দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেভাবে লড়াই করছে কেনিয়া

কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তা ঘোষণা করেছেন যে দেশের প্রচলিত মুদ্রা নতুন প্রজন্মের ব্যাংক-নোটগুলোর সঙ্গে প্রতিস্থাপিত করতে হবে।

মানি লন্ডারিং, জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কেনিয়ানদের পহেলা অক্টোবরের মধ্যে তাদের ১০০০ সিলিং (১০ ডলার) এর নোটগুলো ব্যাংকগুলোকে ফেরত দিতে হবে।

নতুন ব্যাংক-নোটগুলো সামনের মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে আনা হবে। এছাড়া ধীরে ধীরে কয়েকটি পর্যায়ে এই নোট প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া চলবে।

কেনিয়ার কিছু নাগরিক নতুন ব্যাংক নোটের নকশা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নতুন নোটে জমো কেনিয়াত্তার মূর্তির ছবি রয়েছে। তিনি কেনিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান প্রেসিডেন্টের বাবা।

ডিজাইনের এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে, সেইসঙ্গে সিলিঙয়ের নতুন নোট যেন বাজারে না আসে সেজন্য চাপ সৃষ্টি করতে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ানো হয়েছে।

কেন কেনিয়া তাদের নোট প্রতিস্থাপন করেছে?

অবৈধ অর্থ আত্মসাতের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সেইসঙ্গে ১০০০ সিলিং এর জাল নোট মোকাবেলায় কেনিয়া পুরাণ নোট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কেনিয়া এবং আশেপাশের অন্যান্য দেশে অবৈধ আর্থিক প্রবাহের জন্য বড় ব্যাংক-নোট ব্যবহার করা হচ্ছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কেনিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্যাট্রিক জোরোগে।

কেনিয়াতে ১০০০ সিলিং নোট হল সবচেয়ে বড় মূল্যের নোট এবং মিস্টার জোরোগের মতে, কেনিয়ার সিলিং পূর্ব আফ্রিকায় মার্কিন ডলারের সমতুল্য।

২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট কেনিয়াত্তা নির্বাচিত হওয়ার পর দুর্নীতির অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

তবে তার সমালোচকরা বলছেন যে, তখন থেকে কয়েকজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় যাদের মধ্যে হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিরাও ছিলেন।

বিবিসি আফ্রিকার ব্যবসা প্রতিবেদক জর্জি এনডিরঙ্গু বলেছেন যে ডেমোনেটাইজেশন - অর্থাৎ কয়েন, কাগুজে নোট বা মূল্যবান ধাতুকে আইনি দরপত্র হিসাবে ব্যবহার থেকে প্রত্যাহার করাকে- এই সমালোচনার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেখা হয়।

দুর্নীতির চক্রে থাকা সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে প্রাপ্ত লাখ লাখ নগদ সিলিং পেয়েছেন বলে মনে করা হয়।

এবং এই ১০০০ সিলিং-এর নোট প্রত্যাহারের ফলে তাদের অনেক মানি-লন্ডারিং উপায় বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কেননা এই পুরাণ নোটগুলো নতুন নোটের সাথে বদলে নিতে হবে।

আরও পড়তে পারেন:

এই প্রতিস্থাপন কিভাবে ঘটবে?

মিস্টার নরোজে বলেন, কেনিয়ানদের পুরানো ১০০০ সিলিং নোটের পরিবর্তে নতুন নোট বদলে নেয়ার জন্য যে চার মাস সময় দেয়া হয়েছে, সেটা যথেষ্ট।

গ্রাহকরা স্থানীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ৫০ লাখ কিংবা তার চাইতে কম অর্থ প্রতিস্থাপন করতে পারবেন।

তবে অর্থের পরিমাণ এর চেয়ে বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের থেকে অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।

মিস্টার নরোজে, ফরেন এক্সচেঞ্জ ব্যুরোর পরিচালক এবং মানি-রেমিট্যান্স প্রদানকারীদের সাথে অবৈধ আর্থিক প্রবাহ প্রতিরোধ করার ব্যাপারে আলোচনার কথা জানিয়েছে।

তিনি এই অঞ্চলের ব্যাংকগুলোর সাথে যোগাযোগ করার কথা জানিয়েছেন যাতে তাদের মধ্যে অবৈধ অর্থ বিনিময় না হয়।

কেনিয়ানরা নতুন মুদ্রা নিয়ে ক্ষুব্ধ কেন?

কেনিয়ার নতুন নোটের নকশায় বন্যপ্রাণীর ছবির পাশাপাশি, দেশটির আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার (কেআইসিসি) এবং এর মাঝামাঝি জোমো কেনিয়েত্তার একটি মূর্তির ছবি বসানো হয়েছে।

তিনি কেনিয়াকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিতে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন এবং সে কারণেই তিনি দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন।

কেনিয়ার ২০১০ সালের সংবিধান বলছে যে যেকোনো মুদ্রা - সেটা কয়েন হোক বা ব্যাংক-নোট- তার কোনটিতে ব্যক্তির প্রতিকৃতি ব্যবহার করা যাবেনা।

হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট ওকিয়া ওমতাতাহ আদালতের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করছেন যে, ১০০০ সিলিং নোট প্রতিস্থাপনে সেইসঙ্গে নতুন নোটগুলোর ডিজাইন করার ক্ষেত্রে জন সাধারণের অংশগ্রহণের অভাব রয়েছে।

তবে কিছু কেনিয়ার নাগরিক, কেনিয়াত্তার ছবি দেয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। কেনিয়ার প্রতিষ্ঠাতা জনক প্রতি এটি এক ধরণের সম্মান প্রদর্শন বলে মনে করেন কেউ কেউ।

অন্যান্য দেশে ডেমোনেটাইজেশন আছে?

২০১৬ সালে, ভারত রাতারাতি তাদের প্রায় সব নগদ অর্থ পরিবর্তন করে, যা দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সমস্যার সৃষ্টি করেছে বলে দাবি সমালোচকদের।

সেখানকার ট্যাক্স চুরি এবং সন্ত্রাসবাদের তহবিল মোকাবিলায় এবং একটি দেশে যেখানে ৯০% লেনদেন নগদে হয়, সেখানে সবকাজ নগদহীন করার দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এমন একটি পদক্ষেপ বেশ প্রয়োজনীয় বলে জানিয়েছে ভারতের সরকার।

১৯৮৪ সালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়াসে নাইজেরিয়াও পুরাতন নোটগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। যেমনটি ঘানা ১৯৮২ সালে তাদের দেশের ট্যাক্স চুরি ঠেকাতে এই ডেমোনেটাইজেশনের পথ ধরেছিল।