চীনের অর্থনৈতিক মন্দায় আমাদের দুশ্চিন্তা কতটা?

যুক্তরাষ্ট্র চীনের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে চীনের অর্থনীতিতে ফাটল ধরেছে বলে মনে করা হচ্ছে, দেশটির দুর্বল প্রবৃদ্ধিই যার লক্ষণ।

সেই সাথে দুশ্চিন্তা আরো বাড়ছে, যখন দেখা যায় যে গত বছর চীনের শেয়ার বাজারের অবস্থা ছিল সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে, বছর শেষ হয়েছে ২৪% মন্দায়।

এই সপ্তাহে অ্যাপল বলছে, চীনে তাদের বিক্রির ক্রমাবনতি তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করবে না। বিশ্বব্যাপী তাদের শেয়ারের দরে বড় পতন ঘটতে পারে।

এমন অবস্থা কেবল এই টেক জায়ান্টের একার নয়।

আরো পড়ুন:

অন্যসব কোম্পানিগুলোও চীনের এই বাণিজ্য মন্দা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের বিষয়ে সতর্ক রয়েছে।

এদের মধ্যে রয়েছে জেনারেল মটরস, ফোর্ড এবং ফিয়াট ক্রাইসলারের মতো গাড়ি তৈরির কোম্পানি। বিলাসবহুল মটরগাড়ি নির্মাতা জাগুয়ার ল্যান্ডরোভারও চীনের তাদের বিক্রি কমে যাবার বিষয়ে শঙ্কিত।

চীনা সার্চ ইঞ্জিন বাইডু'র প্রধান নির্বাহী রবিন লি তার কর্মীদের সতর্ক করতে এই অবস্থাকে বর্ণনা করেছেন 'গেম অব থ্রোন' থেকে নেয়া কিছু শব্দ দিয়ে। তিনি চীনের আসন্ন বাণিজ্য মন্দা কে বোঝাতে বলছেন যে, 'শীতকাল চলে আসছে'।

তবে এমন অবস্থার মুখোমুখি অবশ্য সব পশ্চিমা ব্র্যান্ড নয়।

যেমন গেল সেপ্টেম্বরে বৃহত্তর চীনে নাইকির বিক্রি বেড়েছে ২৪ শতাংশ। এমনই আরেকটি পোশাক প্রস্ততকারক ব্র্যান্ড লুলুলেমন চীনে তাদের ভালো ব্যবসার কথা জানিয়েছে।

চীনের অর্থনীতি কোন আকার ধারণ করছে?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাচ্ছে এবং বর্তমানে তা ৬.৫%। যদিও এই হার উন্নত বিশ্বের তুলনায় বিরল, তবে দেশটির বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে প্রবৃদ্ধি মাত্রা ছিল এখন সেটি তার প্রায় অর্ধেক।

সর্বশেষ অর্থনৈতিক সংবাদগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে চীনের এই মন্দাটি আরো গভীরতর হচ্ছে, আর তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ ছাড়াই।

ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্রের বেশ কিছু তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে, গত ১৯ মাসের মধ্যে কারখানাজাত উৎপাদন সঙ্কুচিত হয়েছে। নতুন অর্ডার কমেছে এবং বেড়েছে খুচরা বিক্রি। কিছু কিছু সংস্থা ছাড় দিয়েও তাদের ব্যবসা বাড়াতে পারেনি।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ

চীনের অর্থনীতিতে রয়েছে এক গভীর সমস্যা, যা মোকাবিলার প্রয়োজন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন সেন্টারের গবেষণা সহযোগী জর্জ ম্যাগনাস এ নিয়ে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছেন।

তার মতে, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বের অন্যান্য অংশের চেয়ে চীনে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে যা উদ্বেগজনক।

এরমধ্যে রয়েছে চীনের জটিল এবং ব্যাংকিং সমস্যা, যাকে 'ছায়া ব্যাংকিং' বলে অভিহিত করা যায়। যেখানে আছে অনিয়ন্ত্রিত ঋণদাতাদের সমস্যা, সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি কার্যক্রম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকার বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইটসের ঘাটতি।

কর্তৃপক্ষের অবস্থান মোটেও সঠিক নেই সেখানে। চাহিদার সাথে সাথে তারা বিনিয়োগ করছে অবকাঠামোতে আর কমাচ্ছে লভ্যাংশের হার।

চীনের এই অর্থনৈতিক মন্দা কেন অন্য সবার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ?

চীনের অর্থনৈতিক অঙ্গনের এই গুরুতর অস্থিরতা এখন অন্য অনেকের জন্যেই গুরুতর হয়ে দাঁড়াবে। আর এর শুরু আরো ১০ থেকে ২০ বছর আগে।

এই শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কার্যকলাপের প্রায় ৭% ছিল চীনের। এই বছর পরিসংখ্যানটি দাড়াতে পারে ১৯%এ।

আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে চীনের শিল্প কারখানাগুলো।

গত ২৫ বছরে চীনের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি চলে এসেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থানে।

মি. ম্যাগনাসের মতে, চীনের অর্থনীতি এখন এতটাই বৃহৎ যে এখানে উৎপাদিত বেশিরভাগ পণ্যই বিশ্ববাজারের মূল্য নির্ধারণ করে।

বিশ্বের অর্ধেকের বেশি ইস্পাত, তামা, কয়লা এবং সিমেন্ট চীনে যায়। আর চীন যোগান দেয় বিশ্ব চাহিদার অর্ধেক শুকরের মাংস এবং চাল।

সুতরাং এখানে কেনাবেচা বন্ধ হলে দাম আপনা-আপনিই পরে যাবে।

ডিবিএস ব্যাংকের কৌশল বিদ তৈমুর বেগ এবং নাথান চৌ তাই বলছেন যে, বিশ্ব অর্থনীতির মূল সমস্যা প্রোথিত আছে 'চীনের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির গভীরে'।

"চীনের ক্রমবর্ধমান এই মন্দা ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির যে কোনো ক্ষেত্রেই একটি বড় প্রভাব ফেলবে।"

তবে যাই হোক, মি. ম্যাগনাসের মতে এই ভীতি অত্যধিক মাত্রায় না হওয়াই ভালো।

তার মতে, কেউই মনে করেন না যে চীনের অর্থনীতি এখনই একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তবে এটি ঠিক যে গত এক দশক বা তার বেশি সময় ধরে এর উচ্চ প্রবৃদ্ধির মাত্রা কমতে শুরু করেছে।