিতে পারতেন। কিন্তু আজকাল কেউ আর সুঁই সুতা হাতে তোলেননা।

এখনও অনেকেন বোতাম পর্যন্ত জোড়া দিতে সংগ্রাম করতে হয়।

তবে আজকাল সেই মানুষগুলোর সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নানা ধাঁচের দর্জির দোকান।

আয়োজন করা হচ্ছে সেলাই নিয়ে নানা ধরণের কর্মশালার। এছাড়া অনলাইনে সেলাইয়ের টিউটোরিয়ালগুলো দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

সামান্য জোড়াতালি, রিফু, বোতাম জুড়ে দেয়া অথবা জিপার প্রতিস্থাপন একটি পোশাককে ডাস্টবিনের পরিবর্তে আপনার ওয়ারড্রবে জায়গা দিতে পারে।

এছাড়া পুরাতন পোশাককে মেরামত বা কাটছাঁট করে নতুন করে তোলা যায়।

যেমন ফুলপ্যান্ট কেটে বানিয়ে নিতে পারেন শর্টস। প্রিয় টপসটা হয়তো রং করে নিতে পারেন। নতুন পকেট জুড়ে, বোতাম লাগিয়ে বা সেলাইয়ের ফোড় দিয়ে বদলে দিতে পারেন পুরো পোশাকটাই।

ফলের তৈরি কাপড় হতে পারে পরিবেশবান্ধব।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ফলের তৈরি কাপড় হতে পারে পরিবেশবান্ধব।

৮. ফলের তৈরি কাপড়

ফল থেকে তৈরি কাপড় ফ্যাশন শিল্পে নতুন জোয়ার তুলেছে। এখন কমলা, আনারস এমনকি আপেলের শাঁস থেকে তৈরি করা হচ্ছে নানান ধাঁচের কাপড়।

সাধারণত নানা ধরণের ফলের বর্জ্যে পলিইউরেথেন মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই কাপড়।

এ ধরণের কাপড় এবং চামড়া যেমন হালকা এবং টেকসই। তেমনই পরিবেশ-বান্ধব।

কিন্তু এই ফলের তৈরি কাপড় যদি আপনার পছন্দ না হয় তাহলে আপনি "নিউলাইফ"-এর পোশাক পরতে পারেন।

"নিউলাইফ" এক ধরণের সুতা যেটা কিনা পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল থেকে বানানো হয়।

তুলা গাছ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টেকসই তুলা উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

. টেকসই তুলো

তুলার উৎপাদন পরিবেশের ওপর একটি বিধ্বংসী প্রভাব ফেলে।

এক কেজি তুলা উৎপাদনের জন্য গড়ে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার লিটার পানি খরচ হয়। একজন মানুষের ২০ বছর সময়ে এই পরিমাণ পানি পান করে থাকে।

অথচ ওই এক কেজি তুলা দিয়ে একটি শার্ট ও দুটি জিনসের চেয়ে বেশি কিছু বানানো সম্ভব না।

তাছাড়া তুলা চাষের জন্য প্রচুর ফাঁকা জমির প্রয়োজন হয়। সেইসঙ্গে দরকার হয় প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর কীটনাশকের।

তবে বর্তমানে কয়েকটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড ২০২০ সালের মধ্যে শতভাগ টেকসই তুলা ব্যবহারের অঙ্গিকার করেছে।

এই টেকসই তুলা উৎপাদনে পানি ও কীটনাশকের ব্যবহার যেমন অনেকাংশে কমিয়ে আনা যাবে। তেমনি কাজের নিরাপদ পরিবেশও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সোলার ফাইবার তৈরি করা হচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সোলার ফাইবার তৈরি করা হচ্ছে।

১০. সৌর আনুষঙ্গ

ভোক্তাদের খুশি করার লক্ষ্যে এখন বাজারে এসেছে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত কাপড়। যেটা ভোক্তারা বারবার পরিধান করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

তেমনই একটি কাপড় হল "সোলার ফাইবার" বা "সৌর তন্তু"।

মূলত সুতার আকারে উৎপাদিত এই সৌর কোষ দিয়ে কাপড় বোনা হয়।

সেইদিন আর দূরে নয় যেদিন আমরা নিজেদের মাথার সৌর স্কার্ফটিতে ফোন প্লাগ ইন করে পোর্টেবল চার্জার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবো।

যেখানে পরনের কাপড়ে পাওয়া যাবে ঘাড় গরম রাখার সুবিধা।