আফগানিস্তানে কেনো এতো দীর্ঘ যুদ্ধ হচ্ছে?

তালেবানদের সাথে চলা শান্তি আলোচনা একতরফা ভাবেই বাতিল করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও তখন দু'পক্ষই একটি সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে ছিলো।

কিন্তু আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র কেনো যুদ্ধ করছে এবং এটি এতো দীর্ঘায়িত হলো।

সেপ্টেম্বর ১১ হামলা

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলায় আমেরিকাতে নিহত হয়েছিলো প্রায় তিন হাজার মানুষ।

আল কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকেই এজন্য দায়ী করা হয়।

তালেবান ইসলামি উগ্র গোষ্ঠী যারা আফগানিস্তান শাসন করছিলো ও বিন লাদেনকে সুরক্ষা দিচ্ছিলো।

তারা তাকে হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানালো।

৯/১১ এর এক মাস পরে আফগানিস্তানে বিমান হামলা শুরু করলো যুক্তরাষ্ট্র।

আরও দেশ যোগ দিলো সেই যুদ্ধে এবং দ্রুতই ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলো তালেবান।

কিন্তু তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। বরং তারা ফিরে এসেছে।

এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগান সরকারের পতন ঠেকাতে এবং তালেবানদের রক্তক্ষয়ী হামলায় ঠেকাতে লড়াই করছে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ওসামা বিন লাদেন

প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বিমান হামলার ঘোষণা দেন ২০০১ সালের ৭ই অক্টোবর।

তিনি বলেছিলেন, "এ মিশন হলো আফগানিস্তানকে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা এবং তালেবানদের সামরিক সক্ষমতায় আঘাত করা"।

শুরুতেই তালেবানদের সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিলো।

এছাড়া আল কায়েদার প্রশিক্ষণ শিবিরেও আঘাত হানা হয়।

এরপর ১৮ বছর চলে গেলো। যুক্তরাষ্ট্রের মিশন সফল হয়েছে কি-না তা নিয়ে বিতর্ক চলছেই।

বরং তালেবান আবারো আফগান সরকারের অংশ হতে পারে যদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের আলোচনা সফল হয়।

তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ প্রথমে নিয়েছিলো ১৯৯৬ সালে এবং পরে দু বছরের মধ্যে পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

তারা উগ্র ইসলামি পন্থা অনুসরণ করে এবং প্রকাশ্যে শাস্তি কার্যকরের পদ্ধতি চালু করে।

যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরুর দু মাসের মধ্যে তাদের পতন হয় ও তাদের যোদ্ধারা অনেকেই পাকিস্তানে চলে যান।

২০০৪ সালে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সরকার ক্ষমতা নেয়। যদিও পাকিস্তান সীমান্ত এলাকায় তালেবানদের ব্যাপক সমর্থন ছিলো।

তারা মাদক পাচার, খনি নিয়ন্ত্রণ ও কর আদায় করে শত মিলিয়ন ডলার আয় করে।

যেহেতু তালেবান একের পর এক আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছিলো তাই আন্তর্জাতিক বাহিনী আফগান বাহিনীর সাথে তালেবানের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করতে থাকে।

২০১৪ সালে ন্যাটোর আন্তর্জাতিক বাহিনী তাদের মিশন সমাপ্ত করে তালেবানদের সাথে লড়াইয়ে দায়িত্ব আফগান বাহিনীকে দেয়।

কিন্তু সেটিই তালেবানকে সুযোগ করে দেয় এবং তারা বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকে এবং সরকারি বাহিনী ও বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্য করে হামলা করতে থাকে।

গত বছর আফগানিস্তানের ৭০ ভাগ এলাকায় তালেবান সক্রিয় বলে জানতে পারে বিবিসি।

আরো পড়তে পারেন:

তালেবান কোথা থেকে এলো

যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের আগে থেকেই প্রায় বিশ বছর যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে আফগানিস্তান।

