আড়ং বন্ধের পর কর্মকর্তার বদলি নাটক নিয়ে সামাজিক মাধ্যম সরগরম

    • Author, সাইয়েদা আক্তার
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

সামাজিক মাধ্যমে তুমুল সমালোচনার মুখে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে বদলি করে দেয়া আদেশ বাতিল করেছে সরকার।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বিবিসিকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সকালে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এই কর্মকর্তার বদলির আদেশ হয়েছিল।

"আসলে উনার বদলির সিদ্ধান্তটি হয়েছিল মে মাসের ২৯ তারিখে, কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে গতকাল (সোমবার)। কিন্তু যেহেতু ভোক্তা অধিকার নিয়ে মানুষ এখন অনেক সচেতন, এই বদলির বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে।"

"যেহেতু আমরা (সরকার) ভোক্তা অধিকারের বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি, ফলে ভোক্তাদের মনে এ বদলি নিয়ে কোন সংশয় যাতে না থাকে, সেজন্য ঐ আদেশ বাতিল করা হয়েছে।"

কী কারণে এ বদলি নিয়ে আলোচনা?

সোমবার বাংলাদেশের লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড আড়ং এর উত্তরা শোরুমে অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

সেখানে এক সপ্তাহের ব্যবধানে একই পণ্যের মূল্য ৬০০ টাকা বাড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা করা হয় আড়ংকে।

সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারের নেতৃত্বে ঐ অভিযান চালানো হয়।

এই ঘটনার কয়েক ঘন্টা পরেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেখা যায় মিঃ শাহরিয়ারকে বদলি করা হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে তাকে সড়ক ও জনপদ অধিদফতরের খুলনা জোনের এস্টেট ও আইন কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়।

এরপরই বিষয়টি নিয়ে এরপর সামাজিক মাধ্যমে ব্যপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

মিঃ শাহরিয়ারের বদলির আদেশের সরকারি নোটিশটি ভাইরাল হয়ে যায় কয়েক ঘন্টার মধ্যেই।

সামাজিক মাধ্যমে বেশিরভাগ মানুষের অভিযোগ, আড়ং এ অভিযান চালানোর কারণেই মিঃ শাহরিয়ারকে বদলি করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার সকালে তার বদলির আদেশ প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়।

বিষয়টি এতটাই আলোচিত হয় যে মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, "সোশ্যাল মিডিয়ায় বদলী সংক্রান্ত বিষয়টি ব্যাপক আলোচনা হওয়ায় তা এই মুহূর্তে ফিনল্যান্ড সফররত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দৃষ্টিগোচর হয়।

পরবর্তীতে আজ সকালে যথাযথ কর্তৃপক্ষ জনাব মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বদলি আদেশ বাতিল করেছেন।"

তবে, ভিন্ন আলোচনাও রয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঐ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা কত টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন?

কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে একটি প্রাতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়ার যৌক্তিকতা রয়েছে কিনা।

ভোক্তারা কী বলছেন?

কেবল আড়ং নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ব্যবহার ও পণ্য আমদানির প্রমাণাদি না থাকায় গত সপ্তাহেই ঢাকার দুইটি নামকরা বিউটি পার্লারকে জরিমানা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে কয়েকটি নামী রেস্তরাঁ এবং সুপার স্টোরকেও জরিমানা করা হয়েছে রোযা শুরু হবার পর।

এরপর সোমবার আড়ং-এর জরিমানার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হতে থাকে।

গত প্রায় ১৫ বছর যাবত আড়ং থেকে কেনাকাটা করেন স্কুল শিক্ষক তানিয়া ফেরদৌসি। তিনি বিবিসিকে বলছেন, "আমি খবরটি শুনে খুবই আপসেট হয়েছি।

আমরা নিজেদের কাপড়, ঘর সাজানোর জিনিস এসব কিনতে ওখানে যাই, আবার কাউকে উপহার দিতে হলেও আড়ং-এ যাই।

সেখানে একই পণ্যের দুই রকম দাম এক সপ্তাহের মধ্যে হবে তা ভাবতেও পারিনা।"

পেশায় ব্যাংকার সানজিদা কিবরিয়া ঢাকার তেজগাঁও এর বাসিন্দা।

তিনি বলছেন, "শুধু আড়ং বলে নয়, কোন প্রতিষ্ঠানই আসলে ভোক্তার অধিকার বলে একটি ব্যপার আছে সেটা মাথায় রাখে না।

বিষয়টি তো কেবল আমার আর্থিক ক্ষতির বিষয় না, এতে আসলে আমার বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায় কোন নামী প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে।"

বদলি নিয়ে সরকার কী বলছে?

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বিবিসিকে জানিয়েছেন, মিঃ শাহরিয়ারের বদলির আদেশ মঙ্গলাবার সকালে বাতিল করে তাকে স্বপদে রাখা হয়েছে।

তবে, আড়ং এর ঘটনার সাথে ঐ বদলির কোন সম্পর্ক নেই বলে তিনি দাবি করেছেন।

"এটি একটি নিয়মিত বদলি। আর বদলির আদেশ হয়েছিল ২৯শে মে, প্রজ্ঞাপন হয়েছে ৩রা জুন। এখন 'কোইনসিডেন্টালি' আড়ং এও একই দিনে অভিযান হওয়ায়, মানুষ বিষয়টি ভুল বুঝেছে।"

"তবে, যেহেতু বিষয়টি নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে, মানুষ সমালোচনা করেছে, ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, সে কারণে বদলির সিদ্ধান্ত বাতিল করে তাকে স্বপদে বহাল রাখা হয়েছে।"

তবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, বদলির সিদ্ধান্ত আগে হলেও মিঃ শাহরিয়ার সে সম্পর্কে জানতেন না।

আড়ং কী বলছে?

এক সপ্তাহের ব্যবধানে একটি পাঞ্জাবির মূল্য ৭৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০৬ টাকা করা হয়েছে - এই অভিযোগের প্রেক্ষাপটেই আড়ং এ অভিযান চালিয়েছিল ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

আড়ং-এর চিফ অপারেটিং অফিসার মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেছেন, ভুলবশত কয়েকটি পণ্যে ভিন্ন পণ্যের 'ভুল ট্যাগ' লাগানো হয়েছিল।

"দুইটি পণ্য ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এসেছিল, তখন অন্য এক পণ্যের ট্যাগ ভুলবশত লাগানো হয়ে গেছে। এটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত একটি 'হিউম্যান এরর' এবং আড়ং সব ক্রেতার কাছে এজন্য দুঃখপ্রকাশ করছে।"

তিনি জানিয়েছেন, আড়ং ভুল সংশোধন করে নিয়েছে, এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ভুল আর না হয়, সেজন্য তারা সচেষ্ট থাকবে।

ইতিমধ্যেই আড়ং-এর ফেসবুক পেজে এ সংক্রান্ত একটি বিবৃতিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মিঃ আলম বলেছেন, আড়ং ৪০ বছরের একটি প্রতিষ্ঠান, ক্রেতাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য প্রতিষ্ঠানটি রাতদিন পরিশ্রম করে। ভোক্তারা সেটাও মনে রাখবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।