১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আর্মি দেশটির কমিউনিস্ট সরকারকে সহায়তার জন্য আগ্রাসন চালায়। '৮৯ সালে সোভিয়েতরা চলে যায় কিন্তু গৃহযুদ্ধ অব্যাহত থাকে। আর এ নৈরাজ্যের মধ্যেই তৈরি হয় তালেবান, পশতু ভাষায় যার অর্থ ছাত্র।

তারা প্রথমে পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায় অবস্থান তৈরি করে এবং ১৯৯৪ সালে আফগানিস্তানের দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থান নেয়।

গৃহযুদ্ধে অতিষ্ঠ আফগানদের তখন তারা দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা উন্নত করার অঙ্গীকার করেছিলো।

প্রধানত সৌদি অর্থায়নে তারা ধর্মীয় স্কুল গুলোতে সরব হয়ে উঠে।

চালু করে নিজস্ব শরীয়া আইন। কার্যকর করে শাস্তির নিষ্ঠুর পদ্ধতি।

টেলিভিশন, সিনেমা সঙ্গীত নিষিদ্ধ হয়। পুরুষদের দাড়ি রাখা আর নারীদের বুরকা পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়।

যুদ্ধ কেনো দীর্ঘতর হলো?

এর কারণ অনেক।

তবে আফগান সরকার ও বাহিনীর সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘসময়ের জন্য সৈন্য রাখতে অন্য দেশগুলোর অনিচ্ছার সুযোগে, আবারো শক্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ পায় তালেবান।

গত ১৮ বছরে তালেবান ব্যাকফুটেই ছিলো।

কিন্তু ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সৈন্য সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেন ও এক লাখ সৈন্য আফগানিস্তান ছেড়ে যায়।

এটা আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে শক্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ করে দেয়।

যখন আন্তর্জাতিক বাহিনী লড়াই থেকে সরে গেলো আর আফগান বাহিনী দায়িত্ব পেলো, তখন তালেবানের জন্য কাজ আরও সহজ হয়ে গেলো।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের দায়ুদ আজামীর মতে যুদ্ধ এখনো চলার কারণ:

১. হামলার রাজনৈতিক অস্পষ্টতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

২. শান্তি আলোচনা চলার সময়েও তালেবানরা তাদের শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করেছে

৩. ইসলামি জঙ্গিদের সহিংসতা বেড়ে যাওয়া

৪. পাকিস্তানের ভূমিকা

কিভাবে তালেবান এখনো শক্তিশালী থাকতে পারলো?

তারা বছরে দেড় বিলিয়ন ডলারের মতো অর্থ আয় করেছে। এর বড় অংশই মাদক থেকে। আফগানিস্তান বিশ্বের বড় আফিম উৎপাদনকারী দেশ। যার বেশির ভাগই ব্যবহৃত হয় হেরোইন তৈরিতে।

নিজের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কর আদায়ের মাধ্যমেও বিপুল অর্থ আয় করেছে তারা। আর খনি, টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ নিয়ে ব্যবসা তো রয়েছেই।

পাকিস্তান ও ইরান তাদের অর্থায়নের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে কিন্তু ওই অঞ্চলের কিছু ব্যক্তি তালেবানকে সহায়তা করেছে বলেই মনে করা হয়।

কতটা মূল্য নিয়েছে এ যুদ্ধ?

এর উত্তর - সর্বোচ্চ।

কত আফগান সৈন্য মারা গেছে তার হিসেব নেই।

আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বলেছেন ২০১৪ সাল থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ৪৫ হাজার সদস্য নিহত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাহিনীর সাড়ে তিন হাজার সেনা মারা গেছে যার মধ্যে আমেরিকান ২ হাজার ৩০০।

আফগান বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি আরও ব্যাপক। চলতি বছরের এক রিপোর্টে জাতিসংঘ বলছে, ৩২ হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইন্সটিটিউট বলছে ৪২ হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছে।

তাদের হিসেবে ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব ২০০১ সাল থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্য দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো হামলা চালিয়েই যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তৃতীয় প্রেসিডেন্ট যিনি এখন বিষয়টি দেখছেন।

২০২০ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনিও এখন সৈন্য সংখ্যা কমিয়ে আনতে চাইছেন।